শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলা প্রসঙ্গে।

Family Life · Hanafi

Question No: 7667
Questioner: Nasrin Sonia
Question Asked: 31 Oct 2026, 09:53 PM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 09:03 AM
Views: 11
Tokens: 9,887
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন নারীর শ্বাশুড়ি বিয়ের পর থেকেই তাকে বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দিয়েছে।তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে জবান দ্বারা। তিনি প্রায়শই মেয়েটাকে কটু/অপমানজনক কথা,তার পরিবার নিয়ে,তার কাজ নিয়ে এবং তার আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে,মেয়ের মায়ের সহকর্মী,এবং নিজের বাসার কাজের মহিলা কারো কাছেই ছেলের বউয়ের সমালোচনা,তাকে ছোট করা বাদ দেয়নি।

শ্বাশুড়ির এমন আচরনে মেয়েটির শ্বাশুড়ির সাথে দূরুত্ব বাড়ে।মেয়েটি রান্না করে,ঘরে কাজ যেটুকু পারে করে।শ্বাশুড়ির অসুস্থতায় চেষ্টা করে অল্প হলেও সাহায্য করার।এক কথায় জুলুম যেনো না হয় তার প্রতি খেয়াল রাখে।কিন্তু মহিলার কটু কথার কারনে,এবং কথা বলতে গেলে কিছুক্ষণ পর কৌশলে কটু কথা শুনার ভয়ে মেয়েটার বলা যায় মানসিক সমস্যার মতোই দেখা দিয়েছে।এখন মেয়েটা তার শ্বাশুড়ির সাথো কথা বলতে ভয় পায়।রাতে শ্বাশুড়ি শুয়ে পড়লে খেতে যায়,কখনো লুকিয়ে থাকে যাতে করে শ্বাশুড়ির কটু কথা এবং ইচ্ছেমত অর্ডার এসব থেকে বাঁচতে পারে।
কিন্তু ইদানীং শ্বাশুড়ি তার ছেলেকে এসব নিয়ে অভিযোগ করে এবং বলে যে তিনি এখান থেকে চলে যাবেন।মেয়েটির হাসবেন্ড তাকে বলে যে প্রতিদিন তার মায়ের সাথে গিয়ে গল্প করতে।এটা তার আদেশ।
এবং সে অশান্তি চায়না।

কিন্তু মেয়েটি যেহেতু শ্বাশুড়িকে ভয় পায়।তার পক্ষে শ্বাশুড়ির সাথে বসে গল্প করা সম্ভব হবেনা বলেই মনে হয়।যদিও রান্নার সময় সে টুকটাক শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলে।কিন্তু সেসময়ও শ্বাশুড়ি তাকে কটু কথা,অপমান করতে ভুলেনা।
অন্যদিকে মেয়ের হাসবেন্ডও ঠিকমতো মেয়ের বাবা মায়ের খোঁজখবর নেয়না।শুধু দেখা হলেই ফর্মালিটি দেখায়।অথচ তার মায়ের সাথে গিয়ে গল্প করার জন্য স্ত্রীর উপর চাপ প্রয়োগ করছে।

এমতাবস্থায় ঐ মেয়ে যদি তার শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলতে অপরাগ হয়।এর ফলে তার হাসবেন্ডের কথা না রাখাতে কি তাকে গুনাহগার হতে হবে?

Answer

শ্বাশুড়ির সাথে কথা না বলায় স্ত্রী কি গুনাহগার হবে?

উত্তর

প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে ঐ মেয়ে যদি তার শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়,একটি কথাও বলেনা,দেখা সাক্ষাৎ হলদ সালামও দেয়না, এক্ষেত্রে সে তার হাসবেন্ডের কথা না রাখাতে তাকে গুনাহগার হতে হবে।

সুতরাং অনিচ্ছা সত্ত্বেও শ্বাশুড়ির সাথে কথা বলতে হবে। প্রয়োজন দেখা সাক্ষাৎ হলে শুধুমাত্র সালাম বিনিময় করবে,প্রতিদিন কথা না বললেও ২/১ দিন পরপর দেখা সাক্ষাৎ হলে কমপক্ষে সালাম বিনিময় অবশ্যই করবে।

শ্বাশুড়ির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের কটুবাক্য, গালি, অপমান ও চোগলখুরি (গীবত) করা সুস্পষ্ট গুনাহ ও জুলুম। স্ত্রীর মানসিক আঘাত ও ভয় একটি বৈধ ওজর (عُذْر)। তাই ভয় ও মানসিক কষ্টের কারণে শ্বাশুড়ির সাথে একান্তে বসে গল্প না করা গুনাহ নয়; বরং নিজেকে নিরাপদ রাখা শরীয়তসম্মত।

তবে ইসলামে স্বামীর আনুগত্য (طاعة الزوج) ফরজ। তাই শ্বামীর বৈধ নির্দেশ মানা স্ত্রীর উপর আবশ্যক। কিন্তু স্বামীর এই নির্দেশ যদি স্ত্রীর উপর জুলুম ও ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে তা মানা আবশ্যক নয় — বরং স্বামীর উচিত মায়ের জুলুম প্রতিরোধ করা ও স্ত্রীকে রক্ষা করা।

শ্বাশুড়ির কটুবাক্য ও অপমান — কঠোর নিষিদ্ধ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ১০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০

অর্থ: "প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।"

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ» — সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৭

অর্থ: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।"

গীবত সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ:

«وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ» — সূরা হুজুরাত, আয়াত ১২

