স্বামী ”ছেড়ে দিলাম” শব্দ বলেছিলো কি না? তা নিয়ে সন্দেহ হলে তালাক হবে কি? তাছাড়া অন্যান্য কনায়া শব্দ বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হুজুর, আমি তখন কেনায়ী তালাকের সম্পর্কে জানতাম না। তাই এসব কথায় যে তালাক হতে পারে সেটা আমাদের জানা ছিল না। আমরা ঝগড়ার সময় অনেক কথা বলে ফেলেছি যেগুলো আমার আর আমার স্বামীর মনে নেই। শুনলাম ছেড়ে দিলাম বললে তালাক হয়ে যায়। আমি স্পষ্টভাবে মনে করতে পারছি না, আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে দিলান বলেছিলেন কি না। বলে থাকলে কতবার বলেছিলেন নাকি কখনো বলেনই নাই। আমার আর আমার স্বামীর মনে নাই এগুলো। আমি একদিন উনাকে আল্লাহর নামে কসম করিয়েছিলাম যে, উনি কি নিয়ত করে আমাকে রাগের সময় চলে যেতে বলেছিল নাকি এমনিতেই বলেছিল! তখন উনি কসম করে বলেন যে, উনি শুধু আমাকে থামানোর জন্য বলতেন, উনার উদ্দেশ্য তালাক দেওয়া ছিল না।উনি আমাকে অনেক ভালোবাসেন।
কিন্তু হুজুর, আমার মনে সন্দেহ রয়ে গেছে যে, আমার সম্পর্ক হালাল কি না। কখনো মনে হয় হালাল আবার কখনো মনে হয় হারাম! আমি এটাই মনে করতে পারছি না যে, রাগের সময় উনি আমাকে ছেড়ে দিলাম বলেছিলেন কি না। কতবার বলেছিলেন! নাকি কখনো বলেননি! আমার এসব নিয়ে খুব চিন্তা হয়। আমার স্বামী আমাকে মানা করে দিসেন যে, উনার সামনে আর কখনো তালাকের কথা না উঠাতে। এমনকি তালাক নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করতে।উনার নাকি এগুলো শুনলে মেজাজ গরম হয়ে যায়।
হুজুর, এখন আমার কি করনীয়?!! প্লিজ জানাবেন।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার কথাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা হয়েছে। আপনার এবং আপনার স্বামীর বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে মনের ভেতরে যে সন্দেহ ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা মূলত শয়তানের পক্ষ থেকে আসা অসওয়াস বা মানসিক সংশয়।
ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য ফাতাওয়া কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ আপনার প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত:
আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ হালাল, বৈধ এবং সম্পূর্ণ বহাল রয়েছে । শরীআতের বিচারে আপনাদের মধ্যে কোনো প্রকার তালাক পতিত হয়নি।
২. ফিকহী ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:
ক. "আচ্ছা, তুমি যা চাও তাই হবে" বলা বা নীরব থাকার হুকুম:
- স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক চাওয়া বা ঝগড়ার সময় "আমাকে ছেড়ে দেন" বললে স্বামী যদি চুপ থাকেন কিংবা বলেন "আচ্ছা, তুমি যা চাও তাই হবে", তবে এর দ্বারা কোনো তালাক হয় না।
- কারণ: "তুমি যা চাও তাই হবে" বাক্যটি তালাকের কোনো স্পষ্ট শব্দ নয়; এটি একটি অস্পষ্ট বা সম্মতিমূলক বাক্য। স্বামী যদি তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়ত ছাড়া কেবল স্ত্রী বা ঝগড়া থামানোর উদ্দেশ্যে এমন কথা বলে থাকেন, তবে শরীআতের বিচারে তালাক অকার্যকর থাকে।
খ. "ছেড়ে দিলাম" বলেছিল কি না মনে না থাকা ও কসমের গ্রহণযোগ্যতা:
- আপনি বা আপনার স্বামী নিশ্চিত নন যে তিনি রাগের মাথায় আদৌ "ছেড়ে দিলাম" বলেছিলেন কি না। ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, নিছক সন্দেহ বা মনে পড়ছে না বলে ধরে নেওয়ার কারণে কোনো বিবাহ বাতিল হয় না।
