কোনো স্ত্রী স্বামীর কথায় বাসা ছেড়ে চলে গিয়ে ফিরে না এলে কি তালাক পতিত হয়? স্বামী তালাকের নিয়ত না করলে কী তালাক হবে? তাফবীয (তালাকের অধিকার) থাকলে স্ত্রীর চলে গেলে কি তালাক পতিত হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7922
Questioner: Khadijatun Nur
Question Asked: 04 Nov 2026, 12:17 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 05:56 PM
Views: 23
Tokens: 6,727
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো স্ত্রী যদি বলে, “আমি তালাক চাই না। কিন্তু তুমি যদি চাও, তাহলে আমাকে খুলা দিতে পারো। আমি বাসায় চলে যেতে চাই।”

স্বামী যদি বলে, “চলে যাও।”

স্ত্রী যদি বলে, “চলে যাও মানে?”

স্বামী যদি বলে, “বাসা থেকে কয়েকদিন ঘুরে আসো। দেখো, আমাকে তোমার দরকার আছে কি না। দরকার হলে এসো। একজনের চেষ্টায় সংসার টিকে না।”

এখন স্ত্রী যদি বাসা থেকে চলে যায় এবং আর ফিরে না আসে, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে? অর্থাৎ, এভাবে স্বামীর কথায় বাসা ছেড়ে চলে গিয়ে আর না এলে কি কোনো সমস্যা হবে?

আর স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (তালাকের অধিকার) দেওয়া থাকলে, স্ত্রী যদি নিজে থেকে আর ফিরে না আসে, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে? স্বামীর কথার কারণে কি কোনো সমস্যা হবে, যদি স্বামী কথাগুলো বলার সময় তালাকের কোনো নিয়ত না করে থাকে?

Answer

প্রশ্নোক্ত মাসআলার বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

সংক্ষিপ্ত উত্তর (খুলাসা)

প্রশ্নে বর্ণিত কথোপকথনে স্বামী তালাকের কোনো স্পষ্ট শব্দ (তালাক, খুলা, ছাড়া ইত্যাদি) উচ্চারণ করেননি, বরং বলেছেন—"বাসা থেকে কয়েকদিন ঘুরে আসো, দেখো আমার দরকার আছে কি না।" এ ধরনের কথা তালাকের কোনো প্রকার (সরীহ বা কিনায়া) নয়; বরং এটি একটি উপদেশমূলক ও পরীক্ষামূলক বাক্য। তাই এতে তালাক পতিত হবে না, চাই নিয়ত থাকুক বা না থাকুক। স্ত্রী বাসা ছেড়ে চলে গেলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক সংঘটিত হবে না; তবে নৈতিক ও পারিবারিক দায়িত্বের দিক থেকে এটি গুরুতর সমস্যা, যা পরে আলোচিত হবে।

আর যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের অধিকার (তাফবীয) দিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক প্রয়োগ করতে পারবে—কিন্তু শুধু তখনই, যখন সে স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ ব্যবহার করবে। শুধু "বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া ও ফিরে না আসা" নিজে থেকে তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না সে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে বা তালাকের নিয়তে কিনায়া শব্দ বলে।


১. মূল নীতি: তালাক হয় কীভাবে?

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক সংঘটিত হয় দুইভাবে:

(ক) সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ: "তালাক", "তালাক দিলাম", "তুমি তালাক", "খুলা" ইত্যাদি। এতে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শব্দ উচ্চারণেই তালাক পতিত হয়।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক: «فَإِنْ كَانَ صَرِيحًا لَا يَحْتَاجُ إِلَى النِّيَّةِ» — "সরীহ শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই।"

(খ) কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ: "যাও", "বেরিয়ে যাও", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম" (নিয়ত ছাড়া), "তোমার পথ দেখো" ইত্যাদি। এতে নিয়ত বা circumstantial evidence (হালতের قرينة) ছাড়া তালাক পতিত হয় না।

