সোম বৃহস্পতিবার রোজা অসুস্থ অবস্থায়
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
আমার কিছুদিন যাবত প্রচন্ড অসুস্থতায় যাচ্ছে। খুবই দূর্বল, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, ব্লাড প্রেসার অস্বাভাবিক ভাবে লো থাকা আরো অনেক কিছু। এখন আমরা জানি যে সোম আর বৃহস্পতিবার নফল রোজা থাকে। আমার এক বোন আমাকে রোজা রাখতে বলছে কিন্তু আমি খুবই অসুস্থ অনুভব করি ইদানিং। কিন্তু কিছু কথা শুনলে মনে হয় আমি হয়তো অসুস্থতাকে অযুহাত বানাচ্ছি / হয়তো আমি গাফেল। এমতাবস্থায় আমার কি করা উচিত?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি: (১) অসুস্থ অবস্থায় নফল রোজা রাখার হুকুম, এবং (২) নিজের অসুস্থতাকে অজুহাত মনে হওয়ার সংশয়। ইনশাআল্লাহ উভয় দিকই সংক্ষেপে কিন্তু দলিলসহ তুলে ধরছি।
১. ইসলামে অসুস্থতা একটি বৈধ ও শরীয়তস্বীকৃত ওজর
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
«فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ» "তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে বা সফরে থাকবে, সে অন্য দিনগুলোতে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى رُخَصُهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ تُؤْتَى مَعْصِيَتُهُ» "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রদত্ত ছাড় (রুখসত) গ্রহণ করা পছন্দ করেন, যেমন তিনি অপছন্দ করেন তাঁর অবাধ্যতা করা।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৫৮৬৬; সহীহ ইবনে হিব্বান)
২. নফল রোজা ফরজ নয় — এতে নিজের ক্ষতি করা শরীয়তসম্মত নয়
নফল রোজা ইসলামে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত, বিশেষত সোম ও বৃহস্পতিবার। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«تُعْرَضُ الأَعْمَالُ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ» "সোম ও বৃহস্পতিবার আমলসমূহ পেশ করা হয়; তাই আমি পছন্দ করি যে আমার আমল পেশ করা হোক আমি রোজাদার অবস্থায়।" (তিরমিজি, হাদিস নং ৭৪৭)
কিন্তু এটি নফল — ফরজ বা ওয়াজিব নয়। আর শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» "নিজের ক্ষতি করা যাবে না, অন্যকেও ক্ষতি করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৩৪১)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, নফল ইবাদতে যদি নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা হয় যে শরীরের ক্ষতি হবে বা রোগ বেড়ে যাবে, তবে তা ত্যাগ করা উত্তম; বরং কেউ কেউ এটিকে ওয়াজিব পর্যায়ে বলেছেন। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৫৯, ৩/৪৭ — কিতাবুস সাওম)
৩. আপনার করণীয়
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি "প্রচণ্ড দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, রক্তচাপ অস্বাভাবিক কম" — এগুলো চিকিৎসাশাস্ত্রে গুরুতর লক্ষণ। শরীয়তে এমন অবস্থায় রোজা না রাখার সুস্পষ্ট অনুমতি রয়েছে। কাজেই:
- প্রথমে একজন নির্ভরযোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন। যদি ডাক্তার বলেন রোজা আপনার জন্য ক্ষতিকর, তবে নফল রোজা না রাখাই শরীয়তসম্মত; বরং রাখা মাকরুহ/নিষিদ্ধ হতে পারে।
- নফল রোজার বদলে অন্য ইবাদত করুন — যেমন কুরআন তিলাওয়াত, যিকির, দরুদ, সদকা, দোআ। অসুস্থ ব্যক্তির প্রতিটি নেক আমল ও ধৈর্যের প্রতিদান আল্লাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ... إِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ» — "মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণকর; বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৯৯)
- অসুস্থতাকে অজুহাত বানানোর ভয়: এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)। আপনি যদি সত্যিই অসুস্থ হন এবং ডাক্তারও তা স্বীকার করেন, তবে এটি অজুহাত নয় — এটি শরীয়তপ্রদত্ত ছাড় (রুখসত)। আর আল্লাহ তাআলা অন্তরের অবস্থা জানেন: «وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا فِي قُلُوبِكُمْ» (সূরা আহযাব: ৫১)। আপনি নিয়ত পরিষ্কার রাখুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করুন।
- যদি কখনো সামান্য সুস্থতা অনুভব করেন, তখন একটি নফল রোজা রাখার চেষ্টা করুন — কিন্তু নিজের ক্ষতির মূল্যে নয়। ইসলাম ধীরে ধীরে ও সহজভাবে ইবাদত করতে শেখায়: «أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ» — "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪৬৪)
৪. বোনকে কী বলবেন
আপনার বোনের নেক ইচ্ছা ও ভালোবাসার প্রশংসা করুন, কিন্তু তাকে বিনয়ের সাথে জানান যে আপনি অসুস্থ, ডাক্তারের পরামর্শ নিচ্ছেন, এবং শরীয়ত অসুস্থ ব্যক্তিকে নফল রোজা থেকে ছাড় দিয়েছে। তাকে বলুন আপনি তার জন্য দোআ করবেন এবং সুস্থ হলে ইনশাআল্লাহ রোজা রাখার চেষ্টা করবেন।
সংক্ষেপে: অসুস্থ অবস্থায় নফল রোজা না রাখা দোষের নয়; বরং নিজের ক্ষতি করা দোষের। ডাক্তারের পরামর্শ নিন, আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, এবং অন্য ইবাদত দিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। আল্লাহ আপনার শিফা দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب