হানাফি মতে লুকানো বিয়ে সহিহ কি? একসাথে তিন তালাককে এক তালাক ধরা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বোন ও তার স্বামী দুইজনই প্রাপ্তবয়স্ক ছিল। পরিবারকে না জানিয়ে তারা নিজেরা রেজিস্ট্রি ও কবুল বলে বিয়ে করে। বিয়ের সাক্ষী ছিল ছেলেপক্ষের ছেলের ভাই, আর মেয়েপক্ষের ছেলের দূরসম্পর্কের এক মামা, কিন্তু কারো বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্য কেউ জানতো না।
কিছুদিন পর কোনো একটা ঝামেলার কারনে, রাগের মাথায় আমার বোনকে তার স্বামী বলে "তোকে তালাক দিলাম" এবং একসাথে ৩ বার "৩ তালাক" বলে দেয়। এরপর তাদের ২ মাস কোনো যোগাযোগ ছিল না।
২ মাস পর তারা আবার যোগাযোগ করে এবং ভুল বুঝতে পেরে দুই পরিবারকে জানিয়ে পারিবারিকভাবে নতুন মোহর ধার্য করে আবার বিয়ে করে। আলহামদুলিল্লাহ এখন সেই বিয়ের ৫ বছর চলছে।তবে লুকিয়ে বিয়ের তালাক দেওয়ার কথা টা দুই পরিবারের বাবা মা রা জানেন না,,হাতে গোনা ২-৪ জন জানেন,,
এছাড়াও বর্তমানে আমার বোন রাগ হলে বলে "সংসার করবো না, গায়ে হাত দিলে চলে যাবো, ছেড়ে যাবো", মাঝে মাঝে তার স্বামীও রাগ হয়ে বলে "যাও"। এতে কি তালাক পতিত হয়?
*আমার প্রশ্ন হলো:*
১. তাদের প্রথম লুকানো বিয়েটা কি হানাফি মতে সহিহ হয়েছিল?
২. একসাথে দেওয়া ৩ তালাকের ক্ষেত্রে সহিহ মুসলিমের ১৪৭২ নং হাদিস (ইবনে আব্বাস রাঃ এর হাদিস) অনুযায়ী ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা যায় কি? কারণ তাদের জরুরত।
৩. যদি ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা হয়, তাহলে ২ মাস পর পারিবারিকভাবে যে দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে সেটা কি সহিহ হয়েছে? তাদের কি হিলার প্রয়োজন আছে?
৪. বর্তমানে তারা রাগের সময় যে "চলে যাবো, সংসার করবো না, যাও" - এই জাতীয় কথা বলে, এতে কি তালাক হয়?
তারা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে এবং হানাফি থাকতে চায়। তবে এই ক্ষেত্রে সহিহ হাদিসের উপর আমল করা যাবে কি?
দয়া করে জানালে উপকৃত হব।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ধৈর্য ধরে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো। প্রথমেই একটি মূল বিষয় স্পষ্ট করে নিন: হানাফি মাজহাবের মূলনীতি হলো—কুরআন ও সহিহ হাদিসের যে ব্যাখ্যা সাহাবা-তাবেয়ীন ও ফুকাহায়ে কেরাম (বিশেষত ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর যুগ থেকে চলে আসছে, সেটাই গ্রহণ করা। সহিহ হাদিসকে বাদ দেওয়া হানাফি মাজহাবের নীতি নয়; বরং হাদিসের সঠিক ফিকহি ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরামের ইজতিহাদ মানা হয়। নিচে বিস্তারিত।
১. প্রথম লুকানো বিয়েটি হানাফি মতে সহিহ হয়েছিল কি?
