“তুমি আমাকে তালাক, তালাক, তালাক বলো” বললে এবং স্ত্রী না বললে তালাক পতিত হয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি বাংলাদেশের একজন মুসলিম। আমার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তালাক-সংক্রান্ত মাসআলা জানতে চাই। অনুগ্রহ করে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী আমার ঘটনাটি বিবেচনা করে সঠিক ফতোয়া প্রদান করবেন।
**আমার ঘটনার বিবরণ:**
আমি আমার স্ত্রীকে সরাসরি বলেছিলাম, “তুমি আমাকে তালাক, তালাক, তালাক বলো।”
আমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু আমার স্ত্রীর মুখ থেকে এই শব্দগুলো শোনা। আমি নিজে তাকে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথাটি বলিনি। এর আগে আমি কখনো আমার স্ত্রীকে তালাক দিইনি।
কথাটি বলার সময় আমি রাগান্বিত ছিলাম, কিন্তু আমি কী বলছি তা বুঝতে পারছিলাম।
**আমার প্রশ্ন:**
১. আমার এই কথার কারণে কি আমার স্ত্রীর ওপর তালাক কার্যকর হয়েছে?
২. যদি তালাক হয়ে থাকে, তাহলে কত তালাক হয়েছে?
৩. যদি তালাক না হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের বিবাহ কি আগের মতো বহাল আছে?
৪. আমাদের এখন কী করণীয়?
উল্লেখ্য যে আমার বউ কিন্তু বলেনি পরে।
আমি বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। অনুগ্রহ করে আমার ঘটনার সঠিক শরয়ি সমাধান জানাবেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার ঘটনায় তালাক পতিত হয়নি। কারণ আপনি নিজে তালাকের শব্দ বলেননি; বরং স্ত্রীকে বলেছেন, “তুমি আমাকে তালাক, তালাক, তালাক বলো।” আর স্ত্রীও তা বলেননি। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের শব্দ বা তালাকের ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা শর্ত। শুধু স্ত্রীকে তালাকের শব্দ বলতে বলা—যাতে স্বামী নিজে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেননি এবং স্ত্রীও তা বলেননি—এতে তালাক পতিত হয় না। সুতরাং আপনার বিবাহ পূর্বের মতোই বহাল আছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ নিয়ে সতর্ক থাকুন; কারণ তালাকের শব্দ ঠাট্টা-মশকরা বা রাগের حالتেও পতিত হতে পারে, যদি স্বামী নিজে তা উচ্চারণ করেন।
বিস্তারিত ফতোয়া
১. মূল নীতি
হানাফি ফিকহে তালাক সংঘটিত হয় স্বামীর তালাকের শব্দ উচ্চারণ বা তালাকের ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে। স্ত্রীকে “তুমি আমাকে তালাক বলো” বলা—এটি নিজে তালাক দেওয়া নয়; এটি তালাকের প্রতিনিধি নিয়োগ বা তালাকের শব্দ শোনার অনুরোধ। যদি স্ত্রী তা না বলে, তাহলে কোনো তালাক পতিত হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তালাক দুইবার; অতঃপর যথাবিধি রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে ছেড়ে দেওয়া।”
(সূরা বাকারা: ২২৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
“হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের হিসাব অনুযায়ী তালাক দেবে।”
(সূরা তালাক: ১)
এসব আয়াতে তালাকের কার্যকারিতা স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক প্রদানের সাথে সম্পৃক্ত। স্ত্রীকে তালাকের শব্দ বলতে বলার মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক প্রদান নেই।
২. হানাফি কিতাবের বক্তব্য
- আল-হিদায়া-তে তালাকের শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, তালাক সংঘটিত হয় স্বামীর তালাকের শব্দ বা তালাকের ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ দ্বারা। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক)
- রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) বলেন, তালাকের শব্দ যদি স্বামী নিজে না বলে, বরং অন্যকে বলতে বলে, তবে অন্য ব্যক্তি তা না বললে তালাক পতিত হয় না; কেননা তালাকের ইজাব বা সৃষ্টি স্বামীর পক্ষ থেকে হতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)
- ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে, “إذا قال لامرأته: قولي: أنت طالق، فلم تقل، لم يقع الطلاق” অর্থাৎ যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে, “তুমি বলো: তুমি তালাক,” আর স্ত্রী না বলে, তাহলে তালাক পতিত হয় না। (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তালাক)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া ও ফাতাওয়া উসমানি-তেও এ নীতি সমর্থিত যে, তালাকের কার্যকারিতা স্বামীর তালাকের শব্দ বা তার প্রতিনিধিকে তালাক দেওয়ার অনুমতি প্রদানের উপর নির্ভর করে; শুধু “তালাক বলো” বলার দ্বারা নিজে তালাক পতিত হয় না।
৩. আপনার প্রশ্নের উত্তর
১. আপনার এই কথার কারণে স্ত্রীর উপর তালাক কার্যকর হয়নি।
২. তালাক হয়নি; সুতরাং কত তালাক হয়েছে—এমন প্রশ্নই আসে না।
৩. আপনাদের বিবাহ আগের মতোই বহাল আছে।
★এর দরুন আপনার স্ত্রী তালাকের অধিকার প্রাপ্ত হয়েছেন
৪. আপনাদের করণীয়: আপনি ও আপনার স্ত্রী স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাবেন। তবে ভবিষ্যতে তালাকের শব্দ নিয়ে কোনো রকম ঠাট্টা, পরীক্ষা বা রাগের মাঝে উচ্চারণ থেকে বিরত থাকুন।