বিষয়: তালাক সংক্রান্ত শরয়ি ফতোয়া ও পুনর্মিলনের বিধান জানার আবেদন

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7749
Questioner: MD. MONIR HOSEN
Question Asked: 01 Nov 2026, 09:31 PM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 10:32 PM
Views: 21
Tokens: 13,577
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিষয়: তালাক সংক্রান্ত শরয়ি ফতোয়া ও পুনর্মিলনের বিধান জানার আবেদন
বরাবর
মুহতারাম মুফতি সাহেব
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

বিনীত নিবেদন এই যে,

আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী একজন মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমি ২০১৭ ইংরেজি সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হই। বর্তমানে আমাদের সংসারে ৬ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান ও ২ বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে।

বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন কারণে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হয়ে আসছে। এসব ঝগড়ার সময় আমার স্ত্রী প্রায়ই আমার কাছে তালাক চাইতেন।

দুঃখজনকভাবে, গত ১৯/১০/২০২৬ ইংরেজি তারিখে পূর্বের মতো আবারও আমাদের মধ্যে ঝগড়া সৃষ্টি হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে আমি রাগের মাথায় আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলি এবং তাঁকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলি। তখন তিনি আমাকে তালাক দিতে বলেন এবং তালাক দিলে বাড়ি থেকে চলে যাবেন বলে জানান।

এরপর আমি তাঁকে বলি, তাঁর বাড়িতে তালাকের কাগজ পাঠিয়ে দেব, তিনি যেন চলে যান। কিন্তু তিনি মুখে তালাক দিতে বলেন। একপর্যায়ে আমি বলি, “যাও, তোমাকে তালাক দিলাম।” এতেও তিনি সন্তুষ্ট না হয়ে আমাকে একসঙ্গে তিন তালাক দিতে চাপ দিতে থাকেন। তখন আমি প্রচণ্ড রাগের মধ্যে এবং তাঁর বারবার চাপ দেওয়ার কারণে বলি, “তালাক, তালাক, তালাক।”

এরপরও তিনি বলেন, এভাবে বললে হবে না; বরং বলতে হবে, “আমি তোমার সঙ্গে সংসার করব না” এবং “এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক” বলতে হবে। পরিশেষে, আমি তাঁর কথামতো বলি, “তোমার সঙ্গে আমি সংসার করব না। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।”

উক্ত ঘটনার সময় আমি প্রচণ্ড রাগান্বিত ছিলাম এবং নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি। স্ত্রীর বারবার চাপের মুখে কথাগুলো বলেছি। তবে আমি ঠিক কী পরিমাণ রাগের মধ্যে ছিলাম এবং তখন আমার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা শরিয়তের আলোকে বিবেচনা করার অনুরোধ করছি।

বর্তমানে আমরা উভয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছি এবং পুনরায় সংসার করতে আগ্রহী। আমাদের দুটি অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমরা শরিয়তসম্মত সমাধান জানতে চাই।

এমতাবস্থায়, হুজুরের নিকট আমার বিনীত প্রশ্নগুলো হলো:

১। উল্লিখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী আমাদের তালাক কার্যকর হয়েছে কি না? কার্যকর হয়ে থাকলে কত তালাক কার্যকর হয়েছে?

২। আমাদের পুনরায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার করার সুযোগ আছে কি না? সুযোগ থাকলে পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে পুনর্মিলনের সঠিক পদ্ধতি কী?

৩। আমাদের দুটি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে, শরিয়তের বিধান অক্ষুণ্ণ রেখে আমাদের সংসার পুনরায় চালু করার কোনো বৈধ উপায় আছে কি না?

৪। আমরা উভয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছি এবং অনুতপ্ত। এখন পুনর্মিলনের জন্য আমাদের কী কী করণীয় রয়েছে? এ ক্ষেত্রে ইদ্দত, রুজু, নতুন করে বিবাহ বা অন্য কোনো শরয়ি বিধান প্রযোজ্য হলে তা বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।

অতএব, হুজুরের নিকট বিনীত আবেদন, উল্লিখিত ঘটনার পূর্ণ বিবরণ বিবেচনা করে পবিত্র কোরআন, সহিহ হাদিস ও শরিয়তের নির্ভরযোগ্য দলিলের আলোকে আমাদের সঠিক মাসআলা ও ফতোয়া প্রদান করে বাধিত করবেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং শরিয়তসম্মতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন।

