২০২৭ সালে ভয়াবহ খাদ্য সংকট হবে — এই দাবি ইসলামি দৃষ্টিকোণে কতটা সত্য?
Food and Drink · Hanafi
Question
বর্তমান বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যে ২০২৭ সালে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিবে। আমি ওদের কথায় একদমই বিশ্বাস করতে পারছি না যতক্ষণ না ইসলামিক ভাবে এর সত্যতা নিশ্চিত হতে পারছি। আমার মত অনেকেই গরিব পরিবারের সদস্য হঠাৎ করে এমন হলে আমরা চরম বিপদে পড়তে পারি। আমাদের ধর্মগ্রন্থ অনুসারে নিশ্চিত ভাবে ২০২৭ এই এমন হবে কিনা জানালে উপকৃত হব।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর
প্রশ্নে উল্লিখিত "২০২৭ সালে ভয়াবহ খাদ্য সংকট হবে" — এ ধরনের নির্দিষ্ট তারিখভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামি দৃষ্টিকোণে কোনো নিশ্চিত ও প্রমাণিত বিষয় নয়। এটি মূলত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অনুমান, গবেষণা-প্রতিবেদন বা মিডিয়ার বিশ্লেষণ; ওহি বা শরিয়তের কোনো দলিল নয়। সুতরাং কেউ এটিকে "ধর্মগ্রন্থ অনুসারে নিশ্চিত" বলে দাবি করলে তা ভিত্তিহীন।
১. গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ
"বলুন, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েবের জ্ঞান রাখে না।" — (সূরা আন-নামল: ৬৫)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ
"গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে, তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না।" — (সূরা আল-আনআম: ৫৯)
তাই নির্দিষ্ট বছর উল্লেখ করে "অবশ্যই এমন হবে" বলা শরিয়তসম্মত নয়। ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া আল্লাহর গুণে হস্তক্ষেপের শামিল।
২. হাদিসে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নিদর্শন আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখ নেই
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতনা, দুর্ভিক্ষ ও কঠিন সময়ের কথা বলেছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সাল উল্লেখ করেননি। যেমন তিনি বলেছেন:
سَتَكُونُ فِتَنٌ... فِتْنَةٌ مُقْبِلَةٌ مُدْبِرَةٌ
"অচিরেই ফিতনা আসবে..." — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৮৮২)
আর দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ... سُوءِ الْقَضَاءِ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে... খারাপ ফয়সালা থেকে আশ্রয় চাই।" — (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৪৭)
কিন্তু কোথাও "২০২৭ সালে দুর্ভিক্ষ হবে" — এমন নির্দিষ্ট তারিখ নেই। সুতরাং এ ধরনের দাবিকে দ্বীনি সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
৩. মুসলিমের কর্তব্য: তাওয়াক্কুল ও প্রস্তুতি
ইসলাম আমাদের শেখায় — ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং বাস্তব প্রস্তুতি নেওয়া। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَوْ تَوَكَّلْتُمْ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ
"যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন যেমন পাখিকে দেন।" — (তিরমিজি, হাদিস ২৩৪৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪১৬৪)
আবার অলসতা নয় — রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:
اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ
"উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো।" — (তিরমিজি, হাদিস ২৫১৭)
সুতরাং করণীয় হলো:
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখা;
- হালাল উপায়ে রিযিকের চেষ্টা করা;
- প্রয়োজনে সঞ্চয় ও পরিকল্পনা করা (শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে);
- গুজব ও আতঙ্ক থেকে দূরে থাকা।
৪. গুজব ও ভয় ছড়ানো থেকে সতর্কতা
কুরআনে ইরশাদ:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
"হে ঈমানদারগণ! কোনো ফাসিক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনে, তবে তা যাচাই করে নাও।" — (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)
হাদিসে এসেছে:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
"মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫)
তাই সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক প্রতিবেদনকে ধর্মীয় সত্য ভেবে আতঙ্কিত হওয়া বা ছড়ানো উচিত নয়।
৫. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহে গায়েবের জ্ঞান ও ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে স্পষ্ট নীতি রয়েছে — গায়েবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে উল্লেখ করেছেন, নুজুম/জ্যোতিষ ও ভবিষ্যদ্বাণীর উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জায়েজ নয়। মোল্লা আলী কারী (রহ.) «শরহু মাআনিল আসার»-এ গায়েব সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যায় একই নীতি উল্লেখ করেছেন। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা আন-নামল ৬৫-এর তাফসিরে বলেন — গায়েবের জ্ঞান আল্লাহর একক বৈশিষ্ট্য, কোনো সৃষ্টি তা জানে না।
সারসংক্ষেপ
- "২০২৭ সালে ভয়াবহ খাদ্য সংকট" — এটি শরিয়তের কোনো প্রমাণিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; বরং মানুষের অনুমান ও বিশ্লেষণ।
- কেউ এটিকে দ্বীনি সত্য বলে দাবি করলে তার দাবি ভিত্তিহীন।
- মুসলিমের কর্তব্য: আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, হালাল চেষ্টা, বাস্তব প্রস্তুতি এবং গুজব থেকে দূরে থাকা।
- আতঙ্কিত না হয়ে দুআ করা: «اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ» — "হে আল্লাহ! আপনার হালাল দিয়ে আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহে অন্য সবার থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।" (তিরমিজি, হাদিস ৩৫৬৩)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিযিক দান করুন এবং গুজব ও ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।