শাফিঈ মাযহাব অনুযায়ী "তুই ধরবি না আমারে" বাক্যে তালাক পতিত হবে কি?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
মুফতি সাহেব, আমি একটি শরয়ী মাসআলার সঠিক সমাধানের জন্য আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।
কিছুদিন আগে আমার স্ত্রীর সাথে রাগারাগি বা ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলাম: "তুই ধরবি না আমারে"। কিন্তু এখন আমার মনে তীব্র সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে যে, আমি কি হুবহু এটাই বলেছিলাম, নাকি বলেছিলাম—"তুই আর ধরবি না আমারে" (অর্থাৎ বাক্যের মধ্যে 'আর' শব্দটি ছিল কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছি না)।
হুজুরের কাছে আমার প্রশ্নসমূহ:
১. আমার মুখ থেকে উচ্চারিত এই বাক্যটি কি তালাকের অস্পষ্ট বা 'কিনায়া' (রূপক) শব্দের অন্তর্ভুক্ত হবে?
২. এই কথাটি বলার সময় যদি আমার মনে তালাকের নিয়ত বা উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে কি তালাক পতিত হবে? আর যদি কোনো নিয়ত না থাকে, তবে হুকুম কী হবে?
৩. বাক্যের মধ্যে 'আর' শব্দটি ছিল কি ছিল না—এই সন্দেহের কারণে শরীয়তের হুকুমে কোনো বেশকম বা পরিবর্তন হবে কি?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা সাইয়্যিদিল মুরসালীন, সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি আজমাঈন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার উচ্চারিত বাক্য "তুই ধরবি না আমারে" (বা "তুই আর ধরবি না আমারে") হলো কিনায়া (রূপক) শব্দ—এটি সরাসরি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হবে কেবল তখনই, যখন তালাকের নিয়ত থাকবে অথবা পরিস্থিতি (ক্বারীনাহ) তালাকের দিকে ইঙ্গিত করবে। নিয়ত ছাড়া এ বাক্যে তালাক পতিত হবে না। আর "আর" শব্দটি ছিল কি না—এই সন্দেহের কারণে হুকুমে কোনো পরিবর্তন হবে না; কেননা উভয় বাক্যেই তালাকের কোনো স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ নেই, বরং উভয়ই কিনায়া।
১ম প্রশ্ন: বাক্যটি কি কিনায়া (রূপক) শব্দের অন্তর্ভুক্ত?
হ্যাঁ, এটি কিনায়া শব্দের অন্তর্ভুক্ত। তালাকের শব্দ দুই প্রকার:
- সরীহ (স্পষ্ট): যেমন—"তুই তালাক", "তুই আযাদ", "তুই বরখাস্ত" ইত্যাদি। এগুলোতে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়।
- কিনায়া (রূপক): এমন শব্দ যা তালাক ছাড়া অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন—"তুই যাও", "তুই মুক্ত", "তুই নিজের পথে চল", "আমি তোকে ধরব না" ইত্যাদি।
আপনার বাক্য "তুই ধরবি না আমারে" বা "তুই আর ধরবি না আমারে"—এটি তালাকের সরীহ শব্দ নয়; বরং এটি কিনায়া। ইমাম নববী (রহ.) আল-মাজমূ'-তে এবং রওদাতুত তালিবীন-এ উল্লেখ করেছেন যে, কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত বা ক্বারীনাহ (পরিস্থিতির ইঙ্গিত) শর্ত। (দেখুন: আল-মাজমূ' শরহুল মুহাযযাব, কিতাবুত তালাক; মিনহাজুত তালিবীন ও Mughni al-Muhtaj, বাবুত তালাক)
ইমাম শাফিঈ (রহ.) আল-উম্ম-তে বলেন, কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত ব্যতীত তালাক পতিত হয় না। ইবন হাজার আল-হাইতামী তুহফাতুল মুহতাজ-তে এবং ইমাম রমলী নিহায়াতুল মুহতাজ-তে একই মত দিয়েছেন।
২য় প্রশ্ন: নিয়ত থাকলে কী হবে, না থাকলে কী হবে?