বিনীত নিবেদক,

নাম: মোঃ মনির হোসেন
পিতার নাম: মৃত সিরাজুল হক
ঠিকানা: প্রযত্নে: সিরাজ সওদাগর বাড়ী, গ্রাম: খাঁনপুর, ওয়ার্ড: ০৯, ডাকঘর: মুরাদপুর-৩৮২১, উপজেলা: বেগমগঞ্জ, জেলা: নোয়াখালী।

মোবাইল নম্বর: 01711227715

Answer

তালাক সংক্রান্ত শরয়ি ফতোয়া ও পুনর্মিলনের বিধান

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় ভাই মোঃ মনির হোসেন সাহেব,

আপনার আবেদনটি মনোযোগ সহকারে পড়লাম। ঘটনার বিবরণ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে শরিয়তের দলিল-আধারে বিস্তারিত মাসআলা ও ফতোয়া পেশ করা হলো।


মূল বিষয়: আপনার ঘটনায় কত তালাক পতিত হয়েছে?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করছি:

১ম ধাপ: "যাও, তোমাকে তালাক দিলাম"

এটি একটি সরীহ (স্পষ্ট) তালাকের বাক্য। সরীহ তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের প্রয়োজন হয় না; মুখে উচ্চারণ করলেই এক তালাক রজয়ি পতিত হয়।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন — "তালাক দুইবার।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন — "তিনটি বস্তুতে ঠাট্টা-মশকরা করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক ও রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া)।" (তিরমিজি: ১১৮৪; আবু দাউদ: ২১৯৪)

২য় ধাপ: "তালাক, তালাক, তালাক"

এটি একই মজলিসে (এক বৈঠকে) তিনবার সরীহ তালাকের শব্দ। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিন তালাকই পতিত হয় এবং স্ত্রী মুগাল্লাযা (বাইন তালাক) হয়ে যান।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এক ব্যক্তি এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিনি তা কার্যকর করেন। (সহিহ মুসলিম: ১৪৭২; নাসাঈ: ৩৪০৬)

ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো — এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিনটিই পতিত হয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩২)

৩য় ধাপ: "তোমার সঙ্গে আমি সংসার করব না। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক"

এটি পুনরায় সরীহ তালাকের শব্দ। তবে যেহেতু ইতিমধ্যে তিন তালাক পতিত হয়ে স্ত্রী বাইন (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) হয়ে গেছেন, তাই পরবর্তী উচ্চারণগুলো নিষ্ফল (লাগু) — কোনো অতিরিক্ত তালাক পতিত হয় না।


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (মাসআলা)

প্রশ্ন ১: তালাক কার্যকর হয়েছে কি? কত তালাক?

উত্তর: হ্যাঁ, তালাক কার্যকর হয়েছে। আপনার প্রথম "তোমাকে তালাক দিলাম" বাক্যে এক তালাক রজয়ি পতিত হয়। এরপর একই মজলিসে "তালাক, তালাক, তালাক" বলার দ্বারা বাকি দুই তালাকসহ মোট তিন তালাক (মুগাল্লাযা) সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" উচ্চারণ নিষ্ফল।

ফলাফল: স্ত্রী আপনার উপর ** তালাক মুগাল্লাজা (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ)** হয়ে গেছেন। এখন ইদ্দত চলছে।

দলিল: "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে তার জন্য সে হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।" (সূরা বাকারা: ২৩০)

প্রশ্ন ২: পুনরায় সংসার করার সুযোগ আছে কি?

উত্তর: সরাসরি পুনর্মিলন (রুজু) বা নতুন বিবাহ — কোনোভাবেই বৈধ নয়। কারণ তিন তালাকের পর স্ত্রী মুগাল্লাযা হয়ে গেছেন। শরিয়তের বিধান হলো:

হালালা পদ্ধতি (শর্তসাপেক্ষ):

  1. স্ত্রী পূর্ণ ইদ্দত (তিন হায়েজ/তিন মাস) পালন করবেন।
  2. এরপর তিনি অন্য একজন মুসলিম পুরুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন (শুধু হালালার উদ্দেশ্যে নয় — এটি নিষিদ্ধ ও হারাম)।
  3. সেই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সত্যিকারভাবে দাম্পত্য জীবন যাপন করবেন (শারীরিক সম্পর্কসহ)।
  4. যদি সেই দ্বিতীয় বিবাহ কোনো বৈধ কারণে ভেঙে যায় (তালাক/মৃত্যু) এবং ইদ্দত শেষ হয়, তবেই প্রথম স্বামী নতুন মোহর ও নতুন বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন — "যে ব্যক্তি হালালা (তাহলীল) করে, আল্লাহ তার প্রতি লানত করেছেন এবং যার জন্য হালালা করা হয় তার প্রতিও।" (তিরমিজি: ১১১৯; আবু দাউদ: ২০৭৬)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন — "রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, হালালার উদ্দেশ্যে বিবাহ করা প্রসঙ্গে। তিনি বললেন: না, বরং প্রকৃত ইচ্ছা ও আগ্রহ থাকতে হবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২০৭৭)

প্রশ্ন ৩: শরিয়ত অক্ষুণ্ণ রেখে সংসার চালু করার বৈধ উপায়?

