স্বপ্নে কেউ খাবার খাওয়ানো দেখলে কি সন্তান হয় না?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: স্বপ্নে কেউ কিছু খাওয়ানো দেখার কারণে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বাচ্চা হয় না—এমন কোনো বিধান নেই। বাচ্চা না হওয়ার কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়; ডাক্তারি রিপোর্ট ভালো থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ চালিয়ে যান। তবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টান না থাকা, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণেও বিলম্ব হতে পারে—এসবের সমাধানে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও ধৈর্য জরুরি। জাদু-টোনার ভয়ে কবিরাজ/তাবিজ-কবজের পেছনে না ছুটে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বৈধ রুকাইয়া, দোয়া-যিকর ও চিকিৎসা অবলম্বন করুন। নিচে বিস্তারিত।
১) স্বপ্নের ‘খাওয়ানো’ কি বাস্তব কারণ?
না। স্বপ্ন (رؤيا) ইসলামে কোনো বিধানগত প্রমাণ (দলিল) নয়। স্বপ্ন তিন প্রকার: (ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (খ) শয়তানের ওয়াসওয়াসা/ভয় দেখানো, (গ) মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিচ্ছবি। (বুখারী, মুসলিম—হাদীসের সারমর্ম)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে এবং মানুষের নিজের মনোভাবের প্রতিচ্ছবি।” (মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩-এর অধ্যায়; তিরমিযী ২২৮০)
তাই স্বপ্নে কেউ কিছু খাওয়ানো দেখে এটা ধরে নেওয়া যে “এ কারণেই সন্তান হচ্ছে না”—এটি শরীয়তসম্মত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ওয়াসওয়াসা ও ভয়ের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। আপনার প্রশ্নের ক্যাটাগরি ‘Waswasa-OCD’ হওয়াও এদিকে ইঙ্গিত করে।
হানাফি উসূল: “اليقين لا يزول بالشك” — নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না। (শরহুল কাওয়াইদ; আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর) ডাক্তারি রিপোর্ট ভালো থাকা একটি বাহ্যিক নিশ্চয়তা; স্বপ্ন তা বাতিল করে না।
২) জাদু (সিহর) কি সন্তান জন্মদানে বাধা দিতে পারে?
ইসলামে সিহরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না; কুরআনে সূরা আল-ফালাক ও আন-নাসে এর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশ আছে, এবং সূরা আল-বাকারার ১০২ নং আয়াতে সিহরের আলোচনা আছে। তবে প্রতিটি সমস্যাকে জাদু বলে ধরে নেওয়া ভুল; বরং সাধারণত প্রাকৃতিক কারণই বেশি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “لا عدوى ولا طيرة...” — সংক্রমণ ও কুলক্ষণ বলে কিছু নেই (বুখারী ৫৭৭৬, মুসলিম ২২২০)। অন্য হাদীসে: “الطيرة شرك” — কুলক্ষণ ধরে নেওয়া শিরক (আবু দাউদ ৩৯১০; তিরমিযী ১৬১৪)। সুতরাং “স্বপ্নের কারণে বাচ্চা হচ্ছে না” —এমন বিশ্বাস পোষণ করা থেকে বিরত থাকুন; এটি কুচিন্তা ও শয়তানের প্ররোচনা।
৩) করণীয় ও বাঁচার উপায় (শরীয়তসম্মত)
(ক) চিকিৎসা চালিয়ে যান
বাচ্চা না হওয়া একটি চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক বিষয়। স্ত্রীর প্রাথমিক পরীক্ষা, হরমোন, ডিম্বস্ফোটন, গর্ভধারণ-সংক্রান্ত পরীক্ষা ইত্যাদি বিশেষজ্ঞ গাইনোকোলজিস্টের মাধ্যমে করান। রাসূল ﷺ বলেছেন: “تداووا فإن الله لم يضع داءً إلا وضع له دواءً” — চিকিৎসা করো; আল্লাহ কোনো রোগ দেননি যার ওষুধ দেননি (আবু দাউদ ৩৮৫৫; তিরমিযী ২০৩৮)। হানাফি ফিকহে চিকিৎসা গ্রহণ জায়েয ও অনেক সময় কর্তব্য।
(খ) বৈধ রুকাইয়া ও দোয়া
১. সূরা আল-ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা আল-ফালাক, সূরা আন-নাস, সূরা আল-ইখলাস নিয়মিত পড়া ও ফুঁ দেওয়া। ২. সকাল-সন্ধ্যার যিকরসমূহ (আল্লাহুম্মা বিসমিকা..., আয়াতুল কুরসী, তিন কুল)। ৩. নিম্নোক্ত দোয়া বেশি পড়া:
- رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ (সূরা আস-সাফফাত: ১০০)
- رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯)
- رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
- اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ... (তিরমিযী ৩৫৪৪) ৪. স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক, ভালোবাসা ও সহানুভূতি বাড়ান; রাগ-অভিমান দূর করুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: “خيركم خيركم لأهله” — তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম (তিরমিযী ৩৮৯৫)।
(গ) কবিরাজ/তাবিজ-কবজ থেকে বিরত থাকুন
শরীয়তবিরোধী কবিরাজি, অশরীয়তসম্মত তাবিজ, জিন-শয়তানের নামে আমল, কুফরি কালাম ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। রাসূল ﷺ বলেছেন: “من تعلق تميمة فلا أتم الله له” — যে তাবিজ ঝুলাল, আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ না করুন (আহমাদ ১৭৪২২; আবু দাউদ ৩৮৮৩)। হানাফি ফিকহে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম-গুণাবলি সংবলিত বৈধ তাবিজের অনুমতি আছে, কিন্তু অজ্ঞ কবিরাজের কাছে যাওয়া ও অশরীয়তসম্মত পদ্ধতি পরিহার করা আবশ্যক। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, ‘তাবিজ’ অধ্যায়; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫)
(ঘ) ওয়াসওয়াসা (OCD) নিয়ন্ত্রণ
স্বপ্ন ও জাদুর ভয় বারবার আসলে নিজেকে বলুন: “এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা; আমি আল্লাহর উপর ভরসা করছি।” বেশি বেশি لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ ও حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ পড়ুন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—এটি শরীয়তবিরোধী নয়।
৪) একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
আপনি লিখেছেন, রুকাইয়ার সময় স্ত্রীর মাঝে “একটিভ” হয় এবং বলে “আমার স্ত্রীকে ভালো লাগে” —এ ধরনের ঘটনা জিন-শয়তানের প্রভাব বা মানসিক অবস্থার কারণে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে:
- নিজে অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- অভিজ্ঞ, আমানতদার ও শরীয়তসম্মত আলেম/রাকীর পরামর্শ নিন; প্রয়োজনে চিকিৎসকও।
- স্ত্রীর প্রতি সহিংসতা, ভয় দেখানো বা কঠোরতা পরিহার করুন; রাসূল ﷺ কখনো পরিবারের প্রতি কঠোর হননি।
আল্লাহ তাআলা আপনার দাম্পত্যে বরকত দান করুন এবং নেক সন্তান দান করুন। আমীন।