বিয়ের ক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজনকে জানানো কি বাধ্যতামূলক?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7642
Questioner: Amatullah
Question Asked: 31 Oct 2026, 09:11 AM
Reviewed & Published: 31 Oct 2026, 10:03 AM
Views: 10
Tokens: 7,253
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
বর্তমানে আমার বিয়ের ব্যাপারে পরিবারে কথা হচ্ছে।মোটামুটি আল্লাহর রহমতে ঠিক হয়েছে।পরিবারে আমার বাবা নেই,আমার বড় ভাই এবং মা আছেন।আমার বয়স ২৭ বছর।আমি বংশের বড় মেয়ে আর একটা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তাই আমার আত্মীয় স্বজনরা একদম বসে আছে আমি ভালো চাকরি করবো,বড়লোক ক্যারিয়ার ভালো ছেলেকে বিয়ে করবো।সেদিক থেকে যে ছেলেকে পছন্দ করেছে সেরকম না,আমার ফ্যামিলির কাছে মনে হচ্ছে এখন জানালে অনেক কথাই শুনতে হবে।তাই তারা বিয়েটা একদমই পারিবারিকভাবে শুধু আমার ভাই,মা মিলে দিতে চাচ্ছে।ছেলে পক্ষের সবাই জানবে সেটাতে কোনো প্রব্লেম নেই।আমার প্রশ্ন হলো,অনেকের মুখে শুনেছি বিয়েতে নিকট আত্মীয়দের জানানো উচিত এবং তাদের দোয়া নিতে হয়।তাছাড়া পরে জানলে নাকি সেটা সংসার জীবনে খারাপ প্রভাব পরে বা এমন কিছু।আমি তাই নিশ্চিত হতে চাচ্ছি,এটা জানানো কি বাধ্যতামূলক? তাদের দোয়া নেওয়ার জন্য হলেও কি জানানো উচিত?
এবং যেহেতু আমার বাবা নেই,অনেক দিক থেকেউ আসলে আমাদের গ্যাপ রয়েছে।এর মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল কন্ডিশন একটা বড় বিষয়।কিছুদিন আগেই আমার ভাইকে প্রায় ৩০লাখ টাকা খরচ করে দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে।ঋণ জমে আছে অনেক।আল্লাহ আমাদের মাফ করুন।এই মুহূর্তে আসলে কোনটা সমিচীন হবে জানালে খুবই উপকৃত হতাম।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

বিয়ের ক্ষেত্রে নিকট আত্মীয়দের জানানো ইসলামically বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) নয়। এটি ফরজ বা ওয়াজিব কোনো বিধান নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক প্রজ্ঞা (حكمة) ও শিষ্টাচারের (أدب) অন্তর্ভুক্ত। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে যাদের জানানো বা সম্মতি নেওয়া প্রকৃতপক্ষে বাধ্যতামূলক, তারা হলেন:

  1. অভিভাবক (ওয়ালী) — হানাফি মতে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর বিয়েতে ওয়ালীর উপস্থিতি ও সম্মতি শর্ত (আবু দাউদ: ২০৮৫; তিরমিজি: ১১০২)।
  2. সাক্ষী (দুইজন পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী) — বিয়ের বৈধতার শর্ত (মুসলিম: ১৪১৯)।
  3. প্রকাশ্য ঘোষণা (إعلان النكاح) — গোপন বিয়ে নিষিদ্ধ; মসজিদে বা ঘোষণার মাধ্যমে বিয়ে করা সুন্নত (তিরমিজি: ১০৮৯)।

এছাড়া আত্মীয়দের জানানো মুস্তাহাব ও উত্তম, বিশেষত তাদের দোয়া ও স্নেহ-সম্পর্ক রক্ষার জন্য। কিন্তু না জানালে বিয়ে নাজায়েজ হবে না, এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে সংসার জীবনে কোনো "খারাপ প্রভাব" পড়বে — এ ধরনের কোনো দলিল নেই। এগুলো সাধারণত সমাজে প্রচলিত ধারণা (عرف), শরীয়তের বিধান নয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. আত্মীয়দের জানানো কি বাধ্যতামূলক?

না। কুরআন-হাদিসে বিয়ের বৈধতার জন্য শর্ত হলো: ওয়ালী, সাক্ষী ও ঘোষণা। আত্মীয়-স্বজনকে জানানো এসবের মধ্যে নেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

«فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ» — "তাদের মালিকদের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে দাও।" (সূরা নিসা: ২৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ» — "ওয়ালী ছাড়া কোনো বিয়ে নেই।" (আবু দাউদ: ২০৮৫; তিরমিজি: ১১০২ — হাসান)

আরও বলেন:

«أَعْلِنُوا النِّكَاحَ» — "বিয়েের ঘোষণা দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৯)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, বিয়ের বৈধতার শর্ত তিনটি: ওয়ালী, সাক্ষী ও প্রকাশ্যতা। আত্মীয়দের সম্মতি বা জানানো এসবের অন্তর্ভুক্ত নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯-১০, কিতাবুন নিকাহ)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তেও বিয়ের শর্তাবলিতে আত্মীয়দের জানানোর কোনো উল্লেখ নেই। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৬৮)

২. "পরে জানলে সংসারে খারাপ প্রভাব পড়ে" — এ ধারণা কতটা সঠিক?

