লুকিয়ে বিয়ে করার পর একসাথে তিন তালাক দেওয়ার পর আবার পারিবারিক ভাবে উক্ত পাত্রের সাথে বিবাহ কি বিশুদ্ধ হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7935
Questioner: sadia sharmin
Question Asked: 04 Nov 2026, 04:37 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 07:04 PM
Views: 11
Tokens: 10,007
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

*আসসালামু আলাইকুম। আমার বোনের জন্য একটি জরুরী মাসআলা জানতে চাই, দয়া করে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহ অনুযায়ী উত্তর দেবেন।*

আমার বোন ও তার স্বামী দুইজনই প্রাপ্তবয়স্ক ছিল। পরিবারকে না জানিয়ে তারা নিজেরা রেজিস্ট্রি ও কবুল বলে বিয়ে করে। বিয়ের সাক্ষী ছিল ছেলেপক্ষের ছেলের ভাই, আর মেয়েপক্ষের ছেলের দূরসম্পর্কের এক মামা, কিন্তু কারো বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্য কেউ জানতো না।

কিছুদিন পর কোনো একটা ঝামেলার কারনে, রাগের মাথায় আমার বোনকে তার স্বামী বলে "তোকে তালাক দিলাম" এবং একসাথে ৩ বার "৩ তালাক" বলে দেয়। এরপর তাদের ২ মাস কোনো যোগাযোগ ছিল না।

২ মাস পর তারা আবার যোগাযোগ করে এবং ভুল বুঝতে পেরে দুই পরিবারকে জানিয়ে পারিবারিকভাবে নতুন মোহর ধার্য করে আবার বিয়ে করে। আলহামদুলিল্লাহ এখন সেই বিয়ের ৫ বছর চলছে।তবে লুকিয়ে বিয়ের তালাক দেওয়ার কথা টা দুই পরিবারের বাবা মা রা জানেন না,,হাতে গোনা ২-৪ জন জানেন,,

এছাড়াও বর্তমানে আমার বোন রাগ হলে বলে "সংসার করবো না, গায়ে হাত দিলে চলে যাবো, ছেড়ে যাবো", মাঝে মাঝে তার স্বামীও রাগ হয়ে বলে "যাও"। এতে কি তালাক পতিত হয়?

*আমার প্রশ্ন হলো:*

১. তাদের প্রথম লুকানো বিয়েটা কি হানাফি মতে সহিহ হয়েছিল?

২. একসাথে দেওয়া ৩ তালাকের ক্ষেত্রে সহিহ মুসলিমের ১৪৭২ নং হাদিস (ইবনে আব্বাস রাঃ এর হাদিস) অনুযায়ী ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা যায় কি? কারণ তাদের জরুরত।

৩. যদি ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা হয়, তাহলে ২ মাস পর পারিবারিকভাবে যে দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে সেটা কি সহিহ হয়েছে? তাদের কি হিলার প্রয়োজন আছে?

৪. বর্তমানে তারা রাগের সময় যে "চলে যাবো, সংসার করবো না, যাও" - এই জাতীয় কথা বলে, এতে কি তালাক হয়?

তারা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে এবং হানাফি থাকতে চায়। তবে এই ক্ষেত্রে সহিহ হাদিসের উপর আমল করা যাবে কি?

দয়া করে জানালে উপকৃত হব।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আপনার বোনের ঘটনা ও উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট শরঈ সমাধান নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. প্রথম গোপন বিবাহটি হানাফী মাযহাব মতে সহিহ হয়েছিল কি?

হ্যাঁ, তাঁদের প্রথম বিবাহটি হানাফী ফিকহ অনুযায়ী শরীআতসম্মত ও সহিহ (বৈধ) হয়েছিল।

  • ফিকহী ব্যাখ্যা: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) ও আকিল (সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন) নর-নারী অভিভাবকের (মা-বাবা) অনুপস্থিতিতে বা না জানিয়ে যদি নিজেরা বিয়ের আকদ (ইজাব ও কবুল) করে এবং বিবাহ সভার (মজলিস) একই স্থানে দুইজন বালেগ মুসলিম পুরুষ সাক্ষী (এখানে ছেলের ভাই ও মামা) উপস্থিত থেকে প্রস্তাব ও কবুল সশরীরে শুনতে পান ও বুঝতে পারেন, তবে শরীআতের দৃষ্টিতে সেই বিবাহ সম্পূর্ণরূপে সহিহ ও সম্পন্ন হয়ে যায়।

  • অভিভাবক বা মা-বাবাকে জানানো ও তাঁদের অনুমতি নেওয়া নৈতিক ও সামাজিক সুন্নাত হলেও, হানাফী মাযহাবে বালেগ প্রাপ্তবয়স্কদের আকদ সহিহ হওয়ার জন্য অভিভাবকের উপস্থিতি আবশ্যকীয় শর্ত নয়।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ:

