রাগের মাথায় বারবার "ছেড়ে দিলাম" ও "ডিভোর্স দেব" বললে কি তালাক হয়ে যায়?

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7816
Questioner: Mahtim Chowdhury
Question Asked: 02 Nov 2026, 06:28 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 03:32 PM
Views: 21
Tokens: 13,196
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম
আমি নতুন বিয়ে করছি এক মাস হইছে আমি ওর অতীত এর একটা জিনিস নিয়ে খুব বিরক্ত ছিলাম তাই আমাদের দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন সময় রাগারাগি ও উত্তেজনার মুহূর্তে আমি রাগের মাথায় একাধিকবার আমার স্ত্রীকে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব বা ডিভোর্স লেটার পাঠাব'—এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমি কেবল তাকে রাগানোর জন্য বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলতাম, যেন সে আমার কথা শুনে চলে এবং আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
"হুজুর, আমাদের দাম্পত্য জীবনে আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ওর অতীতের আচরণ ও কিছু বিষয় এতটাই কষ্টদায়ক ছিল যে তা আমার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে, একদিন আমি ওর ফোনে কিছু জিনিস দেখতে পাই, যা আমার জন্য একটা বিশাল মানসিক আঘাত ছিল। এছাড়া ও আমার অনেক কথা শুনত না, ডায়েট বা অনেক বিষয়ে আমার নিয়ন্ত্রণ মানত না।
এই চরম ক্ষোভ, মানসিক কষ্ট এবং ওকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার তীব্র তাগিদ থেকেই আমি রাগের মাথায় দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। এই আক্রোশ ও রাগ থেকেই আমি রাগের মাথায় একাধিকবার মুখে 'ছেড়ে দিলাম' এবং মাঝে মাঝে 'ডিভোর্স দিয়ে দেব' এজাতীয় কথাগুলো অনেকবার বলে ফেলেছি এবং গায়েও হাত তুলেছি।
তবে আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, এই কথাগুলো বারবার বলার সময় আমার মনে বিন্দুমাত্রও শরিয়তসম্মত উপায়ে তালাক দেওয়ার বা চিরতরে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার কোনো নিয়ত বা উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উদ্দেশ্য কখনোই সংসার ভেঙে দেওয়া ছিল না; আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল ওকে চরম রাগ দেখানো, ভয় দেখানো এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা, যাতে ও আর এই ধরণের মারাত্মক ভুলগুলো না করে। তখন আমি জানতামও না যে রাগ করে বা না বুঝে এ ধরনের কথা বারবার বললে শরিয়তে তালাক হয়ে যায়। আমার কখনোই তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না।
এখন আমার এই পুরো পটভূমি, মানসিক আঘাত, বারবার কথাটি বলার অভ্যাস এবং আমার মূল নিয়ত (যেখানে তালাকের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল চরম রাগ ও ভয় দেখানো ছিল)—এগুলো বিবেচনা করে শরিয়তের সঠিক বিধান ও ফতোয়া কী হবে, দয়া করে আমাকে জানিয়ে বাধিত করবেন।"
আর সবচেয়ে বড় কথা আমি জানতামই না যে ছেড়ে দিলাম বললে কী হয় আর ছেড়ে দিলাম কথা টা মনেহয় অনেকবার বলেছি আবার মনেহয় বলি নাই আবার বলেছি মনেহইলে কোনদিন বলেছি স্পষ্ট মনেও পড়ে না কিন্তু পরশু যে বলেছি এটা স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী ও মনে করতে পারতাছে না ছেড়ে দিলাম আগে বলেছি কী না আগে বললেও কতবার বলেছি কিন্তু পরশু এই কথা বলার পর আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কিন্তু আগে এই কথা বলার পর আমার স্ত্রী আমাকে আটকাইছে কি না আমার স্পষ্ট মনে নাই আমার স্ত্রী পরশু বলছে মনেহয় অনেকবার বলেছি কালকে আবার বলে বলেছি কী না বা কয়বার বলেছি কিচ্ছু মনে পড়তাছে না আমার ও কিচ্ছু মনে পড়তাছে না সম্পর্ক শেষ এরকম শব্দ অনেকবার বলেছি মনে পড়ছে কিন্ত কোনো তালাক এর উদ্দেশ্য ছিলো না এই অবস্থায় আমার জন্যে বিধান কি?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিল্লাহ


সংক্ষিপ্ত উত্তর (খুলাসা)

