ঈমান ও বিবাহিত জীবন নিয়ে প্রশ্ন

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7707
Questioner: Nabila
Question Asked: 01 Nov 2026, 11:26 AM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 12:36 PM
Views: 17
Tokens: 12,246
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমাকে আপনাদের এখান থেকে উত্তর দিয়েছেন আমার ঈমান বিয়ে ঠিক আছে, নবায়ন করতে হবে না। তার পরেও আমার মনে খালি সন্দেহ আসে, যদি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হয়। দুনিয়ার জীবন আর কয়দিনের। মরার পরে আমার কি হবে। যদি এখন ঈমানের কোনো সমস্যা হয়। আমার হাসবেন্ড এর সাথে আমি তো মরার পরেও থাকতে চাই। কিন্তু এখন যদি ঈমানের কোনো সমস্যা হয়, আল্লাহ না করুক, তাহলে আমার আখিরাতের জীবন কি হবে। এগুলা ভেবে আমি সারাদিন পাগল হয়ে যাইতেছি।
১) আমি আমার জানা মতে কোনো কিছু মুখে উচ্চারণ করি নাই কুফরির মত। আমার মনে মনে কিছু আসলে বাজে কথা সেটা আমি মনে বলছি না মুখে বলছি, সেটা নিয়ে টেনশন এ পড়ে যাই। তখন আমি এই বাজে কথা গুলা আবার চেক করি মুখ হা করে, জিহবা নেড়ে, মনে মনে বলে।।কোনো সাউন্ড হয় কিনা। চেক করার জন্য বাজে কথা গুলা আমি ইচ্ছা করেই বলি। দেখতে কোনো সাউন্ড হয় কিনা। পরে নিশ্চিত হই যে, প্রথমে যে বাজে কথা বলেছিলাম সেটা মনে হয় মনে মনেই বলছি।
২) আমার মনে যদি বাজে কথা চলেও আসে, মাঝে মাঝে হাদীস পড়ে, এটা ওটা নিয়ে অনেক কিছু চলে আসে মনে। তার পরেও আমি মনে মনে বললেও মুখে কিছু উচ্চারণ করি নাই। মনে মনে বিরক্ত হইলেও ইসলামের জিনিস নিয়ে মুখে উচ্চারণ করি নাই৷ আবার একটু পরে বুঝেছি বিরক্ত হওয়া ঠিক হয় নাই।
৩) ইউটিউব এ সার্চ করলে হুজুর রা বলে ঈমান নবায়ন করেন, বিয়ে নবায়ন করেন। এগুলা দেখে আরো ভয় লাগে। আবার আপনাদের অনেকে ফতোয়া দেয় যে, মুখে কুফরি কথা উচ্চারণ করলেই ঈমানে সমস্যা। এটা মনে করে আরোও ভয় লাগে।
৪) এখন আমি আমার মন কে কিভাবে বুঝাবো যে, আমার সব কিছু ঠিক আছে? আমাকে নতুন করে কিছু নবায়ন করতে হবে না। আপনারা ফতোয়া দেন মুখে উচ্চারণ করলেই ঈমানে সমস্যা হবে৷ এটা দেখে আরো টেনশন লাগে। যে আমি কি কিছু মুখে উচ্চারণ করে ফেললাম কিনা। এখন আমার ঈমান বিয়ের কি হবে?
৫) আবার আপনারা বললেন মনে কুফরি বিশ্বাস রাখা যাবে না। এখন আমি তো সব মনে মনেই বললাম। এখন এগুলা আমার ইচ্ছাকৃত নাকি শয়তানের ওসওয়াসা সেটা তো আমি বুঝতেছি না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি ইচ্ছাকৃত ভাবেই বলছি। মাঝে মাঝে মনে হয় ইচ্ছাকৃত ভাবে বললে আবার মাফ চাই কেন। মনের মধ্যে অটোমেটিক নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ চলে আসে কেন। আমি আসলে বুঝি না। এখন আমার ঈমান কি ঠিক আছে কিনা?
৬) মুফতি সাহেব রা উত্তর দিয়েছেন ঈমান বিয়ে সব ঠিক আছে। কিন্তু আমি আমার মনে হয় তারা আমার প্রশ্ন বুঝেছেন? তারা বলে আমি ওসওয়াসা তে আক্রান্ত। কিন্তু আমার এটা মনে হয় না। আমার একটাই ভয় হয় আমার বিয়ে ঠিক আছে তো। বিয়ে নিয়ে আমি অনেক ভয় পাই। এমন ভাবে কি মন কে বুঝাইতে পারবো যে, আমাকে মুফতি সাহেব উত্তর দিয়েছেন তার উত্তর এর উপর আমল করি। আল্লাহ না করুক কোনো সমস্যা হলে মুফতি সাহেব এর হবে , আমাকে উত্তর দিয়েছেন দেখেই তো আমি আমল করতেছি যে আমার ঈমান বিয়ে সব ঠিক আছে। কিছু হলে এর দায় ভার মুফতি সাহেব এর। কারন আমি বিস্তারিত যেভাবে প্রশ্ন করেছি তিনি সেভাবেই উত্তর দিয়েছেন। এখন এখানে কোনো ভুল হলে দায় ভার মুফতি সাহেব এর।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি আমি ধৈর্য ধরে পুরোটা পড়েছি। প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করে নিন: আপনি ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) রোগে আক্রান্ত। এটি একটি সুপরিচিত সমস্যা, এবং এর চিকিৎসা শরীয়তে আছে। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।


