স্বামী রাগ করে শাশুড়ির বাসায় চলে গেছেন, সিহরের সন্দেহ, দাম্পত্য কলহ — ইসলাম কী বলে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: আপনার একটি কন্যা সন্তান আছে। স্বামীসহ আপনি আপনার বাবার বাসায় থাকেন। কিছুদিন আগে স্বামী হঠাৎ রাগ করে খারাপ ব্যবহার করে তার মায়ের বাসায় চলে যান। আপনার মতে আপনার কোনো দোষ নেই। তার আগে থেকেই "সেহের" (জাদু/ইন্দ্রজাল) সমস্যা আছে। এখন তিনি আপনার সাথে কথা বলেন না। আপনি কী করতে পারেন?
প্রথম কথা: "সেহের" (জাদু) সম্পর্কে সতর্কতা
ইসলামে জাদু (সিহর) একটি বাস্তব বিষয়, কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু প্রতিটি দাম্পত্য কলহ বা মনোমালিন্যকে জাদুর সাথে সম্পৃক্ত করা ঠিক নয়। শয়তান মানুষকে এই ধরনের সন্দেহে ফেলে দেয়, যাতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে আরও দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তাদের (মানুষের) মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা হয় যাদুর মাধ্যমে..." (সূরা আল-বাকারা: ১০২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের রক্তের মতো চলাফেরা করে।" (সহীহ বুখারী: ৩২৮১; সহীহ মুসলিম: ২১৭৫)
তাই প্রথমে সিহরের চিকিৎসার চেয়ে দাম্পত্য সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। তবে যদি সত্যিই সিহরের লক্ষণ থাকে (যেমন: হঠাৎ চরম বিদ্বেষ, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অকারণ ঘৃণা, অস্বাভাবিক আচরণ), তাহলে শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ ও দু'আ করা যাবে — তবে কোনো জাদুকর/তাবিজ-কবজ বা হারাম পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় কথা: আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)
১. ধৈর্য ও দু'আ — সবচেয়ে বড় হাতিয়ার
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে সর্বদা বিপদে পরীক্ষা করা হয় — সন্তান, সম্পদ ও নিজের ব্যাপারে — যতক্ষণ না সে পাপমুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাথে মিলিত হয়।" (তিরমিযী: ২৩৯৯)
নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, এবং বিশেষভাবে সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত, আয়াতুল কুরসী, এবং সূরা আল-ফালাক, আন-নাস পড়া অব্যাহত রাখুন। সকাল-সন্ধ্যা রাসূল ﷺ-এর মাসনূন দু'আগুলো পড়ুন।
২. স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করুন — নরমভাবে
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো..." (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫)
করণীয়:
- সরাসরি তর্ক নয়, বরং একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর (উভয় পক্ষের সম্মানিত ব্যক্তি, যেমন আপনার বাবা, তার বাবা, বা কোনো নির্ভরযোগ্য আলেম/বুযুর্গ) মাধ্যমে কথা বলানোর চেষ্টা করুন।
- আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আর যদি তাদের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক তার পরিবার থেকে ও এক বিচারক তার পরিবার থেকে নিয়োগ করো; তারা যদি সংশোধন চায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলন ঘটাবেন।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
- নিজে থেকে বারবার ফোন/মেসেজ দিয়ে চাপ প্রয়োগ করবেন না — এতে তিনি আরও দূরে সরে যেতে পারেন। বরং শান্তভাবে, সম্মানের সাথে একবার যোগাযোগের চেষ্টা করুন।
৩. নিজের দিকটি আত্মপর্যালোচনা করুন
আপনি বলেছেন আপনার দোষ নেই — এটি আপনার অনুভূতি, যা সম্মানিত। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে আত্মপর্যালোচনা করা সবসময় কল্যাণকর। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর সর্বোত্তম ভুলকারী সেই, যে তাওবা করে।" (তিরমিযী: ২৪৯৯)
নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: কোনো কথায় তিনি অপমানিত হয়েছেন কি? তার পরিবারের ব্যাপারে কোনো ভুল বোঝাবুঝি আছে কি? অভিযোগ নয়, বোঝাপড়ার মনোভাব নিয়ে ভাবুন।
৪. স্বামীর মায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা
স্বামী তার মায়ের বাসায় গেছেন — এটি ইঙ্গিত দেয় মা-ছেলের সম্পর্ক আপনার দাম্পত্যে প্রভাব ফেলছে। ইসলামে শাশুড়ির হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১)
সম্ভব হলে শাশুড়ির সাথে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করুন — এটি পরোক্ষভাবে স্বামীর মন জয় করতে সাহায্য করবে।
৫. সিহরের সন্দেহ থাকলে শরীয়তসম্মত ব্যবস্থা
যদি সত্যিই সিহরের প্রবল লক্ষণ থাকে:
- রুকইয়াহ শরীয়াহ (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক) করুন — কোনো অভিজ্ঞ, শরীয়তসম্মত আলেমের তত্ত্বাবধানে।
- হারাম পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরিহার করুন — তাবিজ-কবজ, জাদুকরের কাছে যাওয়া, পীর-ফকিরের অশরীয়তসম্মত আমল ইত্যাদি।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করল, তার চল্লিশ দিনের নামাজ কবুল হবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩০)
৬. সবর ও আল্লাহর উপর ভরসা
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
আপনার সন্তানের প্রতি দায়িত্বও পালন করুন — সে আপনার আমানত। তাকে ভালোবাসা ও যত্ন দিন, এবং তার জন্য দু'আ করুন।
উপসংহার
সংক্ষেপে আপনার করণীয়:
- ধৈর্য ধরুন এবং নিয়মিত দু'আ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- **একজন নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর (পারিবারিক মাহরাম মুরব্বির) ** মাধ্যমে স্বামীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করুন।
- শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করুন।
- সিহরের সন্দেহ থাকলে শরীয়তসম্মত রুকইয়াহ করুন — হারাম পদ্ধতি পরিহার করুন।
- সন্তানের যত্ন ও নিজের ইবাদত অব্যাহত রাখুন।
আল্লাহ তা'আলা আপনার দাম্পত্য জীবনকে সংশোধন করুন এবং আপনার পরিবারে শান্তি ও বরকত দান করুন। আমীন।