নামাযে অজু ভঙ্গ হওয়ার পরও বিনা অজুতে নামায চালিয়ে যাওয়া কি রিয়া?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7743
Questioner: farida akther
Question Asked: 01 Nov 2026, 08:05 PM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 09:37 PM
Views: 40
Tokens: 6,536
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি যতটুকু জানি যে রিয়া হলো দুনিয়াবি সম্মান অর্জন করতে ইবাদত করা। নামাজের মাঝখানে ওযু ভেঙে গেলে কে কি মনে করবে ভেবে নামাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভবত রিয়া। কিন্তু কারো যদি জামাতে নামাজে ওজু ভেঙে যায়, নামাজ ছেড়ে গিয়ে ওজু করতে চায় কিন্তু সাহস হয় না আর সে নামাজ চালিয়ে যায়, (সে এটা করে মানুষ এর সম্মান, শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য নয়, লোকে তাকে নামাজি বলবে এই জন্যও নয় , বরং সে এটা করে লোকের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে) সে জানে এই কাজটা জায়েজ নয়, তবে আমার প্রশ্ন হলো যেহেতু সে এটা মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য করে না, আর রিয়া হলো দুনিয়াবি সম্মান অর্জন করতে ইবাদত করা, তাহলে কি তার এই কাজটা রিয়া হবে??

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ। সংক্ষেপে উত্তর হলো: না, শুধু মানুষের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে ওযু ভেঙে যাওয়া সত্ত্বেও নামাজ চালিয়ে যাওয়া প্রকৃত অর্থে 'রিয়া' (লোকদেখানো ইবাদত) হিসেবে গণ্য হবে না; বরং এটি 'রিয়া'-র একটি শাখা বা প্রকার, যাকে ফুকাহায়ে কেরাম 'রিয়াউশ শিরক' বা 'শিরকে আসগার'-এর অন্তর্ভুক্ত বললেও মূল 'রিয়া' (যা ইবাদতকে লোক দেখানোর জন্য করা) থেকে এর উদ্দেশ্য ভিন্ন। তবে কাজটি যেহেতু শরীয়তসম্মত নয় (ওযু ভেঙে গেলে নামাজ চালিয়ে যাওয়া হারাম/নাজায়েজ), তাই এটি একটি গুনাহের কাজ, যা থেকে বেঁচে থাকা ফরজ।

নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. 'রিয়া'র শরীয়তসম্মত সংজ্ঞা

হাদিসে রিয়া সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ»

"নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর সবচেয়ে বেশি ভয় করি শিরকে আসগার (ছোট শিরক) সম্পর্কে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন: রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত)।"

— মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৬৩০; মুসনাদে বাযযার; সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদিস নং ৩১

অন্য হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা রিয়াকারীকে বলবেন:

«اذْهَبْ إِلَى الَّذِينَ كُنْتَ تُرَائِي لَهُمْ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرْ هَلْ تَجِدُ عِنْدَهُمْ جَزَاءً»

"যাও, দুনিয়াতে যাদের দেখানোর জন্য ইবাদত করতে, তাদের কাছে যাও এবং দেখো তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও কিনা।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৬৬৪; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৮৪

ফিকহি সংজ্ঞা: ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার'-এ রিয়ার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, ইবাদতকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা বা আল্লাহর ইবাদতে অন্যকে শরিক করা। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪৪৯-৫০; খণ্ড ৬, পৃ. ৩৮৫)

সুতরাং রিয়ার মূল কথা হলো: ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে বা সাথে সাথে মানুষের সন্তুষ্টি/প্রশংসা/সম্মানকে উদ্দেশ্য বানানো।


২. প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তির কাজের বিশ্লেষণ

প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তি:

  • ওযু ভেঙে যাওয়ার পরও নামাজ চালিয়ে যাচ্ছে;
  • সে জানে এটি জায়েজ নয়;
  • সে এটি করছে মানুষের সম্মান/শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য নয়;
  • লোকে তাকে 'নামাজি' বলবে—এই জন্যও নয়;
  • বরং লোকের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য (অর্থাৎ, মানুষ তাকে নামাজ ছেড়ে চলে যেতে দেখে তাকে দোষারোপ করবে, এই ভয়ে)।

