কাফফারার রোজায় সেহরি না খেয়ে পানি পান করে পরে নিয়ত করলে রোজা হবে কি? কাফফারার রোজা অবস্থায় পরনারীকে চুমু খেলে রোজা ভাঙবে কি?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,
আমি রমজানের কাফফারা রোজা রাখার নিয়তে আগামী ৬০ দিন রোজা রাখার নিয়ত করেছি। কিন্তু গতো রাতে আমি সেহরি খেতে পারিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি এক গ্রাস পানি খাই।
পরে আমি নিয়ত করি যে যদিও আমি সেহরি খাইনি এভাবেই রোজা রাখবো ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এই নিয়তের পুর্বে যে আমি পানি খেয়ে ফেলছি সেটা মনেই ছিলো না!
এমতাবস্থায় কি আমি আজকের রোজাটা রাখতে পারি?
দয়া করে জানাবেন প্লিজ।
আরেকটা প্রশ্ন, কাফফারার রোজা অবস্থায় যদি কেউ কোনো পরনারীকে চুমু খায় তাহলে কি রোজা ভেঙ্গে যাবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
কাফফারার রোজা রাখা অবস্থায় সকালে পানি খাওয়া ও পরনারীকে চুম্বনের শরঈ বিধান সংক্রান্ত আপনার দুটি প্রশ্নের উত্তর হানাফী ফিকহ ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: সকালে ভুল করে পানি খাওয়ার পর নিয়ত করলে আজকের রোজা হবে কি?
উত্তর: না, আজকের দিনটি আপনার কাফফারার রোজা হিসেবে আদায় হবে না [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭২; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৩]।
শরঈ কারণ ও ফিকহী ব্যাখ্যা: ১. কাফফারার রোজার নিয়তের সময়সীমা: রমজানের কাজা, কাফফারা কিংবা অসংনির্দিষ্ট ওয়াজিব রোজার জন্য রাত্রে বা সুবহে সাদিকের পূর্বেই নির্দিষ্ট নিয়ত করা শরীআতের দৃষ্টিতে ফরয/শর্ত [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭২]। সুবহে সাদিক অতিবাহিত হওয়ার পর সকালে বা দিনের বেলা কাফফারার রোজার নিয়ত করলে তা কাফফারা হিসেবে গণ্য হয় না [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭২]। ২. পানাহারের পর নিয়ত করা: ভুলবশত পানাহার করলে রোজা নষ্ট হয় না কেবল তখনই, যখন ব্যক্তি পূর্ব থেকেই সুবহে সাদিকের পূর্বে নিয়ত করে রোজাদার অবস্থায় থাকে [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭৬]। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর কোনো কিছু পানাহার করে ফেললে, এরপর নিয়ত করে ঐ দিন রোজা শুরু করার কোনো সুযোগ থাকে না [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭০, ১৭২]। ৩. ধারাবাহিকতা (তাতাব্বু) ও পরবর্তী করণীয়:
- যেহেতু আজকের দিনের রোজাটি কাফফারা হিসেবে সাব্যস্ত হলো না, তাই ৬০ দিনের টানা ধারাবাহিকতার শর্ত (তাতাব্বু) ভেঙে গেল [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৩]।
- ফলে আপনাকে পরবর্তীতে নতুন করে ১ম দিন থেকে পুনর্নিয়তে টানা ৬০টি কাফফারার রোজা রাখা শুরু করতে হবে [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৩]।
- তবে আজ যেহেতু আপনি সকালে পানি খেয়েছেন, তবুও রোজাদারদের সাদৃশ্য বজায় রাখতে দিনের অবশিষ্টাংশ পানাহার থেকে বিরত থাকা (ইমসাক) ওয়াজিব [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৮৫]।
২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: কাফফারার রোজা অবস্থায় পরনারীকে চুমু খেলে রোজা ভাঙবে কি?
উত্তর: পরনারী (গায়রে-মাহরাম নারী)-কে স্পর্শ করা বা চুমু দেওয়া শরীআতের বিচারে গোনাহে কবীরা ও সম্পূর্ণ হারাম কাজ [দরসুল ফিকহ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩১]। রোজা অবস্থায় এমন পাপাচার করার ফিকহী বিধান হলো:
১. বীর্যপাত হলে (ইনযাল): যদি চুম্বনের ফলে বীর্যপাত ঘটে, তবে রোজা ফাসিদ হয়ে (ভেঙে) যাবে এবং ঐদিনের রোজার কাজা আদায় করা ওয়াজিব হবে [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭৯; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৪]। ২. বীর্যপাত না হলে: যদি চুম্বনের ফলে বীর্যপাত না ঘটে, তবে ফিকহী বিচারে রোজা ভাঙবে না (ফাসিদ হবে না), তবে রোজা মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হবে এবং গায়রে মাহরামকে স্পর্শ করার কারণে কঠিন কবিরা গোনাহ হবে [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭৬; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৪, ১৩৪]। এর জন্য আল্লাহর দরবারে লজ্জিত হয়ে তওবা-ইস্তিগফার করা ওয়াজিব।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ১৭০ (অধ্যায়: কিতাবুস সোম — 'রোজার সংজ্ঞা ও সুবহে সাদিক থেকে পানাহার নিষিদ্ধ হওয়া') [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭০]।
- পৃষ্ঠা: ১৭২ (পরিচ্ছেদ: 'যে সকল রোজার জন্য রাত্রে নিয়ত করা শর্ত — কাজা ও কাফফারার রোজার নিয়তের সময়সীমা') [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১৭২]।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৪৩১ (অধ্যায়: 'গায়রে মাহরামকে দৃষ্টিপাত ও স্পর্শ করার শরঈ নিষেধাজ্ঞা') [দরসুল ফিকহ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩১]।
والله أعلم بالصواب