রেফারেন্স: আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুত তালাক: «وَالْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ» — "কিনায়া শব্দে নিয়ত বা হালতের قرينة ছাড়া তালাক পতিত হয় না।"


২. প্রশ্নোক্ত কথাগুলোর বিশ্লেষণ

স্বামীর কথাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখি:

| স্বামীর কথা | ফিকহি প্রকৃতি | তালাক পতিত হবে? | |---|---|---| | "চলে যাও" (প্রথমবার) | কিনায়া—কিন্তু পরবর্তী বাক্যে স্পষ্ট হয় যে উদ্দেশ্য ভিন্ন | না | | "বাসা থেকে কয়েকদিন ঘুরে আসো, দেখো আমার দরকার আছে কি না" | উপদেশ/পরীক্ষা—তালাকের কোনো শব্দই নয় | না | | "দরকার হলে এসো, একজনের চেষ্টায় সংসার টিকে না" | নসীহত ও সমঝোতার আহ্বান | না |

এখানে লক্ষণীয়: স্বামী "চলে যাও" বলার পরই নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন যে উদ্দেশ্য কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসা ও পরীক্ষা—অর্থাৎ এটি স্থায়ী বিচ্ছেদ বা তালাকের ইচ্ছা নয়। হানাফি ফিকহে এমন বাক্যকে "কিনায়া"ও গণ্য করা হয় না, বরং এটি "আমর বিল-মা'রূফ" (সদুপদেশ) এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ কিনায়া শব্দ হিসেবে গণ্য হতে হলে তাতে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকতে হয়; এখানে তো স্বামী নিজেই ফিরে আসার কথা বলেছেন।

রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক—কিনায়া শব্দের আলোচনা; ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ২, তালাক অধ্যায়।

সিদ্ধান্ত: স্বামী তালাকের নিয়ত করেননি, এবং কথাগুলোও তালাকের শব্দ নয়—তাই তালাক পতিত হয়নি। স্ত্রী বাসা ছেড়ে চলে গেলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ বহাল আছে।


৩. স্ত্রী চলে গিয়ে ফিরে না এলে কী হবে?

(ক) শরীয়তের হুকুম (তালাকের দিক থেকে)

যেহেতু তালাক পতিত হয়নি, তাই বিবাহ বহাল আছে। স্ত্রী "ফিরে না আসা" মানে তালাক নয়; বরং এটি নুশূয (نُشُوز—স্বামীর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া) বা পারিবারিক বিরোধ হিসেবে গণ্য হবে।

(খ) নৈতিক ও পারিবারিক দিক

  • স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন বাসা ছেড়ে থাকা শরীয়তসম্মত নয়; এটি স্বামীর হক নষ্ট করার শামিল।
  • স্বামীর জন্যও স্ত্রীকে পরীক্ষার নামে বাসা থেকে বের করে দেওয়া উচিত হয়নি; ইসলামে সমঝোতা ও সদাচরণ কাম্য।

কুরআন: «وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» — "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

হাদিস: «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ» — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)

(গ) আইনি/পারিবারিক পরিণতি

  • স্ত্রী ফিরে না এলে স্বামী তালাক দেওয়ার অধিকার রাখে (সরীহ শব্দে), অথবা পারিবারিক সালিশের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
  • স্ত্রী যদি তালাক ছাড়াই অন্যত্র বিবাহ করতে চায়, তা হারাম ও বাতিল—কারণ বিবাহ বহাল।
  • স্ত্রী যদি খুলা (তালাকের বিনিময়) চায়, তবে স্বামীর সম্মতিতে শরীয়তসম্মত পন্থায় হবে।

৪. তাফবীয (তালাকের অধিকার প্রদান) থাকলে কী হবে?