এখানে লক্ষণীয়: তার উদ্দেশ্য ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা অর্জন নয়; বরং মানুষের নিন্দা/কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা। এটি 'রিয়া'-র সরাসরি সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এটি একটি ভিন্ন রোগ, যাকে ফিকহের পরিভাষায় 'রিয়াউশ শিরক' বা 'শিরকে আসগার'-এর একটি দুর্বল প্রকার বলা যায়, তবে মূল 'রিয়া' নয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: সে যদি মনে করে, "লোকে আমাকে নামাজ ছেড়ে যেতে দেখলে আমার সম্মান কমে যাবে, তাই আমি নামাজ চালিয়ে যাচ্ছি"—তাহলে সূক্ষ্মভাবে মানুষের সম্মান/ভয়ই তার কাজের প্রেরণা। এটি 'রিয়া'-র নিকটবর্তী একটি অবস্থা, যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। কিন্তু যেহেতু সে সরাসরি ইবাদতের মাধ্যমে প্রশংসা কামনা করছে না, বরং নিন্দা এড়াতে চাচ্ছে, তাই একে 'রিয়া' বলা যাবে না; বরং 'গুনাহ' বলা হবে।


৩. ওযু ভেঙে গেলে নামাজ চালিয়ে যাওয়ার হুকুম

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নামাজের মধ্যে ওযু ভেঙে গেলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো: ওযু ভেঙে গেলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়, এবং নামাজ থেকে বের হয়ে নতুন করে ওযু করে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।

দলিল:

«لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَا وُضُوءَ لَهُ»

"যার ওযু নেই, তার নামাজ নেই।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১০১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৯৯

আল-হিদায়া-তে এসেছে:

"وَمَنْ أَحْدَثَ فِي صَلَاتِهِ فَسَدَتْ صَلَاتُهُ"

"যে ব্যক্তি নামাজের মধ্যে ওযু ভঙ্গ করে, তার নামাজ বাতিল হয়ে যায়।"

— আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবুল আহদাস

ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:

"إِذَا أَحْدَثَ فِي الصَّلَاةِ بَطَلَتْ صَلَاتُهُ"

"নামাজের মধ্যে ওযু ভঙ্গ হলে নামাজ বাতিল হয়ে যায়।"

— ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৯০

সুতরাং প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তির কাজটি নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। সে জেনে-বুঝে শরীয়তবিরোধী কাজ করছে, যা থেকে তাওবা করা ফরজ।


৪. 'রিয়া' ও 'গুনাহ'-এর পার্থক্য

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:

| বিষয় | রিয়া | প্রশ্নে উল্লিখিত কাজ | |---|---|---| | উদ্দেশ্য | ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা/সম্মান অর্জন | মানুষের নিন্দা/কুদৃষ্টি থেকে বাঁচা | | ইবাদতের প্রকৃতি | ইবাদতকে লোক দেখানোর জন্য করা | ইবাদত নয়; বরং ইবাদতের একটি শর্ত (ওযু) ভঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও নামাজ চালিয়ে যাওয়া | | হুকুম | শিরকে আসগার, কবিরা গুনাহ | গুনাহ, তবে রিয়া নয় |

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার'-এ বলেন:

"الرِّيَاءُ أَنْ يَعْمَلَ الْعَمَلَ لِغَيْرِ اللَّهِ تَعَالَى، أَوْ لِيَرَاهُ النَّاسُ فَيَحْمَدُوهُ عَلَيْهِ"

"রিয়া হলো: আমলটি আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্যের জন্য করা, অথবা মানুষ তা দেখে তার প্রশংসা করবে—এই উদ্দেশ্যে করা।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৮৫