(ক) যদি তালাকের নিয়ত থাকে:
তাহলে তালাক পতিত হবে (তালাক রজঈ বা বাইন—তা নির্ভর করে আপনি এক তালাকের নিয়ত করেছেন কি না)। কিনায়া শব্দে নিয়ত থাকলে তালাক সংঘটিত হয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"وَالْكِنَايَاتُ لَا يَقَعُ بِهَا الطَّلَاقُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ" — অর্থ: "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না, তবে নিয়ত বা পরিস্থিতির ইঙ্গিত থাকলে।" (আল-মাজমূ')
(খ) যদি কোনো নিয়ত না থাকে এবং কোনো ক্বারীনাহও না থাকে:
তাহলে তালাক পতিত হবে না। আপনার স্ত্রী আপনার বিবাহে বহাল থাকবেন। কেননা কিনায়া শব্দে নিয়ত বা ক্বারীনাহ ছাড়া তালাক হয় না। এটি শাফিঈ মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও মুফতা বিহি মত।
(গ) যদি নিয়তের ব্যাপারে সন্দেহ হয়:
আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে তালাকের নিয়ত করেছিলেন কি না—তাহলে আসাল হলো নিয়ত ছিল না (আল-আসলু আদমুল নিয়্যাহ)। সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হবে না। ইমাম নববী (রহ.) আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর-এ এবং ফিকহের কায়িদা অনুযায়ী: "الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ" — মূল হলো পূর্বের অবস্থার বহাল থাকা। অর্থাৎ বিবাহ বহাল থাকবে।
৩য় প্রশ্ন: "আর" শব্দের সন্দেহে হুকুমে পরিবর্তন হবে কি?
না, কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ:
- "তুই ধরবি না আমারে" — এটিও কিনায়া।
- "তুই আর ধরবি না আমারে" — এটিও কিনায়া।
উভয় বাক্যেই তালাকের কোনো সরীহ শব্দ নেই। "আর" শব্দটি যোগ হলে বাক্যের অর্থ হয় "তুই আর আমাকে ধরবি না" — যা তালাকের স্পষ্ট ঘোষণা নয়; বরং এটি কিনায়া। সুতরাং "আর" ছিল কি না—এই সন্দেহে তালাকের হুকুমে কোনো তারতম্য হবে না। উভয় অবস্থাতেই নিয়ত বা ক্বারীনাহ ছাড়া তালাক পতিত হবে না।
তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়: আপনি বলেছেন এটি রাগারাগি বা ঝগড়ার এক পর্যায়ে বলেছিলেন। রাগের অবস্থায় বলা কিনায়া শব্দে যদি তালাকের নিয়ত থাকে, তবে তালাক পতিত হবে; রাগ তালাক পতনে বাধা দেয় না (রাগের কারণে তালাক পতিত না হওয়ার বিধান কেবল তখনই, যখন ইচ্ছা-বুদ্ধি লোপ পায়—যেমন পাগলামি বা অচেতন অবস্থা)। কিন্তু আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে নিয়ত করেছিলেন, তাহলে সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হবে না।
করণীয় (নাসীহাহ)
-
আপনি তালাকের নিয়ত করেছিলেন কি না—তা স্মরণ করার চেষ্টা করুন। যদি নিশ্চিত হন যে নিয়ত করেননি, তবে কোনো তালাক হয়নি; বিবাহ বহাল আছে। আর যদি নিশ্চিত হন যে নিয়ত করেছিলেন, তবে তালাক পতিত হয়েছে—এক্ষেত্রে ইদ্দত ও পরবর্তী বিধান পালন করতে হবে এবং অভিজ্ঞ মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
-
সন্দেহের ক্ষেত্রে মূল হলো নিয়ত ছিল না—তাই আপনি বিবাহ বহাল ধরে রাখবেন, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ থেকে বিরত থাকুন।
-
তালাকের শব্দ নিয়ে খেলা করা বা রাগের মুহূর্তে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ» — "তিনটি বিষয়—এর গুরুত্ব গুরুত্বই, আর এর ঠাট্টাও গুরুত্বপূর্ণ (অর্থাৎ ঠাট্টায়ও কার্যকর): বিবাহ, তালাক ও রজআত।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৯৪; তিরমিযী ১১৮৪ — হাসান)
- সরাসরি মুফতির সাথে দেখা করে বিস্তারিত আলোচনা করুন—কেননা নিয়ত ও ক্বারীনাহর বিষয়টি ব্যক্তিগত অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত; লিখিত ফতোয়া এ ক্ষেত্রে সীমিত।
উৎসগ্রন্থ (শাফিঈ):
- ইমাম শাফিঈ, আল-উম্ম, কিতাবুত তালাক
- ইমাম নববী, আল-মাজমূ' শরহুল মুহাযযাব, কিতাবুত তালাক; রওদাতুত তালিবীন; মিনহাজুত তালিবীন
- ইবন হাজার আল-হাইতামী, তুহফাতুল মুহতাজ, কিতাবুত তালাক
- ইমাম রমলী, নিহায়াতুল মুহতাজ, কিতাবুত তালাক
- খতীব আশ-শিরবীনী, মুগনিল মুহতাজ, কিতাবুত তালাক
- যায়নুদ্দীন আল-মালিবারী, ফাতহুল মুঈন (তালাক অধ্যায়)
وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ، وَإِلَيْهِ الْمَرْجِعُ وَالْمَآبُ