উত্তর: কোনো বৈধ উপায় নেই। তিন তালাকের পর সরাসরি পুনর্মিলন ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও যিনার সমতুল্য। কেউ যদি এভাবে পুনর্মিলন করে, তবে তা যিনা হিসেবে গণ্য হবে এবং সন্তানদের নসব (বংশ) প্রমাণে জটিলতা সৃষ্টি হবে।

দলিল: "তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দাও এবং তারা ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে তাদের স্বামীদের সাথে বিবাহে বাধা দিও না, যদি তারা শরিয়তসম্মতভাবে পরস্পরে সম্মত হয়।" (সূরা বাকারা: ২৩২)

সতর্কতা: আপনার স্ত্রীকে কোনোভাবে "হালালা"র জন্য প্ররোচিত করা, বা কাউকে দিয়ে তাহলীল করানো কবিরা গুনাহ। এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

প্রশ্ন ৪: পুনর্মিলনের জন্য করণীয় কী?

উত্তর: বর্তমানে করণীয় হলো:

  1. ইদ্দত পালন: স্ত্রী এখন ইদ্দত পালন করবেন (তিন হায়েজ বা তিন মাস)। ইদ্দতকালে তিনি অন্যত্র বিবাহ করতে পারবেন না।
  2. ভরণপোষণ: ইদ্দতকালে স্ত্রীর খোরপোশ ও থাকার ব্যবস্থা আপনার দায়িত্ব (হানাফি মতে বাইন তালাকে ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়, তবে সন্তানদের ভরণপোষণ অবশ্যই আপনার দায়িত্ব)।
  3. সন্তানদের হেফাজত: সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও লালন-পালনের দায়িত্ব উভয়েরই।
  4. তাওবা ও ইস্তিগফার: রাগের বশে তালাক দেওয়া এবং স্ত্রীর চাপে তিন তালাক দেওয়া — এ জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করুন।
  5. ভবিষ্যতে সতর্কতা: তালাকের শব্দকে কখনো হালকাভাবে নেবেন না। রাগের সময় মুখ বন্ধ রাখা, ওযু করা, স্থান পরিবর্তন করা — এগুলো সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
  6. নতুন বিবাহ (হালালার পর): যদি আল্লাহ তাআলা হালালার শর্ত পূর্ণ হওয়ার ব্যবস্থা করেন, তখন নতুন মোহর, নতুন ইজাব-কবুল ও নতুন বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় সংসার সম্ভব হবে।

গুরুত্বপূর্ণ নসিহত

প্রিয় ভাই, আপনার ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তবে শরিয়তের বিধান কঠোরভাবে মানতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা; তোমরা এগুলো লঙ্ঘন করো না।" (সূরা বাকারা: ২২৯)

রাগ নিয়ন্ত্রণের সুন্নাহসম্মত উপায়:

  • রাগের সময় "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়া
  • চুপ থাকা (রাসূল ﷺ: "রাগ হলে চুপ থাকো" — মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৭)
  • দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়া, বসে থাকলে শুয়ে পড়া
  • ওযু করা (রাগ শয়তান থেকে, শয়তান আগুন থেকে, আগুন পানি দিয়ে নেভে)

উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | তালাক পতিত হয়েছে? | হ্যাঁ | | কত তালাক? | তিন তালাক (মুগাল্লাযা) | | সরাসরি পুনর্মিলন? | হারাম ও নিষিদ্ধ | | নতুন বিবাহ (প্রথম স্বামীর সাথে)? | শুধু হালালার শর্ত পূর্ণ হলে বৈধ | | হালালার জন্য ভাড়া/প্ররোচনা? | হারাম ও কবিরা গুনাহ |

আল্লাহ তাআলা আপনাদের উভয়কে সঠিক বুঝ দান করুন, সন্তানদের হেফাজত করুন এবং ভবিষ্যতে রাগ নিয়ন্ত্রণের তাওফিক দান করুন। আমিন।


ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.