হ্যাঁ, সহিহ হয়েছিল। হানাফি মতে বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও সম্মতি) — যা হয়েছে।
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, মুসলিম সাক্ষী উপস্থিত থাকা — আপনার বর্ণনা অনুযায়ী ছেলেপক্ষের ভাই ও মেয়েপক্ষের দূরসম্পর্কের মামা সাক্ষী ছিলেন। হানাফি মতে সাক্ষীর জন্য ন্যূনতম শর্ত হলো: প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, মুসলিম হওয়া। তাদের ন্যায়পরায়ণ (আদিল) হওয়া হানাফি মতে বিয়ে সহিহ হওয়ার শর্ত নয় (বরং আদালতের বিচারের ক্ষেত্রে বিবেচ্য)। আর সাক্ষীরা ছেলে বা মেয়ের নিকট আত্মীয় হলেও হানাফি মতে সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য; শুধু পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি একে অপরের পক্ষে সাক্ষী হতে পারবে না — এখানে সাক্ষীরা সেই শ্রেণির নন।
- পাত্র-পাত্রী প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমান — ছিল।
- বাধা (মাহরাম সম্পর্ক) না থাকা — উল্লেখ নেই, ধরে নিচ্ছি নেই।
পরিবারকে না জানানো বা গোপন রাখা বিয়ে সহিহ হওয়ার শর্ত নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ নিজেদের সম্মতিতে বিয়ে করলে তা সহিহ; অভিভাবকের অনুমতি হানাফি মতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিয়ের জন্য শর্ত নয় (যদিও সামাজিকভাবে পরিবারকে জানানো কর্তব্য)। সুতরাং প্রথম বিয়েটি সহিহ ছিল এবং তা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
রেফারেন্স: আল-হিদায়া (কিতাবুন নিকাহ), রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ৩/৯-১০, ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুন নিকাহ), বাদায়েউস সানায়ে।
২. একসাথে দেওয়া ৩ তালাককে ১ তালাক ধরা যাবে কি? (সহিহ মুসলিম ১৪৭২-এর আলোকে)
এখানে দুটি স্তর আলাদা করতে হবে:
(ক) হাদিসটির বিষয়বস্তু কী?
সহিহ মুসলিমের ১৪৭২ নং হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে, আবু বকর (রা.)-এর যুগে এবং উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসাথে তিন তালাককে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো। পরে উমর (রা.) তা তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর করেন। এছাড়া সহিহ মুসলিমেই ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে—আবু রুকানা (রা.) একসাথে তিন তালাক দিলে নবী ﷺ তাকে বলেছিলেন, "এটা তো এক তালাক" (অর্থাৎ এক তালাক গণ্য করে ফিরিয়ে দেন)।
(খ) হানাফি ফিকহে এর প্রয়োগ কী?
হানাফি ফিকহে এক বৈঠকে বা একসাথে তিন তালাক বললে তিন তালাকই পতিত হয় এবং তা মুগাল্লাজা (বাইন) তালাক হিসেবে কার্যকর হয়। এরপর হিলা ছাড়া পুনর্বিবাহ বৈধ নয়। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত এটাই।
হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম সহিহ হাদিসটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে:
- ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনাটি ছিল শরীয়তের প্রাথমিক অবস্থা (যেমন উমর (রা.)-এর যুগে পরিবর্তন হয়েছে), এবং পরবর্তীতে উমর (রা.)-এর ইজমা-সাহাবা ও আমল দ্বারা তা রহিত/পরিবর্তিত হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হানাফি মতে শক্তিশালী দলিল।
- আবু রুকানা (রা.)-এর হাদিসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসীন ও ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে বর্ণনার তারতম্য আছে (কোনো বর্ণনায় "তিন তালাক", কোনো বর্ণনায় "এক তালাক" শব্দ)। হানাফি মুহাক্কিকীন বলেন, সেটি এক তালাকের ঘটনা ছিল বা বিশেষ পরিস্থিতি ছিল; সর্বজনীন বিধান নয়।
- তালাক একটি হুকুমি বিষয়; তাতে "জরুরত" বা "অভাব" বলে শরীয়তের বিধান বদলায় না। তালাকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার জন্য "প্রয়োজন" দলিল নয়।
সুতরাং হানাফি মাজহাব অনুযায়ী: একসাথে তিনবার "তালাক" বলা বা "তিন তালাক" বলা = তিন তালাক পতিত, অর্থাৎ মুগাল্লাজা বাইন তালাক। এক তালাক ধরা যাবে না।
রেফারেন্স: আল-হিদায়া (কিতাবুত তালাক, باب الطلاق بالكناية ও عدد الطلاق), রাদ্দুল মুহতার ৩/২৩২-২৩৫, ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুত তালাক), ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.), ফাতাওয়া উসমানি ২/৩২৪-৩২৬ (মুফতি তাকি উসমানি), মাআরিফুল কুরআন (সূরা বাকারা ২২৯-এর তাফসির)।
বিশেষ নোট: আপনি লিখেছেন "তোকে তালাক দিলাম" এবং একসাথে ৩ বার "৩ তালাক" বলেছে। হানাফি মতে স্পষ্ট শব্দ (সরীহ) দ্বারা তালাক পতিত হয়, নিয়তের প্রয়োজন নেই। আর "তিন তালাক" বললে তিনটিই পতিত। তাই এখানে তিন তালাক পতিত হয়েছে — এটাই হানাফি মাজহাবের অকাট্য বিধান।
৩. দ্বিতীয় বিয়ে কি সহিহ হয়েছে? হিলার প্রয়োজন আছে কি?