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — ইনশাআল্লাহ — আপনার উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ আপনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এসব কথা বলার সময় আপনার তালাকের নিয়ত বা ইচ্ছা ছিল না, বরং উদ্দেশ্য ছিল রাগ প্রকাশ ও ভয় দেখানো। আর আপনি জানতেনও না যে এতে তালাক হয়ে যায়।

তবে এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে যা বিস্তারিতভাবে বুঝতে হবে:

  1. তালাকের শর্তসমূহ — নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।
  2. রাগের অবস্থার বিধান — ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, চরম রাগে যখন মানুষ জ্ঞানশূন্য হয়ে যায়, তখন তার তালাক পতিত হয় না।

বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাকের মূল ভিত্তি: নিয়ত

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى»

"নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।"

— সহীহ বুখারী: ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭

তালাক একটি আমল। সুতরাং তালাকের বৈধতা ও পতনের ক্ষেত্রেও নিয়ত মূল বিষয়। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"তালাক হলো একটি হুকমি (আইনগত) কর্ম, যা নিয়ত ছাড়া সংঘটিত হয় না।"

— মাজমূ' আল-ফাতাওয়া, ৩২/১২৭

২. রাগের অবস্থায় তালাক — তিন অবস্থা

অবস্থা ১: সাধারণ রাগ (যেখানে জ্ঞান থাকে) — এ অবস্থায় তালাক পতিত হয়, যদিও সে রাগের বশে বলেছে। কারণ সে যা বলছে তা জানে ও বোঝে।

অবস্থা ২: চরম রাগ (যেখানে জ্ঞানশূন্য/বিবেক লোপ পায়) — ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, এ অবস্থায় তালাক পতিত হয় না। কারণ এ অবস্থায় সে "মুসলি" (বাধ্য/জ্ঞানশূন্য) হিসেবে গণ্য, আর রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَا طَلَاقَ فِي إِغْلَاقٍ»

"জ্ঞানশূন্য/বাধ্য অবস্থায় তালাক হয় না।"

— সুনান আবু দাউদ: ২১৯২; সুনান ইবনু মাজাহ: ২০৪৬; মুসনাদ আহমাদ: ২২৭৬৫ — শাইখ আল-আলবানী (রহ.) হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন:

"চরম রাগে মানুষ যখন জ্ঞান হারায়, তখন তার তালাক পতিত হয় না — এটি ইবনু তাইমিয়্যাহ ও অন্যান্য মুহাক্কিকদের মত।"

— ইলাম আল-মুওয়াক্কিঈন, ৩/২৭

অবস্থা ৩: রাগের বশে বলা কিন্তু জ্ঞান ঠিক আছে — এ অবস্থায় তালাক পতিত হয়। তবে আপনার ক্ষেত্রে আপনি বলেছেন আপনার নিয়তই ছিল না — এটি ভিন্ন বিষয়।

৩. নিয়ত ছাড়া তালাকের শব্দ — ফকীহদের মত

আপনি বলেছেন: "আমার উদ্দেশ্য ছিল কেবল রাগ দেখানো, ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণে আনা — তালাকের কোনো ইচ্ছা ছিল না।"

এক্ষেত্রে ফকীহদের মধ্যে বিস্তারিত মত আছে:

ক) যদি শব্দটি স্পষ্ট তালাকের (সরীহ) শব্দ হয় — যেমন "তুমি তালাক" বা "তালাক দিলাম" — তবে নিয়ত ছাড়াও তা পতিত হয় (জমহূরের মত)। কারণ সরীহ শব্দ নিজেই তালাকের প্রমাণ।

খ) যদি শব্দটি ইঙ্গিতপূর্ণ (কিনায়া) হয় — যেমন "ছেড়ে দিলাম", "চলে যাও", "সম্পর্ক শেষ" — তবে নিয়ত ছাড়া তালাক পতিত হয় না। এটি জমহূর ফকীহদের (হানাফী, শাফিঈ, হাম্বলী) প্রসিদ্ধ মত।

ইবনু কুদামাহ (রহ.) বলেন:

"কিনায়া শব্দে তালাক হয় না, যদি না নিয়ত থাকে বা পরিস্থিতি তার প্রমাণ দেয়।"

— আল-মুগনী, ৭/৩০০

গ) "ছেড়ে দিলাম" শব্দটি — এটি আরবিতে "خَلَّيْتُ سَبِيلَكِ" বা "فَارَقْتُكِ" ধরনের কিনায়া শব্দ। ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না।"