    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২২ (হিন্দিয়াহ ১/২৬৭) (অধ্যায়: বিবাহ অধ্যায় — 'বালেগা মহিলার নিজস্ব আকদে বিবাহ সহীহ হওয়া এবং দুইজন বালেগ মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতির শরঈ শর্তাবলী')।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১১শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৫১, ৫২ (অধ্যায়: বাবুল আকদ — 'বালেগা মেয়ের ওলী ছাড়া দুই সাক্ষীর সামনে আকদ সহীহ হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া')।
    • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১১৯, ১২০ (অধ্যায়: 'প্রযুক্তির সাহায্যে ও সরাসরি বিবাহ: সাক্ষীদের উপস্থিতি ও ইজাব-কবুল শ্রবণের বাধ্যবাধকতা')।

২. একসাথে দেওয়া ৩ তালাকের ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদীস (সহীহ মুসলিম: ১৪৭২) অনুযায়ী ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা যাবে কি?

না, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী একসাথে এক মজলিসে বা এক বাক্যে প্রদত্ত ৩ তালাককে ১ তালাক ধরার কোনো সুযোগ নেই; বরং এর দ্বারা ৩ তালাকই (তালাকে মুগাল্লাযাহ) পতিত হয়ে গেছে।

  • ফিকহী ব্যাখ্যা: ১. চার মাযহাব ও জমহুরের ঐকমত্য: ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ চার মাযহাবের সমস্ত ফকীহ এবং সাহাবা-তাবেঈনদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) হলো—এক সাথে ৩ তালাক দেওয়া নাজায়েয ও 'তালাকে বিদআত' হলেও কেউ যদি রাগের মাথায় বা এক মুখে "তোকে ৩ তালাক দিলাম" বা এক সাথে ৩ বার তালাক উচ্চারণ করে, তবে শরীআতের বিচারে ৩ তালাকই কার্যকর হয়ে বিবাহ চূড়ান্তভাবে ভেঙে যায় (তালাকে মুগাল্লাযাহ পড়ে)। ২. সহীহ মুসলিমের হাদীসের ফিকহী ব্যাখ্যা: হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত সহীহ মুসলিমের ১৪৭২ নম্বর হাদীসের ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ও হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় জোর দিয়ে এক তালাককে ৩ বার উচ্চারণ করলে ("তালাক, তালাক, তালাক") তাকিদ (জোড় দেওয়া) উদ্দেশ্য হতো এবং তা ১ তালাক হিসেবে গণ্য হতো। পরবর্তীতে হযরত উমর (রা.)-এর যুগে মানুষ যখন তাকিদ ছাড়া এক সাথে ৩ তালাক দেওয়া শুরু করে, তখন সাহাবায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রমে শাস্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ৩ তালাককেই চূড়ান্ত ৩ তালাক হিসেবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এর ওপরই ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩. প্রয়োজন বা জরুরতের অজুহাত: কেবল নিজেদের সুবিধা বা জরুরতের কথা বিবেচনা করে ইজমা ও চার মাযহাবের ফতোয়া বাদ দিয়ে দুর্বল বা রহিতকৃত ব্যাখ্যা গ্রহণ করা শরীআতের দৃষ্টিতে স্বকীয় মতানুসরণ (তাতাব্বুউ রুখাস) এবং তা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ:

    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৬, ২৬৭ (অধ্যায়: 'তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান — এক সাথে তিন তালাক দিলে তালাকে বিদআত হিসেবে তিন তালাকই পতিত হওয়া এবং তালাকে মুগাল্লাযাহ সাব্যস্ত হওয়া')।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৩৬, ২৩৭ (হিন্দিয়াহ ১/৪৭৩) (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — 'এক সাথে বা এক বাক্যে তিন তালাক দেওয়ার ফিকহী হুকুম')।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১২াশ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮২, ১৯৩, ২২৫ (অধ্যায়: বাব وقوع الطلاق — 'এক সাথে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হওয়া এবং হীলা ব্যতীত বিবাহ বাতিল হওয়া সংক্রান্ত প্রামাণ্য ফতোয়া')।

৩. ২ মাস পর পারিবারিকভাবে যে দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে তা সহিহ হয়েছে কি? তাদের কি 'হিলা'র প্রয়োজন আছে?