যেহেতু হানাফি মতে তিন তালাক পতিত হয়েছে (মুগাল্লাজা বাইন তালাক), সেহেতু:
- প্রথম স্বামীর সাথে ২ মাস পর যে "নতুন মোহর ধার্য করে পারিবারিকভাবে আবার বিয়ে" হয়েছে — সেটি হানাফি মতে সহিহ হয়নি। কারণ তিন তালাকের পর হিলা (বৈধ বিয়ে ও দাম্পত্য সম্পন্ন করে তালাক বা স্বামীর মৃত্যু) ছাড়া প্রথম স্বামীর সাথে পুনর্বিবাহ বৈধ নয়। কুরআনে স্পষ্ট: "সে (স্ত্রী) তার জন্য বৈধ হবে না যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে বিয়ে করে..." (সূরা বাকারা: ২৩০)।
- হিলা ছাড়া তাদের বর্তমান সহবাস ও সম্পর্ক ইসলামি দৃষ্টিতে বৈধ নয় —
- হিলার শর্ত: স্ত্রী অন্য একজন মুসলিম পুরুষকে সহিহভাবে বিয়ে করবে, তার সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করবে (শুধু কাগজে নয়), এরপর সেই স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে বা মৃত্যুর মাধ্যমে সম্পর্ক শেষ হলে ইদ্দত পালন করে তবে প্রথম স্বামীর সাথে নতুন মোহর ও নতুন বিয়ের মাধ্যমে পুনর্বিবাহ বৈধ হবে। কোনো ব্যক্তিকে "হিলা করার জন্য" পূর্বপরিকল্পিতভাবে নিয়োগ দেওয়া হারাম ও কবিরা গুনাহ (হাদিসে লানত এসেছে)।
তাই বর্তমান অবস্থায় তাদের করণীয়: যেহেতু দ্বিতীয় বিয়ে সহিহ হয়নি, সেহেতু তাদের আলাদা থাকা ও ইদ্দত পালন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরি, যতক্ষণ না হিলা সম্পন্ন হয়। এটি কঠিন মনে হলেও দ্বীনের হুকুম মানা ইমানের দাবি। আল্লাহ সহজ করুন।
রেফারেন্স: সূরা বাকারা ২২৯-২৩০, আল-হিদায়া (باب المحلل), রাদ্দুল মুহতার ৩/২৪৫-২৪৮, ফাতাওয়া উসমানি ২/৩৩০-৩৩২, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/২৪০-২৪২।
৪. বর্তমানে তারা বলে "সংসার করবো না, গায়ে হাত দিলে চলে যাবো, ছেড়ে যাবো", "যাও" — এতে কি তালাক হয়?
জবাবঃ- তাদের তো বর্তমান বিবাহই শুদ্ধ নাই,সুতরাং এক্ষেত্রে তালাকের তো কোনো প্রশ্নই উঠেনা।