- তাছাড়া "ছেড়ে দেওয়া" বাক্যটি ফিকহের পরিভাষায় 'কিনায়াহ' (অস্পষ্ট শব্দ)। কিনায়াহ বাক্যে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর সুনির্দিষ্ট তালাকের নিয়ত থাকা আবশ্যক। হ্যা, কোনো কোনো দারুল ইফতা থেকে পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ”ছেড়ে দিলাম” শব্দকে সরীহ তালাকের স্থলাভিষিক্ত শব্দ বলে মতামত ব্যাক্ত করা হয়েছে।
- যেহেতু আপনার স্বামী আল্লাহর নামে কসম করে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাঁর তালাকের বিন্দুমাত্র নিয়ত ছিল না, বরং কেবল আপনাকে শান্ত করার জন্য তিনি কথাগুলো বলেছিলেন, তাই শরীআতের দৃষ্টিতে স্বামীর এই কসম ও বক্তব্যই চূড়ান্ত হিসেবে গৃহীত হবে।
গ. কেবল সন্দেহের ওপর তালাক সাব্যস্ত না হওয়া:
- ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত মূলনীতি হলো: «اليقين لا يزول بالشك» (অর্থাৎ অকাট্য নিশ্চিত বিষয় কেবল সন্দেহের দ্বারা দূর হয় না)।
- যেহেতু আপনাদের বিবাহ অকাট্যভাবে নিশ্চিত, আর তালাকের বিষয়টি কেবলই অস্পষ্ট সন্দেহ ও স্মৃতির বিভ্রান্তি, তাই আপনার দাম্পত্য সম্পর্ক সম্পূর্ণ হালাল রয়েছে।
৩. এখন আপনার করণীয়:
১. ওয়াসওয়াসা সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলুন: আপনার মনে যে হারাম হওয়ার অনুভূতি আসছে, তা কেবলই শয়তানের প্ররোচনা। শরীআত যেখানে আপনাকে হালাল ঘোষণা করেছে, সেখানে অনর্থক নিজেকে গোনাহগার মনে করবেন না । ২. তালাকের আলোচনা বন্ধ রাখা: আপনার স্বামী আপনাকে সঠিক পরামর্শই দিয়েছেন—এই বিষয় নিয়ে আর কখনো ভাববেন না, উনাকেও কোনো প্রশ্ন করবেন না এবং তালাকের প্রসঙ্গ আর তুলবেন না। ৩. তাওবা ও ইস্তিগফার: অতীত ঝগড়াঝাটি ও তালাক চাওয়ার ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার করুন এবং স্বামীর সাথে সুসম্পর্ক রেখে শান্তিতে সংসার পরিচালনা করুন।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া / আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৭৪, ৩৭৫ (কিতাবুত তালাক, ফাসলু ফিল কিনায়াত) (অস্পষ্ট বা কিনায়াহ বাক্যে নিয়ত ছাড়া তালাক না হওয়া এবং "তুমি যা চাও তা হবে" বলা সংক্রান্ত ফিকহী মাসআলা)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩০০, ৩০১, ৩৭১ (কিতাবুত তালাক) (নিয়ত ছাড়া অস্পষ্ট শব্দে এবং ঝগড়া থামানোর বাক্যে তালাক অকার্যকর হওয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৩য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫৬, ১৫৭ (অধ্যায়: কসম) (নিয়ত ও সত্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে আল্লাহর নামে নেওয়া কসমের শরঈ গ্রহণযোগ্যতা)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৮৫, ৮৭ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, কিনায়াতের মাসআলা) (ঝগড়ার সময় নিয়ত ছাড়া অস্পষ্ট বাক্যে বা স্ত্রীকে থামানোর উদ্দেশ্যে বলা কথায় তালাক না হওয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১২াশ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৩১ (অধ্যায়: বাব وقوع الطلاق) (সন্দেহ, ভূলে যাওয়া বা ওয়াসওয়াসার কারণে তালাক না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
والله تعالى أعلم بالصواب