না, ২ মাস পর পারিবারিকভাবে তাদের যে দ্বিতীয় বিয়েটি হয়েছিল, তা শরীআতের দৃষ্টিতে একেবারেই সহিহ বা বৈধ হয়নি; এই নিকাহ বাতিল ও অকার্যকর ছিল।

  • ফিকহী ব্যাখ্যা: ১. প্রথম স্বামী কর্তৃক ৩ তালাক (তালাকে মুগাল্লাযাহ) পতিত হওয়ার পর স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ 'হারাম' হয়ে যায়। ২. ৩ তালাকের পর সরাসরি বা কেবল ২ মাস পর ইদ্দতের ভেতর/পরে নতুন করে কাবিন ও মোহর ধার্য করে পুনঃবিবাহ (তাজদীদে নিকাহ) করলেও সেই বিবাহ সংঘটিত হয় না। ৩. শরঈ হালালা/হিলার বাধ্যবাধকতা: ৩ তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কেবল তখনই প্রথম স্বামীর জন্য পুনরায় হালাল হতে পারে, যখন সে প্রথম স্বামীর ইদ্দত শেষ করে অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সহীহ নিকাহে আবদ্ধ হবে, সেই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে প্রকৃত দাম্পত্য ও শারীরিক মিলন ঘটবে এবং পরবর্তীতে সেই দ্বিতীয় স্বামী তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তালাক দেবে কিংবা মৃত্যুবরণ করবে; অতঃপর তার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বামী তাকে নতুন মোহরে বিয়ে করতে পারবে। ৪. বর্তমান অবস্থার হুকুম: যেহেতু শরঈ হালালা ব্যতীতই তারা গত ৫ বছর যাবৎ একত্রে বসবাস করছে, তাই ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে তাদের এই বৈবাহিক জীবন ও সহবাস বৈধ হয়নি। তাদের জন্য অবিলম্বেই পৃথক হয়ে যাওয়া এবং খাঁটি তাওবা-ইস্তিগফার করা ফরয ও আবশ্যক।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ:

    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৭ (অধ্যায়: 'পরিণাম হিসেবে তালাকের প্রকারভেদ — তালাকে মুগাল্লাযা এবং শর'য়ী হীলা ব্যতীত নতুন বিবাহের অকার্যকারিতা')।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১২াশ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮২, ১৯৩ (অধ্যায়: বাবুল ফাসখি ওয়াত তাফরীইক — 'তিন তালাকের পর হীলা ছাড়া নতুন বিবাহ বাতিল হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া')।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৯৭ (হিন্দিয়াহ ১/৪৭৩) (অধ্যায়: কিতাবুর রাজআহ — 'তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীর হীলা ছাড়া প্রথম স্বামীর নিকট ফিরে আসার নিষেধাজ্ঞা')।

৪. বর্তমানে রাগের মাথায় "চলে যাবো, সংসার করবো না" এবং স্বামীর "যাও" বলায় কি তালাক হয়?

এই জাতীয় কথাবার্তার কারণে নতুন করে কোনো তালাক পতিত হয় না। উক্ত নারী পুরুষের যেহেতু বিয়েই শুদ্ধ হয় নাই, তাই তালাকের কোনো প্রশ্নই আসে না।

  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ:
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩০০, ৩০১, ৩০২ (হিন্দিয়াহ ১/৩৭৪, ৩৭৫) (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৫ম পরিচ্ছেদ: কিনায়াহ তালাক — 'নিয়ত ছাড়া "যাও" বা কিনায়াহ শব্দে তালাক অকার্যকর হওয়া')।
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৩শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৫, ৮৭ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — 'কিনায়াতের মাসআলা: নিয়ত ছাড়া অস্পষ্ট বাক্যে তালাক না হওয়ার প্রামাণ্য ফতোয়া')।

৫. হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে এই ক্ষেত্রে অন্য সহীহ হাদীসের ওপর আমল করা যাবে কি?

না, নিজেকে হানাফী মাযহাবের অনুসারী দাবি করে কিংবা হানাফী ফিকহে বহাল থেকে কেবল নিজের ব্যক্তিগত সুবিধা বা সংকট থেকে বাঁচার জন্য অন্য মাযহাব বা বিচ্ছিন্ন মতামত (যেমন: ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা) গ্রহণ করা ফুকাহায়ে কেরামের নিকট শরীআতসম্মত নয়।

  • ফিকহী মূলনীতি: ফিকহের দৃষ্টিতে একে 'তাতাব্বুউ রুখাস' (تتبع الرخص - নিজের খেয়ালখুশি মতো সহজ মত খোঁজা) বা 'তাকলীদে শাহওয়ানী' বলা হয়, যা সর্বসম্মতিক্রমে নাজায়েয ও হারাম। হানাফী ফিকহের ওপর আমল করতে চাইলে তিন তালাকের শরঈ ফয়সালাকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে হবে।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.