নবীজী ﷺ-এর স্ত্রী সংখ্যা ৯ জন হওয়া এবং এক সাহাবীর পাঁচজন স্ত্রী থাকা ও একজনকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ — এগুলোর মধ্যে সমন্বয় কী?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: (১) নবীজী ﷺ-এর স্ত্রী সংখ্যা ৯ জন হওয়া এবং (২) এক সাহাবীর পাঁচজন স্ত্রী থাকা ও একজনকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ — এগুলোর মধ্যে সমন্বয় কী?
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দ্বীনী বিষয় বোঝার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইসলামী শরীআতে সাধারণ উম্মতের বিধান এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ খাসায়িস (স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য)-এর পার্থক্যের ফিকহী রূপরেখা প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. সাধারণ উম্মতের জন্য সর্বোচ্চ ৪ জন স্ত্রীর বিধান:
- শরঈ সিদ্ধান্ত: পবিত্র কুরআনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী (সূরা নিসা: ৩) একজন স্বাধীন মুসলিম পুরুষ একই সময়ে সর্বোচ্চ ৪ জন নারীকে বিবাহাধীনে একত্রে রাখতে পারেন। ৪ জনের অধিক স্ত্রীকে একই সময়ে বিবাহে রাখা সাধারণ উম্মতের জন্য সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫]।
- প্রামাণ্য রেফারেঞ্চ:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৮৫ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ৪র্থ অনুচ্ছেদ: 'চারের অধিক মহিলাকে একত্রে বিবাহ করা হারাম হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা') [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫]।
২. উক্ত সাহাবীর ঘটনার ব্যাখ্যা:
- ঘটনার প্রেক্ষাপট: জাহেলিয়াতের যুগে আরবে পুরুষদের ইচ্ছামতো অগণিত বিয়ে করার রীতি ছিল। যখন ইসলামে এক সাথে সর্বোচ্চ ৪ জন স্ত্রী রাখার নির্দেশ নাযিল হয়, তখন বেশ কিছু সাহাবী (যেমন: হযরত গাইলান ইবনে সালামা আস-ছাকাফী রা. বা হযরত কায়স ইবনুল হারিস রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তাঁদের ঘরে ৫ জন বা তারচেয়ে বেশি (৮-১০ জন) স্ত্রী ছিলেন।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ: তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদের নির্দেশ দেন: «أَمْسِكْ أَرْبَعًا وَفَارِقْ سَائِرَهُنَّ» (“তুমি ৪ জন স্ত্রীকে তোমার বিবাহে রেখে বাকিদের বিচ্ছিন্ন/তালাক দিয়ে দাও”)।
- বোঝার উপায়: যেহেতু সাধারণ উম্মত ও সাহাবায়ে কেরামের জন্য ইসলামী শরীআতের মূল আইন হলো—একই সময়ে ৪ জনের বেশি স্ত্রী রাখা যাবে না, তাই ওই সাহাবীকে ৪ জনকে রেখে বাকি ১ জনকে পৃথক বা তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
৩. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একই সাথে ৯ জন স্ত্রী থাকার কারণ (খাসায়িসে নববী):
- শরঈ কারণ (الخصائص النبوية): ৪ জনের বেশি বিবাহ করা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য 'খাসায়িস' বা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত বিশেষ নির্দেশ ও ব্যতিক্রমী অধিকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯]।
- উচ্চতর হিকমত ও উদ্দেশ্যসমূহ: ১. শরঈ মাসআলা শিক্ষা দেওয়া: নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন ও উম্মতের নারীদের পারিবারিক-অভ্যন্তরীণ জীবনের হাজারো জটিল ফিকহী বিধান শিক্ষা দেওয়ার জন্য একাধিক মহীয়সী উম্মুল মুমিনীন (রাযি.)-এর প্রয়োজন ছিল। ২. রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য: আরবের বিভিন্ন শক্তিশালী গোত্রের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত বিস্তার ও গোত্রীয় শত্রুতা দূর করা। ৩. অসহায় ও বিধবাদের আশ্রয়: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অধিকাংশ বিবাহই ছিল বয়স্ক, বিধবা ও ইসলাম গ্রহণের কারণে নির্যাতিত নারীদের সম্মান ও আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে।
- প্রামাণ্য রেফারেঞ্চ:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯৯ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — 'রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একাধিক বিবাহের শরঈ হিকমত ও উম্মতের জন্য চারের সীমারেখা সংক্রান্ত ফতোয়া') [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯]।
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ:
১. সাধারণ উম্মত ও সাহাবীদের জন্য: একই সময়ে সর্বোচ্চ ৪ জন স্ত্রী রাখা যাবে। তাই ৫ জন স্ত্রী থাকা সাহাবীকে ১ জনকে পৃথক করে ৪ জন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৫]। ২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য: একই সাথে ৯ জন স্ত্রী রাখা ছিল আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত বিশেষ নবুওয়াতী দায়িত্ব ও 'খাসায়িস'-এর অন্তর্ভুক্ত, যা সাধারণ উম্মতের জন্য প্রযোজ্য নয় [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ২৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯]।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকভাবে দ্বীন বোঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।