পরিবার এখন অনুষ্ঠান করতে না চাইলেও সাক্ষী ও মোহর নির্ধারণ করে এখনই নিকাহ করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া দরকার
আমি একটা হারাম রিলেশনে আছি তো আমাদের এই সম্পর্কের কথা আমাদের দুই ফ্যামিলিকে জানাইছি
তো জানানোর পরে বাসা থেকে কেউ অমত করে নাই তবে এই সময়ে আমাদের পারিবারিকভাবে সম্ভব না বিয়ে করানো আমাদেরকে বলা হয়েছে এক থেকে দুই বছর পরে সম্ভব মেয়ের ফ্যামিলিও বলছে আর আমার বড় ভাই আছে তারপরও ফ্যামিলির পরিস্থিতি সেরকম নেই যে আমাদেরকে এখন শুধুমাত্র বিয়ে পড়াই রাখবে আমি চেষ্টা করছিলাম কিন্তু সম্ভব না
এখন আমরা চাচ্ছি কিভাবে হারাম থেকে বাচবো আমরা যদি নিজেরা সব নিয়মকানুন মেনে সাক্ষী মহারানা নির্ধারণ করে বিয়ে করে রাখি এবং পরবর্তীতে তে ফ্যামিলিগতভাবে আবার হবেই তাহলে কি এটা ঠিক হবে।
এখন আমরা কি করতে পারি এপাপ থেকে বাঁচবো।
দয়া করে একটু জানাবেন।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনাদের বর্তমান হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ ও শরীয়তসম্মত পথ হলো—এখনই নিকাহ করে ফেলা, যদিও পরে পারিবারিকভাবে ওয়ালিমা/সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। নিকাহর জন্য পাত্র-পাত্রীর সম্মতি, দুজন মুসলিম সাক্ষী এবং মোহর নির্ধারণই মূল শর্ত; বড় ভাই বা পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা নিকাহর শর্ত নয়। তবে মেয়ের পক্ষ থেকে ওয়ালি (অভিভাবক)-এর অনুমতি/উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ হানাফি মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে নিজে নিকাহ করতে পারলেও ওয়ালির সম্মতি ছাড়া নিকাহ করা মাকরুহে তাহরিমি এবং ফাসেক/গুনাহের কাজ; আর বর্তমানে অনেক ফিতনার কারণে ওয়ালির অনুমতি ছাড়া গোপন নিকাহ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। পরিবার যদি নিকাহতে বাধা না দেয়, শুধু “এখন অনুষ্ঠান নয়, এক-দুই বছর পরে” বলে, তাহলে এখনই শরীয়তসম্মত নিকাহ করে ফেলুন, পরে অনুষ্ঠান করুন—এটাই হারাম থেকে বাঁচার বৈধ পথ।
বিস্তারিত দলিল ও মাসআলা
১. নিকাহর মূল শর্ত:
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিতদের বিয়ে দাও…” (সূরা আন-নূর: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“চারটি বিষয় নারীর বিয়ের জন্য বিবেচ্য: তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন; তুমি দ্বীনদারকে গ্রহণ করো।” (সহীহ বুখারী: ৫০৯০; সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)
নিকাহর জন্য প্রয়োজন: প্রস্তাব ও গ্রহণ (ইজাব-কবুল), দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী, মোহর নির্ধারণ। বড় ভাইয়ের আর্থিক সামর্থ্য বা ভোজ/অনুষ্ঠান নিকাহর শর্ত নয়।
রাদ্দুল মুহতার (৩/৯)-এ আছে, নিকাহর রুকন হলো ইজাব-কবুল এবং সাক্ষী; মোহর নারীদের হক, যা নির্ধারণ করা আবশ্যক।
২. ওয়ালির অনুমতি:
হানাফি মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্কা বুদ্ধিমতী মেয়ে নিজে নিকাহ করতে পারে, কিন্তু ওয়ালির সম্মতি ছাড়া নিকাহ মাকরুহে তাহরিমি।
রাদ্দুল মুহতার (৩/৫৫)-এ ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বরাতে আছে:
“প্রাপ্তবয়স্কা নারী নিজে নিকাহ করতে পারে, তবে ওয়ালির অনুমতি ছাড়া করলে তা মাকরুহ।”
ফাতাওয়া উসমানি (২/২৭৭)-এও ওয়ালির সম্মতি ছাড়া নিকাহকে মাকরুহ ও ফিতনার কারণ বলা হয়েছে। তাই মেয়ের পরিবারকে রাজি করিয়ে বা অন্তত তাদের সম্মতি নিয়ে নিকাহ করুন।
৩. গোপন নিকাহ নয়:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“এই নিকাহকে গোপন করো না; বরং তা ঘোষণা করো।” (মুসনাদ আহমাদ: ১৪৮৫৩; তিরমিজি: ১০৮৪)
তাই সাক্ষী ও পরিবারের উপস্থিতিতে নিকাহ করুন, গোপনে নয়।
৪. হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচা:
কুরআনে ইরশাদ:
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে বিয়ে করে ফেলুক; কারণ বিয়ে দৃষ্টি সংযত করে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।” (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
আপনাদের ক্ষেত্রে যেহেতু পরিবার নিকাহতে বাধা দিচ্ছে না, শুধু অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিচ্ছে—তাই এখনই নিকাহ করে ফেলা আপনার জন্য ওয়াজিবের কাছাকাছি; কারণ হারাম সম্পর্কে লিপ্ত থাকা নিকাহর চেয়ে অনেক বড় গুনাহ।
৫. পারিবারিকভাবে পরে অনুষ্ঠান:
নিকাহর পরেও পারিবারিকভাবে ওয়ালিমা/ভোজ করা সুন্নত ও জায়েজ। কিন্তু নিকাহকে অনুষ্ঠানের জন্য পিছিয়ে দিয়ে হারাম সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৭৩)-এ আছে, নিকাহর বৈধতা অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল নয়; নিকাহ হয়ে গেলে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস জায়েজ, পরে অনুষ্ঠান করা যাবে।
আপনার করণীয়
- মেয়ের ওয়ালি/পরিবারের সম্মতি নিয়ে দুজন মুসলিম সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিকাহ করে ফেলুন।
- মোহর নির্ধারণ করুন—কমপক্ষে ১০ দিরহাম রূপার সমপরিমাণ (বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা বা বেশি), তবে সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি দিলে ভালো।
- নিকাহ গোপন করবেন না; অন্তত পরিবারের জানা থাকুক।
- নিকাহর পর হারাম সম্পর্কের সব ধরনের অবৈধ সম্পর্ক (প্রেম, নির্জনে সাক্ষাৎ, ফোনে অশ্লীল কথা) বন্ধ করে স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্ক গড়ুন।
- পরে পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠান/ওয়ালিমা করুন—এতে কোনো সমস্যা নেই।
- যদি মেয়ের পরিবার ওয়ালি হিসেবে উপস্থিত না থাকে বা সম্মতি না দেয়, তাহলে কোনো প্রভাবশালী মুসলিম ওয়ালি/কাজি/ইমামের মাধ্যমে নিকাহ সম্পন্ন করুন; গোপনে নয়।
সতর্কতা: শুধু “পরে বিয়ে করব” বলে হারাম সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া যাবে না। এখনই নিকাহ করে ফেলাই আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত পথ।
আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে হারাম থেকে হেফাজত করুন এবং হালাল নিকাহর তাওফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।