দাম্পত্য জীবনে মানসিক অশান্তি, স্বামীর পরিবারের মিথ্যা প্রভাব ও কষ্টের সময় ইসলামের নির্দেশনা সম্পর্কে জানতে চাই?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7608
Questioner: Ri Tu
Question Asked: 30 Oct 2026, 12:10 PM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 02:32 PM
Views: 16
Tokens: 4,508
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী আমাকে যথেষ্ট বোঝেন না, আমাকে কথায় কষ্ট দেন। পরিবারের সঙ্গে একরকম, আর আমার সঙ্গে আরেকরকম আচরণ করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় মিথ্যা কথা বলে তাঁকে প্রভাবিত করেন এবং আমার দোষ খুঁজে বেড়ান। এসব কারণে স্বামী ও তাঁর পরিবারের প্রতি আমার মনে বিরূপতা তৈরি হচ্ছে, যদিও কখনো তাঁকে সরাসরি এসব বলিনি। আমার স্বামীকে সহ্য হয় না। এখন আমার করণীয় কী? এসব চিন্তার কারণে ইবাদতেও মনোযোগ দিতে পারছি না।

Answer

দাম্পত্য জীবনের মানসিক অশান্তি ও করণীয়

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার অনুভূতি ও কষ্ট স্বাভাবিক, ইসলাম এ বিষয়ে নারীর আবেগকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ইসলামের নির্দেশনা হলো—ধৈর্য (সবর), সংলাপ (শূরা), এবং সরাসরি অভিযোগ না করে প্রজ্ঞার সাথে সমাধানের পথ খোঁজা। মনে বিরূপতা পোষণ করা (হিংসা-বিদ্বেষ) ও সুধারণা (হুসনুয যন্ন) হারানো শয়তানের প্ররোচনা; এটি ইবাদতেও বাধা সৃষ্টি করে। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত করণীয় তুলে ধরা হলো।


১. প্রথমে নিজের অন্তরকে ঠিক করুন

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)

"তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)

হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন:

"মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর—যদি সুখ পায় শোকর করে, আর দুঃখ পায় সবর করে; উভয়ই তার জন্য কল্যাণ।" (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

করণীয়: বিরূপতা ও কু-ধারণা (সু-যন্ন হারানো) শয়তানের কাম্য। প্রতিদিন অন্তত একবার নিজেকে বলুন—"আমি আল্লাহর জন্য সবর করছি, তিনি প্রতিদিনের প্রতিদান দেবেন।" এতে ইবাদতে মনোযোগ ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ।


২. স্বামীর সাথে সরাসরি কথা বলুন (শূরা ও সংলাপ)

আপনি লিখেছেন—"কখনো তাঁকে সরাসরি এসব বলিনি।" এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। চুপ থাকলে কষ্ট জমে, আর স্বামী ভাবেন সব ঠিক আছে। ইসলাম শূরা ও সংলাপের নির্দেশ দেয়:

"তাদের কাজ পরামর্শক্রমে চলে।" (সূরা শূরা: ৩৮)

"তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা নিসা: ১৯)

করণীয়:

  • রাগের সময় নয়—শান্ত সময়ে, একান্তে, নরম ভাষায় নিজের অনুভূতি জানান। "তুমি আমাকে কষ্ট দাও" নয়, বরং "তোমার এই কথাটি শুনে আমার খুব কষ্ট হয়" —এভাবে বলুন।
  • তাঁর পরিবারের সমালোচনা সরাসরি নয়, বরং "আমার মনে হয় তারা ভুল বুঝছে, একটু মিটমাট করে দিলে ভালো হতো" —এভাবে বলুন।
  • হাদিসে এসেছে: "নরম ভাষায় কথা বললে ঘর আলোকিত হয়।" (মুসনাদ আহমাদ)

৩. স্বামীর পরিবারের প্রতি সু-ধারণা ও সবর

আল্লাহ বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনেক কু-ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু কু-ধারণা গুনাহ।" (সূরা হুজুরাত: ১২)

হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৭)

করণীয়:

  • শাশুড়ি/ননদ-দের প্রতি ছোট ছোট উপহার, সালাম, খোঁজখবর—এসব দিয়ে সম্পর্ক নরম করুন। হাদিসে এসেছে: "উপহার দিলে পারস্পরিক ভালোবাসা বাড়ে।" (সুনানে বায়হাকি)
  • মিথ্যা প্রভাবের প্রতিক্রিয়ায় রাগ না করে, স্বামীকে শান্তভাবে বলুন: "আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো, কিন্তু এই কথাটি সত্য নয়—একটু যাচাই করে দেখো।"
  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে লিখেছেন—স্ত্রীর জন্য স্বামীর পরিবারের সাথে সদ্ভাব রক্ষা করা দাম্পত্য শান্তির অন্যতম উপায় (রাদ্দুল মুহতার: ৩/১৪০ প্রসঙ্গ)।

৪. ইবাদতের মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন

আপনি লিখেছেন—"এসব চিন্তার কারণে ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারছি না।" এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহ বলেন:

"শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়।" (সূরা নিসা: ৬০)

করণীয়:

  • নামাজের আগে ২ মিনিট চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিন, "আমি আল্লাহর কাছে সব কিছু সঁপে দিলাম" —বলুন।
  • প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল" ও "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি পড়ুন।
  • আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর "বেহেশতী জেওর"-এ লিখেছেন—দাম্পত্য কলহের সময় সবর ও জিকিরই সর্বোত্তম প্রতিকার (বেহেশতী জেওর, ৩য় খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)।

৫. প্রয়োজনে বাইরের সহায়তা নিন

যদি সরাসরি কথা বলেও সমাধান না হয়, তবে ইসলাম অনুমোদিত পন্থায় মধ্যস্থতা (তাহকিম) নেওয়ার নির্দেশ দেয়:

"যদি তাদের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে একজনের পরিবার থেকে ও একজনের পরিবার থেকে একজন করে বিচারক নিয়োগ করো।" (সূরা নিসা: ৩৫)

করণীয়: উভয়ের বিশ্বস্ত কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ আলেম/পরিবারের লোককে মধ্যস্থতাকারী করুন। সরাসরি বিচ্ছেদের কথা ভাববেন না—এটি শেষ উপায়।


৬. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: দুআ

রাসূল ﷺ বলেছেন:

"দুআই ইবাদত।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৩৭২)

প্রতিদিন ফজরের পর ও এশার পর এই দুআ পড়ুন:

"রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান নার" (সূরা বাকারা: ২০১)

"আল্লাহুম্মা আল্লিফ বাইনা কুলুবিনা ওয়া আসলিহ যাতা বাইনিনা" —হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে মিলিয়ে দাও এবং আমাদের মধ্যে সংশোধন করে দাও।


সারসংক্ষেপ করণীয় তালিকা

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ১ | নিজের অন্তরে সবর ও সু-ধারণা তৈরি করুন | | ২ | শান্ত সময়ে স্বামীর সাথে নরম ভাষায় সরাসরি কথা বলুন | | ৩ | শাশুড়ি/ননদ-দের প্রতি সদ্ভাব ও উপহার বজায় রাখুন | | ৪ | নামাজের আগে শিথিলতা ও জিকিরের মাধ্যমে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন | | ৫ | সমাধান না হলে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করুন | | ৬ | প্রতিদিন দুআ করুন, বিশেষত ফজর ও এশার পর |

মনে রাখবেন: দাম্পত্য জীবনে সবর ও দুআর চেয়ে বড় হাতিয়ার নেই। আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দেখছেন, ইনশাআল্লাহ তিনি সমাধান দেবেন। বিচ্ছেদের কথা ভাববেন না—এটি ইসলামে ঘৃণিত (সহিহ বুখারি: ৫০৯৫)। ধৈর্য ধরুন, ইনশাআল্লাহ কল্যাণ আসবে।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.