স্বপ্নে সুরমা, দোয়া ও কান্না দেখার ইসলামিক ব্যাখ্যা।
Faith and Belief · Hanafi
Question
স্বপ্নে দেখলাম একটা জায়গা, খোলা জায়গায় ছাউনি দেয়া কয়েকজন মহিলা।
আর একজন ইসলামিক মাইন্ডের ছেলে।
পাঞ্জাবী পড়া।
সবাই সেখানে যার যার নিজের মতো করে দোয়া করছে।
দোয়াটা এমন ইঙিত করছে যা নবী (স) এর দিকে।
আমি এমনভাবে দোয়া করছি যে আমার দুচোখ বেয়ে শুধু অতিরিক্ত পরিমানে কান্নার স্রোত যাচ্ছে। সব চেয়ে বেশি কান্না আমি করছি
দোয়া শেষে সামনে মাটিতে রাখা সুরমার ঢিবি ২ টা। একপাশে হালকা কালার অন্য পাশে একটু গাঢ় কালার সুরমা।
গাঢ় কালার সুরমা পুরে নাকি যেন চালুনি দিয়ে চেলে আলাদা করা না কি যেন সামান্য উন্নত।
সেই ছেলেটি সবাইকে গাঢ় সুরমা দিচ্ছে।
দেখলাম আমার গালে নখ দিয়ে ভরে দিছে আমি সেখানে থেকে আমার চোখে দিলাম।
কিন্তু অল্প। পরে আমি নিজে সেখানে থেকে সুরমা নিয়ে দুচোখে পড়লাম।
সবাই চলে গেছে।
আমি মনে মনে ভাবছি এখানে এতো সুরমা পড়ে আছে এখান থেকে কিছু নিয়ে গেলেও তো ব্যবহার করতে পারি।
কিন্তু আমার মনে হলো যে নাহ, এটা করা ঠিক হবে না।
তাহলে এটা চুরি করা হবে।
এটি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন স্বপ্ন??নাকি নিজের দৈনন্দিন কোন কাজের কারণে দেখা মনের খেয়াল?
যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ইঙিত হয় তাহলে সেই সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি বলে নিই: স্বপ্ন কোনো শরীয়তের দলীল নয়। ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সতর্কবার্তা হতে পারে, আবার শয়তানের প্রভাব, মনের খেয়াল বা দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার প্রতিচ্ছবিও হতে পারে। তবে স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো নতুন হুকুম বা আমল সাব্যস্ত হয় না; বরং যা শরীয়তে হালাল, তা-ই হালাল থাকে, যা হারাম তা-ই হারাম থাকে। ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.)-এর যুগ থেকেই ফকীহগণ স্পষ্ট করেছেন—স্বপ্ন দিয়ে হালাল-হারাম নির্ধারণ করা যায় না; শরীয়তের বিধান কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা-কিয়াস থেকেই নেওয়া হয় (রাদ্দুল মুহতার, ১/১২৭-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৩০-এর প্রাসঙ্গিক আলোচনা)।
স্বপ্নটি বিশ্লেষণ
আপনার স্বপ্নে কয়েকটি দিক আছে:
১. দোয়া ও কান্না — নবী (সা.)-এর দিকে ইঙ্গিতমূলক দোয়া এবং আল্লাহর ভয়ে কান্না। এটি দ্বীনের প্রতি আপনার অন্তরের টান ও ভালোবাসার লক্ষণ হিসেবে শুভ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "দুই চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—সে চোখ যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে" (তিরমিযী: ১৬৩৯)। তবে এটি আমল হিসেবে আল্লাহর ভয় ও ইখলাস বাড়ানোর তাগাদা, কোনো বিশেষ ইশারা নয়।
২. সুরমা বিতরণ ও চোখে লাগানো — সুরমা ব্যবহার সুন্নত (আবু দাউদ: ৩৮৭৮; তিরমিযী: ১৭৫৭)। স্বপ্নে সুরমা পাওয়া সাধারণত দ্বীনি উপকার, জ্ঞান বা দৃষ্টি-বৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় (ইবনু সীরীন-এর তাবীর গ্রন্থসমূহে সুরমার ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)। তবে এটি ব্যক্তিগত প্রতীক, শরীয়তের প্রমাণ নয়।
৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক — "এটা চুরি হবে" এই অনুভূতি — আপনার অন্তরে যে সততা ও আমানতদারির অনুভূতি জেগেছে, সেটিই স্বপ্নের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা। শরীয়তে অন্যের সম্পদ বিনা অনুমতিতে নেওয়া চুরি বা গাসব, যা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না" (সূরা বাকারা: ১৮৮)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সে তা বহন করবে" (বুখারী: ২৪৪৯)। আপনার অন্তরের এই সংযম আল্লাহর তাওফিকের নিদর্শন—এটিকে ধরে রাখুন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে কি না?
এটি নিশ্চিতভাবে বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে লক্ষণ হিসেবে বলা যায়—স্বপ্নটি শুভ ও দ্বীনি চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ; এতে কোনো শরীয়তবিরোধী কিছু নেই। এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সততা ও আল্লাহভীতির প্রতি উৎসাহ হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে কোনো বিশেষ ঘটনা বা ভবিষ্যৎ-সংকেত হিসেবে নয়। হাদীসে এসেছে, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ (বুখারী: ৬৯৮৪; মুসলিম: ২২৬৩)। আর যে স্বপ্নে শরীয়তবিরোধী কিছু থাকে না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।
করণীয়
- স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো নতুন আমল, বিশেষ ইবাদত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না।
- আল্লাহর ভয়ে কান্না, দোয়া ও সততার অনুভূতি বাস্তব জীবনে ধরে রাখুন—এটাই স্বপ্নের প্রকৃত ফায়দা।
- স্বপ্ন নিয়ে বেশি ভাববেন না; নিয়মিত কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করুন।
- ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শোকর আদায় করুন; খারাপ স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুতু ফেলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চান এবং কারো কাছে বর্ণনা করবেন না (মুসলিম: ২২৬২)।
- আপনার অন্তরে যে "চুরি করা ঠিক হবে না" এই চেতনা জাগল—এটি দ্বীনের আলো; এটিকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমানতদারির নীতি হিসেবে গ্রহণ করুন।
সারকথা
স্বপ্নটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সততা ও আল্লাহভীতির প্রতি একটি উৎসাহমূলক ইশারা হতে পারে, তবে এটি কোনো শরীয়তের দলীল বা ভবিষ্যৎ-ভবিষ্যদ্বাণী নয়। আপনার অন্তরের সততা ও আল্লাহর ভয়ই এখানে মূল সম্পদ—সেটিকে ধরে রাখাই কর্তব্য।
والله أعلم بالصواب