পাত্রীর চিকিৎসার খরচ দেওয়ার জন্য আগে বিয়ে করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার সিদ্ধান্তটি — অর্থাৎ পাত্রীর অভিভাবকদের সম্মতিতে ইজাব-কবুল (আকদ) সম্পন্ন করে ফেলা এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাসরঘর/গৃহপ্রবেশ সম্পন্ন করা — শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ও যৌক্তিক। এতে কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই। বরং এটি একটি উত্তম ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
কারণ এতে (ক) পাত্রীর চিকিৎসা-ব্যয় বহনের বৈধ পথ খুলে যায়, (খ) নন-মাহরাম অবস্থায় যোগাযোগের অবৈধতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, এবং (গ) সুন্নাহসম্মত বিবাহের মূল কাজ (আকদ) আগে সম্পন্ন হয়ে যায়।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সতর্কতার সাথে লক্ষণীয়:
১. আকদ সম্পন্ন হলে সম্পর্কের বিধান
আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই পাত্রী আপনার শরীয়তসম্মত স্ত্রী হয়ে যাবেন। তখন:
- আপনি তার মাহরাম হয়ে যাবেন — সরাসরি তার চিকিৎসা-ব্যয় বহন, খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাথে কথা বলা সবই বৈধ হবে।
- তার মাহরামদের সাথে দেখা-সাক্ষাতের বিধান প্রযোজ্য হবে।
- তবে বাসর/গৃহপ্রবেশের আগে শরীয়ত ও সমাজের দৃষ্টিতে সংযম রক্ষা করা কর্তব্য — অর্থাৎ আকদ হয়ে গেলেও প্রকাশ্যে ওয়ালিমা/গৃহপ্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত পূর্ণ সংসারিক সম্পর্ক স্থাপনে বিনয় ও সংযম অবলম্বন করা উচিত, বিশেষত পারিবারিক সম্মান ও সামাজিক প্রথার প্রতি লক্ষ্য রেখে।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক বরকতময়, যে সর্বাধিক সহজ।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০৮৭-এর অধ্যায়; মুসনাদ আহমাদ)
২. মাহর নির্ধারণ ও পরিশোধের বিধান
আকদ সম্পন্ন করার সময় মাহর স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া আবশ্যক। মাহর নির্ধারণ ছাড়া আকদ শুদ্ধ হলেও তা মাহরুল মিসলের বিধান আরোপ করে এবং পরবর্তীতে বিবাদ সৃষ্টি করতে পারে।
- মাহর নির্ধারিত হলে তা মুয়াজ্জাল (তাৎক্ষণিক) বা মুআজ্জাল (বিলম্বিত) — উভয়ই হতে পারে।
- আপনি চাইলে মাহরের একটি অংশ এখন পরিশোধ করে বাকি অংশ পরে পরিশোধের শর্ত করতে পারেন।
- মনে রাখবেন: মাহর নারীর অধিকার; তা তার অভিভাবকের নয়। মাহর পরিশোধে অবহেলা করা ঋণ হিসেবে বহাল থাকবে।
কুরআন: "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মাহর সন্তুষ্টচিত্তে দাও।" (সূরা নিসা: ৪)
ফতোয়ায়ে শামি (রাদ্দুল মুহতার): "মাহর নির্ধারণ করা আকদের বৈধতার জন্য শর্ত নয়, বরং তা মাহরুল মিসলকে আবশ্যক করে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ)
৩. পাত্রীর পিতার অস্বচ্ছলতা ও চিকিৎসা-ব্যয়
আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর পাত্রী আপনার স্ত্রী হওয়ায় তার ভরণপোষণ (নফকা) আপনার দায়িত্বে চলে আসবে — এমনকি গৃহপ্রবেশের আগেও, যদি সে আপনার অধীনে চলে আসে বা আপনাকে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বাস্তবতার নিরিখে:
- গৃহপ্রবেশের আগে পাত্রী তার পিতার ঘরে থাকলে সাধারণত নফকা পিতার দায়িত্বে থাকে; কিন্তু আপনি স্বেচ্ছায় তার চিকিৎসা-ব্যয় বহন করতে পারেন — এটি সদকা/ইহসান হিসেবে গণ্য হবে এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
- আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর আপনি তার মাহরাম, তাই সরাসরি চিকিৎসা-ব্যয় বহনে কোনো শরীয়তগত বাধা নেই।
হাদিস: "সর্বোত্তম দান সেই দান, যা প্রয়োজনের সময় দেওয়া হয়।" (সুনানে আবু দাউদ)
৪. বিলম্ব নিয়ে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি
বিবাহে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব ইসলামে নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে ফেলে; কারণ তা দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪০০)
আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু ঘর নির্মাণের বাস্তব সমস্যা আছে, সেহেতু আকদ আগে সম্পন্ন করে ফেলা এবং পরে গৃহপ্রবেশ করা — এটি সুন্নাহসম্মত ও বাস্তবসম্মত সমাধান। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী আকদ ও বাসরঘরের মাঝে বিলম্ব জায়েয, তবে অকারণ বিলম্ব এড়ানো উচিত।
উপসংহার
আপনার সিদ্ধান্ত শরীয়তসম্মত, যৌক্তিক ও কল্যাণকর। আকদ সম্পন্ন করে পাত্রীর চিকিৎসা-ব্যয় বহন করা — এটি দ্বীনি দায়িত্ব ও মানবিক ইহসানের সমন্বয়। শুধু মাহর নির্ধারণ, অভিভাবকের সম্মতি, সাক্ষী ও লিখিত দলিলের বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার এই উদ্যোগে বরকত দান করুন এবং উভয়কে সুখী দাম্পত্য জীবন দান করুন। আমিন।