অর্থ: "তোমরা একে অন্যের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তা তোমরা অপছন্দ করো।"

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ গীবত ও অপমানের ভয়াবহতা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, গীবত কবিরা গুনাহ — যদি না তা শরীয়তসম্মত ওজরে হয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা হুজুরাতের তাফসীরে বলেন, গীবত ও তানয (অপমান) মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি ধ্বংস করে এবং ঘরের শান্তি নষ্ট করে।

সুতরাং শ্বাশুড়ির এই আচরণ সুন্নাহ ও কুরআনের সুস্পষ্ট পরিপন্থী। এতে স্ত্রীর দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ও শরীয়তসম্মত প্রতিক্রিয়া।

জুলুম প্রতিরোধ করা ও নিজেকে রক্ষা করা বৈধ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

«وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ» — সূরা হুদ, আয়াত ১১৩

আরও ইরশাদ:

«وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ» — সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫

অর্থ: "তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।"

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যগণ «আল-হিদায়া» ও «শরহু মাআনিল আছার»-এর আলোকে বলেছেন, কেউ যদি অন্যের জুলুমের শিকার হয়, তবে তার জন্য জালিমের সাথে মেলামেশা কমানো, দূরত্ব রাখা ও নিজেকে রক্ষা করা জায়েয — বরং কখনো কর্তব্য। (আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ; শরহু মাআনিল আছার, খণ্ড ৪)

ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) «শরহু মুশকিলিল আছার»-এ উল্লেখ করেছেন, মুমিনের জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ থেকে দূরে থাকা ও নিজের দ্বীন-দুনিয়া রক্ষা করা অগ্রগণ্য।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেছেন, শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্কে জুলুম ও কটুবাক্য পরিহার করা উভয় পক্ষের কর্তব্য; আর জুলুমের শিকার ব্যক্তির জন্য দূরত্ব রক্ষা করা দোষণীয় নয়। (বেহেশতী জেওর, ১ম খণ্ড, "আত্মীয়স্বজনের হক" অধ্যায়)

স্বামীর আনুগত্য — সীমা ও শর্ত

কুরআনে ইরশাদ:

«الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ» — সূরা নিসা, আয়াত ৩৪

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا» — সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১১৫৯ (হাসান সহিহ)

তবে ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ স্পষ্ট করেছেন:

"الطاعة إنما تجب في المعروف، ولا طاعة لمخلوق في معصية الخالق، ولا فيما فيه ضرر على الزوجة" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ, "حقوق الزوجین" অধ্যায়)

অর্থ: "আনুগত্য কেবল ন্যায়সংগত ও শরীয়তসম্মত বিষয়ে; সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা নেই, আর স্ত্রীর ক্ষতিসাধনকারী বিষয়ে আনুগত্য নেই।"

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন, স্বামী যদি স্ত্রীকে পিতা-মাতার জুলুমের মুখে ঠেলে দেন, তবে তা শরীয়তসম্মত নির্দেশ নয়; বরং স্বামীর কর্তব্য পিতা-মাতার খিদমত করা এবং স্ত্রীর হক আদায় করা — উভয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, "حقوق الزوجین" অধ্যায়)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে উল্লেখ করেছেন, স্বামীর নির্দেশে স্ত্রীর উপর জুলুম করা বা তাকে মানসিক কষ্টে ফেলা জায়েয নয়; আর স্ত্রীর জন্য ভয় ও ক্ষতির আশঙ্কায় কোনো কাজ পরিহার করা গুনাহ নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)

মানসিক কষ্ট ও ভয় — বৈধ ওজর

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) «কিতাবুল আছার»-এ বলেছেন, কেউ যদি কোনো কাজে স্পষ্ট ক্ষতি বা মানসিক কষ্টের আশঙ্কা করে, তবে তা পরিহার করা তার জন্য বৈধ; শরীয়ত ওজরগ্রাহ্য।

ইমাম আল-আলমগিরি «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে উল্লেখ করেছেন:

"الضرر يُزال، ولا ضرر ولا ضرار في الإسلام" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

অর্থ: "ক্ষতি দূর করা হবে; ইসলামে ক্ষতি নেই, ক্ষতিসাধনও নেই।"

সুতরাং স্ত্রীর মানসিক কষ্ট, ভয় ও অস্বস্তি একটি বৈধ ওজর। এ অবস্থায় শ্বাশুড়ির সাথে একান্তে বসে গল্প না করা গুনাহ নয়; বরং নিজের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা অগ্রগণ্য।

স্বামীর কর্তব্য — ভারসাম্য ও ইনসাফ

কুরআনে ইরশাদ:

«وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» — সূরা নিসা, আয়াত ১৯

অর্থ: "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে ন্যায়সংগত ও সদাচরণের সাথে জীবনযাপন করো।"

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» — সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫ (সহিহ)

অর্থ: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম; আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।"

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, স্বামীর উপর ওয়াজিব হলো পিতা-মাতার খিদমত ও স্ত্রীর হক — উভয়ের মাঝে ইনসাফ রক্ষা করা; এক পক্ষের জুলুমে অন্য পক্ষকে ঠেলে দেওয়া জায়েয নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩)

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে আরও বলেন, স্বামী যদি মায়ের জুলুমের কথা জেনেও স্ত্রীকে জোর করে তার কাছে পাঠান, তবে তা শরীয়তসম্মত নির্দেশ নয়; বরং স্বামীর উচিত মাকে বুঝানো ও স্ত্রীকে রক্ষা করা। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.