প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তি মানুষের প্রশংসা কামনা করছে না; বরং নিন্দা এড়াতে চাচ্ছে। তাই এটি রিয়ার সরাসরি সংজ্ঞায় পড়ে না।

তবে ইমাম গাজালি (রহ.) 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন'-এ এবং মোল্লা আলী কারী (রহ.) 'মিরকাতুল মাফাতিহ'-এ উল্লেখ করেছেন, রিয়ার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এর মধ্যে একটি স্তর হলো 'রিয়াউল খাওফ' (ভয়ের রিয়া)—অর্থাৎ, মানুষ নিন্দা করবে বা অপমান করবে এই ভয়ে ইবাদত করা বা ইবাদতের অবস্থা পরিবর্তন করা। এটি রিয়ার একটি দুর্বল প্রকার, যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৭; মিরকাতুল মাফাতিহ, খণ্ড ৮, পৃ. ৩০৫)


৫. হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) 'মাআরিফুল কুরআন'-এ সূরা বাকারার ২৬৪ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন:

"রিয়ার অর্থ হলো: ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করা। আর যদি কেউ মানুষের নিন্দা থেকে বাঁচার জন্য ইবাদত করে, তবে তা রিয়ার একটি দুর্বল প্রকার, যা 'শিরকে আসগার'-এর অন্তর্ভুক্ত।"

— মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৬৫০ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৬৪-এর তাফসির)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) 'বেহেশতী জেওর'-এ বলেন:

"রিয়া হলো: নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদত লোক দেখানোর জন্য করা। আর যদি কেউ লোকের ভয় বা লজ্জায় ইবাদত করে, তবে সেটাও রিয়ার একটি প্রকার, যা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।"

— বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ৩০০ (রিয়া ও অহংকার অধ্যায়)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) 'ফাতাওয়া উসমানি'-তে বলেন:

"রিয়ার মূল কথা হলো: ইবাদতের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে মানুষের সন্তুষ্টি মিশানো। আর যদি কেউ শুধু মানুষের নিন্দা থেকে বাঁচার জন্য ইবাদতের অবস্থা পরিবর্তন করে, তবে তা রিয়া নয়; বরং 'রিয়াউল খাওফ' বা ভয়ের রিয়া, যা গুনাহ।"

— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৫ (রিয়া ও ইখলাস অধ্যায়)


৬. প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

প্রশ্ন: "যেহেতু সে এটা মানুষের সম্মান, শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য করে না, আর রিয়া হলো দুনিয়াবি সম্মান অর্জন করতে ইবাদত করা, তাহলে কি তার এই কাজটা রিয়া হবে?"

উত্তর: না, তার এই কাজটি প্রকৃত 'রিয়া' হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ রিয়ার মূল শর্ত হলো ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা/সম্মান অর্জন করা। প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তি মানুষের প্রশংসা কামনা করছে না; বরং নিন্দা/কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে চাচ্ছে। তাই এটি রিয়ার সরাসরি সংজ্ঞায় পড়ে না।

তবে এটা স্পষ্ট যে, তার কাজটি:

  1. শরীয়তবিরোধী ও গুনাহ—কারণ ওযু ভেঙে গেলে নামাজ চালিয়ে যাওয়া হারাম।
  2. 'রিয়াউল খাওফ' বা ভয়ের রিয়া-এর দুর্বল প্রকার—যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।
  3. তাকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
  4. সাহস না হওয়ার কারণে নামাজ চালিয়ে যাওয়া—এটি ভয়ের কারণে গুনাহ, যা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং মানুষের ভয়কে আল্লাহর ভয়ের চেয়ে বড় না করা শিখতে হবে।

সঠিক পদ্ধতি: ওযু ভেঙে গেলে সাথে সাথে নামাজ থেকে বের হয়ে ওযু করে নামাজ পুনরায় পড়া। জামাতে থাকলে ইমামের সাথে নামাজ শেষ করে নতুন করে ওযু করে নামাজ পুনরায় পড়া। মানুষের ভয় বা লজ্জা আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইখলাসের সাথে ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.