ঢাকা শহরে রাস্তার পাশে ও দেওয়ালে জমে থাকা ধুলো কি পাক? সেই ধুলোতে তায়াম্মুম করা যাবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: ঢাকা শহরে বিভিন্ন দেওয়ালে রাস্তার পাশে যেসব ধুলো লেগে থাকে সেই ধুলোতে কি তায়াম্মুম করা যাবে? এই ধুলো কি পাক?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, দেওয়ালে বা রাস্তার পাশে জমে থাকা ধুলো পাক (তাহির) এবং তা দিয়ে তায়াম্মুম করা জায়েয — শর্ত হলো, সেই ধুলোতে নাপাকি (নাজাসাত) মিশে না থাকা। ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলো সাধারণত পাক; তবে যদি নিশ্চিতভাবে বা প্রবল ধারণায় জানা যায় যে তাতে নাপাকি (যেমন পেশাব, রক্ত, মদ ইত্যাদি) মিশেছে, তাহলে তা দিয়ে তায়াম্মুম করা যাবে না।
বিস্তারিত আলোচনা
১. তায়াম্মুমের মূল ভিত্তি: পাক মাটি/ধুলো
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا" "তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৬)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا" "আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রতার উপকরণ বানানো হয়েছে।" — (সহিহ বুখারি: ৩৩৫, সহিহ মুসলিম: ৫২১)
ইমাম তহাবি (রহ.) বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ-এর যুগে সাহাবায়ে কিরাম মাটি ও ধুলো দিয়েই তায়াম্মুম করতেন — (শরহু মাআনিল আসার, তায়াম্মুম অধ্যায়)।
২. হানাফি মাযহাবের মূলনীতি
আল-হিদায়া-তে ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) বলেন:
"التيمم جائز بالتراب والرمل والحجر والجص والنورة وما أشبه ذلك من جنس الأرض" "মাটি, বালু, পাথর, চুন, জিপসাম ও ভূ-জাতীয় বস্তু দ্বারা তায়াম্মুম জায়েয।"
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)-এ উল্লেখ আছে:
"كل ما كان من جنس الأرض فهو صعيد طهور" "ভূ-জাতীয় প্রতিটি বস্তুই পবিত্র 'সাঈদ' (তায়াম্মুমের উপকরণ)।"
অর্থাৎ, ধুলো (غبار), মাটি, বালু, পাথরের গুঁড়া — সবই তায়াম্মুমের জন্য বৈধ, যদি তা পাক হয়।
৩. রাস্তার ধুলো ও দেওয়ালের ধুলোর হুকুম
মূলনীতি: ইসলামে সবকিছুই মূলত পাক (আসলে আশ-শাইয়ু তাহির), যতক্ষণ না নাপাকির প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত কায়দা:
"الأصل في الأشياء الطهارة" "প্রত্যেক বস্তুর মূল হুকুম পবিত্রতা।"
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"الغبار الذي على الجدران والثياب طاهر ما لم يعلم نجاسته" "দেওয়াল ও কাপড়ে লেগে থাকা ধুলো পাক, যতক্ষণ না তার নাপাক হওয়া জানা যায়।"
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, ১/২৩৫) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি)-তেও একই নীতি উল্লেখ আছে: সন্দেহের কারণে কোনো বস্তুকে নাপাক বলা যাবে না; নাপাকির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।
৪. ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলোর বাস্তবতা
ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলোতে সাধারণত থাকে:
- মাটি, বালু, ইটের গুঁড়া, সিমেন্টের কণা — সবই পাক
- গাড়ির ধোঁয়া, ধুলো — পাক
- পচা আবর্জনা, পশুর মলমূত্র, মানুষের পেশাব — সম্ভাব্য নাপাকি
হুকুম:
- সাধারণ ধুলো: পাক, তায়াম্মুম জায়েয।
- যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে নির্দিষ্ট স্থানের ধুলোতে নাপাকি (পেশাব, রক্ত, মল) মিশেছে — সে ধুলো দিয়ে তায়াম্মুম জায়েয নয়।
- শুধু সন্দেহ হলে (যেমন "হয়তো নাপাকি মিশে থাকতে পারে") — সন্দেহে পাকই ধরা হবে, তায়াম্মুম জায়েয।
৫. তায়াম্মুমের শর্ত (হানাফি মাযহাব)
তায়াম্মুম সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত:
- পানি ব্যবহারে অক্ষমতা (অসুস্থতা, পানি না পাওয়া, অতিরিক্ত দূরত্ব ইত্যাদি)।
- তায়াম্মুমের উপকরণ (মাটি/ধুলো) পাক হওয়া।
- উপকরণে ধুলো থাকা (শুধু পাথর নয়, বরং ধুলোযুক্ত মাটি উত্তম)।
- নিয়ত করা।
- সমস্ত মুখমণ্ডল ও কনুইসহ দুই হাত মাসেহ করা।
বেহেশতি জেওর-এ হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন: "যে মাটি বা ধুলোতে নাপাকি মিশে যায়নি, তা দিয়ে তায়াম্মুম করা যায়।"
৬. সতর্কতা
- নাপাকি মিশ্রিত ধুলো (যেমন ময়লার ডাস্টবিনের পাশের, পেশাব-পায়খানার নিকটবর্তী দেওয়ালের ধুলো) এড়িয়ে চলাই উত্তম।
- পরিষ্কার দেওয়াল, দেয়ালের উপরের অংশ, রাস্তার শুকনো ধুলো — এসব নিরাপদ।
- সম্ভব হলে মাটি বা বালুর উপর তায়াম্মুম করা উত্তম; দেওয়ালের ধুলো দ্বিতীয় বিকল্প।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | দেওয়াল/রাস্তার সাধারণ ধুলো | পাক | | সাধারণ ধুলোতে তায়াম্মুম | জায়েয | | নাপাকি মিশ্রিত ধুলো | নাপাক | | নাপাকি মিশ্রিত ধুলোতে তায়াম্মুম | জায়েয নয় | | শুধু সন্দেহ | পাকই ধরা হবে |
উপদেশ: ঢাকা শহরে তায়াম্মুমের প্রয়োজন হলে পরিষ্কার মাটি, বালু বা নির্মাণাধীন স্থানের ধুলো ব্যবহার করা উত্তম; ময়লা-আবর্জনার নিকটবর্তী দেওয়ালের ধুলো এড়িয়ে চলুন।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন, সূরা আল-মায়িদা: ৬
- সহিহ বুখারি: ৩৩৫; সহিহ মুসলিম: ৫২১
- ইমাম তহাবি, শরহু মাআনিল আসার — তায়াম্মুম অধ্যায়
- ইমাম মারগিনানি, আল-হিদায়া — কিতাবুত তাহারাত
- ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার — তায়াম্মুম অধ্যায়
- ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) — কিতাবুত তাহারাত
- মুফতি তাকি উসমানি, ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১
- মুফতি আশরাফ আলী থানভি, ইমদাদুল ফাতাওয়া
- মুফতি আশরাফ আলী থানভি, বাহিশতী জেওয়ার — তায়াম্মুম অধ্যায়
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, মাআরিফুল কুরআন — সূরা আল-মায়িদার তাফসির
আল্লাহ ভালো জানেন।