ইনফ্লুয়েন্সার দিয়ে হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন করানোর কি জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
ব্যবসার প্রয়োজনে ইনফ্লুয়েন্সার দিয়ে পণ্যের প্রচার করানোর বিষয়ে দুটি প্রশ্ন ছিল।
প্রশ্ন ১: কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের পেইজে যদি মিউজিক, বেপর্দা ছবি বা ভিডিও থাকে এবং তিনি দ্বীন সচেতন না হন, তাহলে তাকে দিয়ে হালাল পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো কি জায়েজ হবে?অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তাকে শর্ত দেওয়া হবে যে, কোনো মিউজিক, বেপর্দা দৃশ্য বা শরিয়াহবিরোধী কিছু ব্যবহার করা যাবে না। বিজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ হালাল পদ্ধতিতে করতে হবে।এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনটি জায়েজ হবে কি? নাকি তার পেইজে বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে তার পেইজের প্রচার-প্রসার এবং অন্যান্য হারাম কাজকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হবে?
প্রশ্ন ২: একজন ক্রিকেটার, অভিনেতা বা জনপ্রিয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামিক পণ্য, ইসলামিক প্ল্যানার, দ্বীনশিক্ষামূলক বই কিংবা দাওয়াতি পণ্যের প্রচার করানো কি জায়েজ হবে? যেমন, ওই ব্যক্তির পেইজে মিউজিক, বেপর্দা ছবি বা অন্যান্য অনৈসলামিক কনটেন্ট রয়েছে। তবে আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ হালাল পদ্ধতিতে করতে হবে এবং মিউজিক ও বেপর্দা দৃশ্য ব্যবহার করা যাবে না। এক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, তার অডিয়েন্সের মধ্যে অনেকেই দ্বীন থেকে দূরে রয়েছেন। তার মাধ্যমে ইসলামিক পণ্যের প্রচার হলে তাদের কাছেও দ্বীন সংশ্লিষ্ট বিষয় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। তাহলে এভাবে প্রচার করানো কি জায়েজ হবে? নাকি এর মাধ্যমে ওই ব্যক্তির লাইফস্টাইল, পেইজের জনপ্রিয়তা এবং হারাম কাজগুলোকে পরোক্ষভাবে সাপোর্ট করা হবে?
দয়া করে কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়াহর আলোকে দুটি প্রশ্নের উত্তর জানালে উপকৃত হতাম। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
ব্যবসার প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, ক্রিকেটার বা সেলিব্রিটিদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া সংক্রান্ত আপনার দুটি প্রশ্নেরই ফিকহে হানাফী ও আধুনিক ফিকহী গবেষণার আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: অনৈসলামিক কনটেন্ট থাকা ইনফ্লুয়েন্সারকে দিয়ে শর্তসাপেক্ষে হালাল বিজ্ঞাপন করানো
মূল সিদ্ধান্ত: কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের পেইজে মিউজিক, বেপর্দা দৃশ্য বা অনৈসলামিক কনটেন্ট থাকলেও, যদি তাকে চুক্তি বা শর্ত দিয়ে সম্পূর্ণ হালাল পদ্ধতিতে (কোনো মিউজিক, বেপর্দা দৃশ্য বা শরীআতবিরোধী উপাদান ছাড়া) বিজ্ঞাপন দিতে দেওয়া হয়, তবে শরীআতের দৃষ্টিতে এই বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং তাকে দিয়ে প্রচার করানো মূলগতভাবে জায়েয ও বৈধ।
ফিকহী ব্যাখ্যা ও মূলনীতি:
১. 'ইআনাত আলাল মাসিয়াত' (গুনাহে সহায়তার) শরঈ সীমানা: কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾ (অর্থ: তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।—সূরা মায়িদাহ: ২)।
ফিকহের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো চুক্তি সরাসরি তখনই 'ইআনাত আলাল মাসিয়াত' (গুনাহে সাহায্য) হিসেবে হারাম হয়, যখন চুক্তির মূল বিষয়বস্তু (মজিদে ইজারা/মজিদে আকদ) নিজেই একটি হারাম কাজ হয় কিংবা তাতে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বা নিয়ত থাকে।