১. মূল নীতি: মুখে উচ্চারণ ছাড়া ঈমান যায় না

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—কুফরির কথা মুখে উচ্চারণ করা বা কুফরি আকিদা অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা ছাড়া ঈমান বাতিল হয় না। শুধু মনের মধ্যে বাজে খেয়াল আসা, ওয়াসওয়াসা আসা, এমনকি মনের মধ্যে কুফরি শব্দ "শুনে ফেলা" — এসব দ্বারা ঈমান যায় না।

روى مسلم عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: جاء ناس من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم فسألوه: إنا نجد في أنفسنا ما يتعاظم أحدنا أن يتكلم به. قال: «أوقد وجدتموه؟ قالوا: نعم. قال: ذاك صريح الإيمان» — সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩২

অর্থাৎ সাহাবিরা বললেন, "আমরা মনের মধ্যে এমন কথা পাই যা মুখে বলতে আমরা ভয় পাই।" নবী ﷺ বললেন, "তোমরা কি তা পাচ্ছ?" তারা বললেন "হ্যাঁ।" তিনি বললেন, "এটাই তো সুস্পষ্ট ঈমান" (অর্থাৎ শয়তানের ওয়াসওয়াসা আসা এবং তা অপছন্দ করা ঈমানের প্রমাণ)।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «رد المحتار» -এ বলেন:

الوسوسة لا تؤاخذ بها ما لم تستقر في القلب أو تجر إلى القول — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৪০ (বাবুল ঈমান)

অর্থ: ওয়াসওয়াসা দ্বারা পাকড়াও করা হয় না, যতক্ষণ না তা অন্তরে স্থির হয় বা মুখে উচ্চারিত হয়।


২. আপনার ১ ও ২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর

আপনি যা করছেন—বাজে কথা "চেক" করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মনে মনে বলা, জিহবা নাড়ানো, মুখ খোলা—এটি ওয়াসওয়াসারই একটি রূপ। এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না, কারণ:

  • আপনি কুফরিকে বিশ্বাস করেননি, বরং তা অপছন্দ করেন।
  • আপনি মুখে শব্দসহ উচ্চারণ করেননি (শুধু জিহবা নাড়ানো বা মুখ খোলা শব্দ নয়)।
  • আপনি ভয় পাচ্ছেন বলেই এটি ওয়াসওয়াসা, এবং ভয় পাওয়াটাই ঈমানের আলামত।

তবে এই "চেক করা" অভ্যাসটি বন্ধ করুন। কারণ এটি ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «معارف القرآن» -এ স্পষ্ট বলেছেন—ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো তা উপেক্ষা করা, প্রতিবার তা নিয়ে ভাবা নয়।


৩. আপনার ৩ নম্বর প্রশ্ন: ইউটিউবে "ঈমান-বিয়ে নবায়ন" শোনা

এখানে দুটি বিষয়:

(ক) যারা বলে "মুখে কুফরি উচ্চারণ করলেই ঈমান যায়"—এটি সঠিক, কিন্তু শর্ত হলো ইচ্ছাকৃতভাবে, শব্দসহ, অর্থ জেনে বলা। আপনার ক্ষেত্রে তা হয়নি।

(খ) "ঈমান ও বিয়ে নবায়ন" সম্পর্কে—হানাফি মাজহাবে সাধারণ সন্দেহের কারণে নবায়ন করা আবশ্যক নয়। ইমাম তহতাবি ও ইবনে আবিদিন (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন, শুধু ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহে নবায়ন করা বিদআতের কাছাকাছি। হ্যাঁ, যদি কেউ নিশ্চিতভাবে কুফরি শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তওবা + কালিমা পাঠ + (মতান্তরে) নিকাহ নবায়ন করবে। আপনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

قال ابن عابدين: ولا يفتى بوجوب تجديد النكاح بمجرد الوسوسة — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩ (কিতাবুন নিকাহ)


৪. আপনার ৪ নম্বর প্রশ্ন: মনকে কীভাবে বোঝাবেন?

মনকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না—বরং ওয়াসওয়াসাকে উপেক্ষা করুন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি ও রুহানি নীতি। ইমাম গাজালি (রহ.) «إحياء علوم الدين» -এ এবং মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ইসলাহি খুতুবাত» -এ বলেছেন:

ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা তিনটি: (১) তা নিয়ে চিন্তা না করা, (২) বারবার চেক না করা, (৩) আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।

আপনি যত "চেক" করবেন, তত ওয়াসওয়াসা বাড়বে। চেক করা বন্ধ করুন। মনে বাজে কথা এলে সাথে সাথে "আউযুবিল্লাহ" পড়ে অন্য কাজে মন দিন।


৫. আপনার ৫ নম্বর প্রশ্ন: ইচ্ছাকৃত নাকি ওয়াসওয়াসা?