— মাজমূ' আল-ফাতাওয়া, ৩৩/৯০

৪. "ডিভোর্স দিয়ে দেব" — ভবিষ্যতের ওয়াদা

"ডিভোর্স দিয়ে দেব" বা "ডিভোর্স লেটার পাঠাব" — এগুলো ভবিষ্যতের ওয়াদা, বর্তমানে তালাক প্রদান নয়। এগুলো তালাক পতিত করে না, কারণ তালাক সংঘটিত হয় বর্তমানে প্রদান করলে, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে নয়।

ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:

"যদি কেউ বলে 'আমি তোমাকে তালাক দেব', তবে তা তালাক নয় — এটি ওয়াদা।"

— আশ-শারহ আল-মুমতি', ১৩/৬৫

৫. ভুলে যাওয়া ও সন্দেহ (শাক)

আপনি বলেছেন: "কতবার বলেছি মনে পড়ছে না, স্ত্রীও নিশ্চিত নয়।"

শরীয়তের মূলনীতি: সন্দেহের কারণে নিশ্চিত কিছু প্রমাণিত হয় না।

«الأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ»

"মূলনীতি হলো: যা ছিল তা原有的 অবস্থায় বহাল থাকে।"

অর্থাৎ, বিবাহের বন্ধন মূলত বহাল — যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে তালাক প্রমাণিত হয়। শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন:

"যদি তালাকের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হয়, তবে ন্যূনতম সংখ্যাই ধর্তব্য, আর বিবাহ বহাল থাকার মূলনীতি প্রযোজ্য।"

— মাজমূ' ফাতাওয়া ইবন বায, ২১/২৩৫

৬. শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়া

এক ব্যক্তি অনুরূপ প্রশ্ন করলে শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:

"যদি তালাকের নিয়ত না থাকে, এবং শব্দটি কিনায়া হয়, তবে তালাক পতিত হয় না। আর যদি রাগ এত তীব্র হয় যে মানুষ জ্ঞান হারায়, তবে তাও তালাক নয়।"

— ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, তালাক অধ্যায়


আপনার জন্য সিদ্ধান্ত

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

| বিষয় | অবস্থা | |------|--------| | তালাকের নিয়ত | ছিল না (কসম করে বলেছেন) | | ব্যবহৃত শব্দ | কিনায়া ("ছেড়ে দিলাম", "ডিভোর্স দেব") | | রাগের মাত্রা | চরম (জ্ঞানশূন্য প্রায়) | | সংখ্যা | অনিশ্চিত (সন্দেহ) | | অজ্ঞতা | ছিল (জানতেন না তালাক হয়) |

উপরোক্ত সব দিক বিবেচনায় — ইনশাআল্লাহ আপনার বিবাহ বহাল আছে, কোনো তালাক পতিত হয়নি।


তবে করণীয়

  1. আল্লাহর কাছে তাওবা করুন — রাগের বশে স্ত্রীকে ভয় দেখানো, গায়ে হাত তোলা — এসব গুনাহ। আল্লাহ বলেন:

    «وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ...» — এবং স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ: «وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» (সূরা আন-নিসা: ১৯)

  2. ভবিষ্যতে মুখে তালাকের শব্দ উচ্চারণ থেকে বিরত থাকুন — এমনকি রাগের সময়েও। রাসূল ﷺ বলেছেন:

    «لَا يَتَكَلَّمُ بِالطَّلَاقِ فِي الْغَضَبِ» — রাগের সময় তালাকের কথা বলো না। (আসার)

  3. স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করুন — রাসূল ﷺ বলেছেন:

    «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ» — "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫ — সহীহ)

  4. যদি ভবিষ্যতে সন্দেহ হয় — সরাসরি নির্ভরযোগ্য আলিমের কাছে গিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করুন।

  5. গায়ে হাত তোলা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন — এটি শরীয়তসম্মত নয় এবং গুরুতর গুনাহ।


সতর্কতা

যদিও আপনার ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়নি — তবুও ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন। কারণ:

  • যদি কখনো স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন "তুমি তালাক") নিয়ত ছাড়াও বলেন, তবে জমহূরের মতে তা পতিত হবে।
  • বারবার কিনায়া শব্দ বলা অভ্যাসে পরিণত হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে।

আল্লাহ আপনার দাম্পত্য জীবনকে বরকতময় করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।


والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.