২. চুক্তির স্বতন্ত্রতা (محل العقد): এখানে আপনি যে চুক্তিটি করছেন, তার বিষয়বস্তু হলো—একটি হালাল পণ্যের শরীআতসম্মত প্রচার। বিজ্ঞাপনে মিউজিক বা বেপর্দার শর্ত না থাকায় আপনার এই লেনদেনটি সম্পূর্ণ হালাল। ইনফ্লুয়েন্সারের পেইজে বিদ্যমান অন্যান্য মিউজিক বা বেপর্দা ভিডিও তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত কাজ ও গোনাহ; আপনার এই হালাল চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সেই গোনাহের কাজে সরাসরি কোনো সহায়তা করা হচ্ছে না।
৩. ইজারার শরঈ নিয়ম: হালাল কাজের জন্য কোনো ফাসিক বা অদ্বীনদার ব্যক্তিকে ভাড়া করা (ইজারা চুক্তি) ফিকহে হানাফীতে জায়েয। কারণ পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে তাঁর হালাল প্রচারকার্যের বিনিময়ে, তাঁর ব্যক্তিগত গোনাহের জন্য নয়।
২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: ক্রিকেটার বা অভিনেতার মাধ্যমে ইসলামিক পণ্য/বই/দাওয়াতি সামগ্রীর প্রচার করানো
মূল সিদ্ধান্ত: জনপ্রিয় ক্রিকেটার, অভিনেতা বা কোনো ব্যক্তির পেইজে অনৈসলামিক কনটেন্ট থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের মাধ্যমে ইসলামিক পণ্য, ইসলামিক প্ল্যানার, দ্বীনশিক্ষামূলক বই বা দাওয়াতি পণ্যের প্রচার করানো জায়েয ও বৈধ।
ফিকহী ব্যাখ্যা ও মূলনীতি:
১. দাওয়াতি সুযোগ ও ইতিবাচক দিক: উক্ত ব্যক্তির বিশাল অডিয়েন্সের কাছে যদি সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে (মিউজিক ও বেপর্দা দৃশ্য ছাড়া) দ্বীনী বই বা দাওয়াতি পণ্য পৌঁছানো যায়, তবে ফিকহী দৃষ্টিতে এতে কল্যাণের দিক অর্জিত হয়। কারণ এর মাধ্যমে সাধারণ ও দ্বীন থেকে দূরে থাকা মানুষদের নিকট দ্বীনের বার্তা ও সামগ্রী পৌঁছানোর একটি মাধ্যম তৈরি হচ্ছে।
২. পরোক্ষ সহায়তা সংক্রান্ত বিধান: উক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত লাইফস্টাইল বা পেইজের অনৈসলামিক কাজগুলোর দায়ভার তাঁর নিজের ওপর বর্তাবে। আপনার বিজ্ঞাপনটি যদি শতভাগ হালাল ও শরীআতসম্মত ফ্রেমে প্রচারিত হয়, তবে ফিকহের পরিভাষায় একে হারাম 'ইআনাত' (সরাসরি গোনাহে সাহায্য) বলা যাবে না; বরং এটি একটি বৈধ সাবাব বা মাধ্যম।
৩. সতর্কতা ও শিষ্টাচার (تقوى ও উপদেশ): যদিও মূল লেনদেনটি জায়েয, তবুও যদি কোনো ব্যক্তি বা সেলিব্রিটির পেইজে অত্যন্ত বেহায়াপনা বা ইসলামবিদ্বেষী কনটেন্ট থাকে এবং তাঁকে দিয়ে প্রচার করালে সমাজের মানুষ তাঁর ফাসেকী কর্মকাণ্ডকে পছন্দ করতে শুরু করে (তা'জীমুল ফাসিক), তবে যথাসম্ভব দ্বীনদার ও মার্জিত ইনফ্লুয়েন্সার খুঁজে নেওয়াটা تقوى (তাকওয়া) ও সতর্কতার দিক থেকে উত্তম। কিন্তু যদি বিকল্প না থাকে বা দাওয়াতি স্বার্থ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে শর্তসাপেক্ষে হালাল প্রচার সম্পূর্ণ বৈধ।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারা (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৪৫, ৩৪৬ (অধ্যায়: 'হুকমুল ইআনাহ আলাল মাসিয়াহ — সরাসরি গুনাহে সাহায্য ও পরোক্ষ মাধ্যমের ফিকহী ফারাক এবং দূরবর্তী উপকরণের জায়েয হওয়ার মাসআলা')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৮১, ১২২ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ূ, বাবুল বিয়িইল মাকরুহ — 'গুনাহের উপকরণের কেনাবেচা এবং গোনাহে ইআনাতের সুনির্দিষ্ট শরঈ সীমানা')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৭শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১১, ১১৫ (অধ্যায়: বাবুল ইস্টেজারি আলাল মাআসি — 'অনৈসলামিক বা ফাসিক ব্যক্তির সাথে হালাল কাজের ইজারা চুক্তির ফতোয়া')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫৮৯ (অধ্যায়: আল-ফাসলুর রাবি ফিল ইআনাতিল ফুসসাকি ওয়াল ফুজজার — 'ফাসিক ব্যক্তির সাহায্যে হালাল কাজের বিধান')।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৬৯ (অধ্যায়: 'ইজারা ও নাজায়েয কাজে চুক্তি সম্পাদনের ফিকহী আহকাম')।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৮৬, ৩৮৭ (অধ্যায়: কিতাবুল বুয়ূ — 'ইজারা ও কেনাবেচায় শর্তাবলীর প্রভাব')।
والله أعلم بالصواب