আপনি নিজেই লিখেছেন—"মাঝে মাঝে মনে হয় ইচ্ছাকৃত, মাঝে মাঝে মনে হয় না।" এই দ্বিধাটাই ওয়াসওয়াসার প্রমাণ। যে কাজ করলে আপনার অন্তরে ভয় ও অনুতাপ জন্মে, সেটা ইচ্ছাকৃত কুফর নয়। ইচ্ছাকৃত কুফরকারীর অন্তরে ভয় থাকে না, অনুতাপ থাকে না।

আপনার মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে "নাউযুবিল্লাহ", "আস্তাগফিরুল্লাহ" আসা—এটি ঈমানের নূর ও শয়তানের বিরুদ্ধে আপনার রুহের প্রতিরোধের প্রমাণ। এটি ভালো লক্ষণ, খারাপ নয়।


৬. আপনার ৬ নম্বর প্রশ্ন: মুফতির উত্তরের দায়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি মনে রাখুন:

المفتي مؤاخذ بفتواه إذا اجتهد وأخطأ خطأً بيناً، وأما المستفتي فمعذور إذا عمل بقول المفتي — ইমাম শাশি, উসুলুশ শাশি; ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪৮ (বাবুল ফতোয়া)

অর্থ: মুফতি যদি ইজতিহাদ করে ভুল করেন, তবে ভুলটি স্পষ্ট হলে তিনি দায়ী; আর যে ব্যক্তি ফতোয়া অনুযায়ী আমল করে, সে ওজরপ্রাপ্ত। আপনি বিস্তারিত প্রশ্ন করেছেন, মুফতি বিস্তারিত উত্তর দিয়েছেন—আপনি নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী আমল করছেন, ইনশাআল্লাহ আপনি দায়ী নন।

তবে একটি সতর্কতা: ফতোয়া নেওয়ার পরও বারবার নতুন করে প্রশ্ন করা, নতুন সন্দেহ তৈরি করা—এটি ওয়াসওয়াসার লক্ষণ। একবার ফতোয়া নিয়েছেন, তার উপর অটল থাকুন। নতুন করে জিজ্ঞাসা করবেন না।


৭. আপনার সবচেয়ে বড় ভয়: স্বামীর সাথে আখিরাতে থাকা

প্রিয় বোন, এটি একটি বৈধ ও সুন্দর আকাঙ্ক্ষা। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ — সূরা রা'দ, আয়াত ২৩

অর্থ: "স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তারা نیز।"

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন» -এ এই আয়াতের তাফসিরে বলেন—জান্নাতে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হবে, যদি উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করেন। আপনার এই দুআ করুন, এবং ওয়াসওয়াসাকে আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা দিয়ে জবাব দিন।


৮. ব্যবহারিক করণীয় (খুব গুরুত্বপূর্ণ)

১. চেক করা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন—মুখ খোলা, জিহবা নাড়ানো, মনে মনে পুনরাবৃত্তি—সব বন্ধ। ২. মনে বাজে কথা এলে সাথে সাথে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ে অন্য কাজে লেগে যান। ৩. নতুন করে ফতোয়া চাইবেন না—একবার পেয়েছেন, যথেষ্ট। ৪. প্রতিদিন কালিমা তাইয়্যিবা ও ইস্তিগফার বেশি বেশি পড়ুন (কোনো নবায়ন নয়, শুধু যিকির)। ৫. ইউটিউবে ঈমান-বিয়ে নিয়ে ভিডিও দেখা বন্ধ করুন—এগুলো আপনার ওয়াসওয়াসাকে বাড়াচ্ছে। ৬. নিজেকে বলুন: "আমি মুসলিম, আমার ঈমান ও নিকাহ সহিহ, মুফতির ফতোয়া অনুযায়ী আমি নিরাপদ।" ৭. প্রয়োজনে একজন মহিলা ইসলামি কাউন্সেলর বা মুফতির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করুন—শুধু ওয়াসওয়াসার চিকিৎসার জন্য।


উপসংহার

আপনার ঈমান ও নিকাহ সহিহ ও বহাল আছে, ইনশাআল্লাহ। আপনি কুফরিকে বিশ্বাস করেননি, মুখে শব্দসহ উচ্চারণ করেননি, বরং ভয় পেয়েছেন ও অনুতপ্ত হয়েছেন—এসবই ঈমানের প্রমাণ। নবায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার সমস্যা ফিকহি নয়, বরং ওয়াসওয়াসা—এর চিকিৎসা হলো উপেক্ষা করা ও আল্লাহর উপর ভরসা করা।

আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন, এবং আপনাকে ও আপনার স্বামীকে জান্নাতে একত্রে রাখুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.