তাফবীযের সংজ্ঞা

স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে—"তোমার হাতে তালাকের অধিকার", "তুমি নিজেকে তালাক দিতে পারো", "তোমার ইখতিয়ার"—তাহলে স্ত্রী নিজে তালাক প্রয়োগ করতে পারবে। এটি তাফবীয নামে পরিচিত।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩: «التَّفْوِيضُ تَمْلِيكُ الطَّلَاقِ» — "তাফবীয হলো তালাকের মালিকানা প্রদান।"

তাফবীয থাকলেও শর্ত

তাফবীয থাকলেও স্ত্রীকে তালাক প্রয়োগ করতে হলে তালাকের শব্দ (সরীহ বা কিনায়া+নিয়ত) ব্যবহার করতে হবে। শুধু "বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া ও ফিরে না আসা" নিজে থেকে তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

রেফারেন্স: আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক—তাফবীয অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, তালাকের তাফবীয।

অর্থাৎ: তাফবীয থাকলে স্ত্রী চাইলে তালাক দিতে পারবে, কিন্তু নিঃশব্দে চলে যাওয়া তালাক নয়। যদি সে তালাকের নিয়তে "আমি নিজেকে তালাক দিলাম" বলে, তবেই তালাক পতিত হবে।


৫. স্বামীর কথার কারণে কি সমস্যা হবে? (নিয়ত না থাকলে)

উত্তর: না, শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো তালাক পতিত হবে না। কারণ:

  1. কথাগুলো তালাকের সরীহ শব্দ নয়।
  2. কিনায়া শব্দও নয়—কারণ উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষা ও সমঝোতা, বিচ্ছেদ নয়।
  3. স্বামী তালাকের নিয়ত করেননি—এবং কিনায়া শব্দে নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না।
  4. স্বামী নিজেই বলেছেন "দরকার হলে এসো"—যা ফিরে আসার আহ্বান, বিচ্ছেদের ঘোষণা নয়।

রেফারেন্স: শরহু মাআনিল আছার (তাহাবি), কিতাবুত তালাক; বাদায়েউস সানায়ে (কাসানি), খণ্ড ৩, তালাকের কিনায়া শব্দ।

তবে নৈতিক দিক থেকে স্বামীর এমন পরীক্ষামূলক কথা বলা ও স্ত্রীকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া উচিত হয়নি; ইসলামে পরিবারিক বিরোধ ধৈর্য, সমঝোতা ও সদাচরণে সমাধান করতে বলে।


৬. করণীয় (নসীহত)

  1. স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে স্বামী উদ্যোগ নিন—এটি তার দায়িত্ব।
  2. পারিবারিক সালিশ (উভয় পক্ষের সম্মানিত আত্মীয়) ডাকুন।
  3. তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইদ্দত, মোহর, নফকা ইত্যাদি শরীয়তের বিধান জেনে নিন।
  4. তাফবীয থাকলে স্ত্রী চাইলে শরীয়তসম্মত পন্থায় তালাক প্রয়োগ করতে পারবে—কিন্তু আবেগে নয়, শরীয়তের শর্ত মেনে।
  5. স্থায়ী বিচ্ছেদ চাইলে উভয় পক্ষ শরীয়তসম্মত তালাক বা খুলা-র পন্থা অবলম্বন করুন; নিঃশব্দে পালিয়ে যাওয়া বা ফিরে না আসা শরীয়তসম্মত পন্থা নয়।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | স্বামীর কথায় তালাক পতিত হয়েছে? | না—কারণ কথাগুলো তালাকের শব্দ নয়, নিয়তও ছিল না | | স্ত্রী চলে গিয়ে ফিরে না এলে তালাক হবে? | না—বিবাহ বহাল; এটি নুশূয/বিরোধ হিসেবে গণ্য | | তাফবীয থাকলে? | স্ত্রী তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক হবে; শুধু চলে যাওয়ায় নয় | | স্বামীর নিয়ত না থাকলে সমস্যা? | শরীয়তগত কোনো সমস্যা নেই; তবে নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে |


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.