এটি শরীয়তের বিধান নয়, বরং সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ (সূরা নিসা: ১; সূরা রা'দ: ২১), কিন্তু এর ভিত্তিতে বিয়ে গোপন রাখা বা না জানানোকে "হারাম" বা "বরকত নষ্টের কারণ" বলা যাবে না। বরং গোপন বিয়ে (نكاح السر) ইসলামে নিষিদ্ধ — সেটাই আসল নিষেধ। (তিরমিজি: ১০৮৯)

হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বিয়ের আলোচনায় বলেন, বিয়ে প্রকাশ্যে ও সমাজের জানাজানির সাথে সম্পন্ন করা সুন্নত; গোপনে নয়। কিন্তু আত্মীয়দের সম্মতি নেওয়া শর্ত নয়। (বেহেশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়)

৩. দোয়ার জন্য জানানো কি উচিত?

হ্যাঁ, উত্তম ও মুস্তাহাব — তবে বাধ্যতামূলক নয়। আত্মীয়দের দোয়া নেওয়া বরকতের কারণ, সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বিয়ের পর দোয়া পড়াতেন:

«بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ» (আবু দাউদ: ২১৩০)

তবে যদি জানানোর কারণে ফিতনা, অপমান, বা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে শরীয়তের একটি মূলনীতি প্রযোজ্য:

«دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ» — "অকল্যাণ দূর করা কল্যাণ অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।" (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর)

মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে পারিবারিক কলহ এড়াতে বিয়ের বিষয়ে প্রজ্ঞাসম্মত গোপনীয়তা রক্ষার অনুমতি দিয়েছেন, তবে বিয়ের মূল শর্তগুলো (ওয়ালী, সাক্ষী, ঘোষণা) পূর্ণ করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩০০-এর কাছাকাছি, কিতাবুন নিকাহ)

৪. আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনটি সমীচীন?

আপনার প্রশ্নে কয়েকটি দিক আছে:

(ক) ওয়ালী হিসেবে কে? — আপনার বাবা নেই। হানাফি মতে ওয়ালীর ক্রম: পিতা → দাদা → ভাই → চাচা → পরিবারের উপযুক্ত পুরুষ। সুতরাং আপনার বড় ভাই আপনার ওয়ালী। তাঁর সম্মতি ও উপস্থিতি বিয়ের বৈধতার জন্য বাধ্যতামূলক। মা ও ভাই মিলে বিয়ে দেওয়া শরীয়তসম্মত — এতে কোনো সমস্যা নেই, বরং এটাই সঠিক পন্থা।

(খ) আত্মীয়দের না জানানো: — এটি জায়েজ। তবে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে বিয়ের পরে হলেও নিকটাত্মীয়দের (চাচা, ফুফু, খালা, মামা) জানিয়ে দোয়া নেওয়া উত্তম। এতে ভবিষ্যতের মনোমালিন্য এড়ানো যায়।

(গ) আর্থিক অবস্থা ও ঋণ: — আপনার ভাইয়ের বিদেশ যাত্রায় ৩০ লাখ টাকা ঋণ — এটি বিয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে বিলম্বিত করা বা তাড়াহুড়ো করা — কোনোটাই বাধ্যতামূলক নয়। বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ» (বুখারি: ৫০৬৫)

অর্থাৎ সামর্থ্য থাকলে বিয়ে করা উত্তম। কিন্তু ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আগে — কারণ ঋণ আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ই। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারার ঋণ-সংক্রান্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন, ঋণ পরিশোধে অবহেলা করা কবিরা গুনাহ। (মাআরিফুল কুরআন: ১/৬৮০-এর কাছাকাছি)

সুতরাং সমীচীন হবে:

  • বিয়ে শরীয়তসম্মত পন্থায় (ভাই ওয়ালী, সাক্ষী, ঘোষণা) সম্পন্ন করুন।
  • আত্মীয়দের বিয়ের পরে জানিয়ে দোয়া নিন — এতে সম্পর্কও রক্ষা হবে, ফিতনাও এড়ানো যাবে।
  • ঋণ পরিশোধের জন্য একটি পরিকল্পনা করুন; বিয়ের খরচে সংযম রাখুন (সূরা ফুরকান: ৬৭)।
  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন এবং ইস্তিখারা করুন।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | আত্মীয়দের জানানো | বাধ্যতামূলক নয়; মুস্তাহাব ও উত্তম | | ওয়ালীর সম্মতি | বাধ্যতামূলক (হানাফি) | | সাক্ষী | বাধ্যতামূলক | | ঘোষণা | সুন্নত/শর্ত | | না জানালে সংসারে ক্ষতি | শরীয়তসম্মত দলিল নেই | | দোয়ার জন্য জানানো | উত্তম, তবে ফিতনার আশঙ্কায় পরে জানানোও জায়েজ |

আল্লাহ তাআলা আপনার বিয়েকে বরকতময় করুন এবং ঋণ থেকে মুক্তি দিন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.