কুরবানি, অংশীদারিত্ব ও মাংস বণ্টন সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি প্রশ্ন
Food and Drink · Hanafi
Question
সম্মানিত মুফতি সাহেব, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
কুরবানি সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানার প্রয়োজন হয়েছে। তাই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সহিহ দিকনির্দেশনা পেলে অত্যন্ত উপকৃত হবো, ইনশাআল্লাহ।
কুরবানি সংক্রান্ত আমার প্রশ্নসমূহ:
১. পরিবারে কুরবানির নিয়ত ও নাম নির্ধারণ
যদি বাবা,মা পরিবারের পক্ষ থেকে সাত শরিকে কুরবানি দেন, তাহলে কুরবানি কার নামে হওয়া উচিত? এ বিষয়ে শরিয়তের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি?
২. কুরবানির মাংস তিন ভাগ করা কি বাধ্যতামূলক?
সাত শরিকে কুরবানির পর নিজেদের প্রাপ্ত মাংস কি অবশ্যই তিন ভাগে (নিজেরা, আত্মীয়স্বজন, গরিব-মিসকিন) ভাগ করতে হবে? নাকি এটি মুস্তাহাব?
৩. মাংস বণ্টনের সঠিক পদ্ধতি
মাংস ভাগ করার সময় কি দাঁড়িপাল্লা দিয়ে সমানভাবে ওজন করে ভাগ করা জরুরি? নাকি আনুমানিকভাবে হাত দিয়ে ভাগ করলেও হবে?
৪. কলিজা, ভুঁড়ি ও অন্যান্য অংশের বিধান
মাংসের মতো কলিজা, ভুঁড়ি, মাথা, পা ইত্যাদিও কি সমানভাবে ভাগ করতে হবে? নাকি এগুলোর অংশ নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে দেওয়া যাবে?
৫. বিদেশে থাকা ভাইয়ের কুরবানির মাংস বণ্টন
যদি কোনো ভাই বিদেশে থেকে নিজের নামে কুরবানির জন্য টাকা পাঠান, এরপর কুরবানির মাংস ভাই,বোনেরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, তাহলে প্রত্যেকে নিজের অংশ থেকে আবার তিন ভাগ করে বণ্টন করবে কি?
নাকি নিজেরাই খেতে পারবে?
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কুরবানির মাসআলা জানতে চাই:
৬. কুরবানির পশু কেনার পর যদি পশুর কোনো ত্রুটি দেখা দেয়, তাহলে কি সেই পশু দিয়ে কুরবানি সহিহ হবে? এক্ষেত্রে করনীয় কি?
৭. কুরবানির পশু জবাইয়ের সময় নিয়ত ও দোয়া কীভাবে পড়তে হয়?
৮. কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা বা এর মূল্য ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার বিধান কী?
৯. কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কুরবানির মাংস বা চামড়া দেওয়া যাবে কি?
১০. কুরবানির মাংস অমুসলিম প্রতিবেশী বা পরিচিত কাউকে দেওয়া যাবে কি?
১১. যদি কেউ কুরবানির নিয়ত করার পর আর্থিক সমস্যায় পড়ে, তাহলে তার জন্য কুরবানির হুকুম কী হবে?
১২. পরিবারের একজন কুরবানি দিলে কি পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে, নাকি সামর্থ্যবান প্রত্যেকের জন্য আলাদা কুরবানি জরুরি?
১৩. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়ার বিধান কী? এতে কি সওয়াব পৌঁছায়?
১৪. কুরবানির পশুর কোনো অংশ (যেমনঃ চর্বি, মাথা, চামড়া) বিক্রি করে ব্যক্তিগত উপকারে ব্যবহার করা যাবে কি?
১৫. যারা কুরবানি করবেন, তাদের জন্য জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনে চুল ও নখ না কাটার বিধান কী? পরিবারের সবাই [পুরুষ, মহিলা] কি চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে? যদি কোন কারণে চুল ও নখ কাটার প্রয়োজন পরে এতে কি সে কাটতে পারবে?
সম্মানিত হুজুর, আমার প্রশ্নগুলো দীর্ঘ হবার কারণে আমি দুঃখিত কিন্তু বিষয়গুলো আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শরিয়তের সহিহ বিধান জানার উদ্দেশ্যে আপনার নিকট প্রশ্নগুলো পেশ করলাম। আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দিকনির্দেশনা দিলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আপনার ইলমে বরকত দান করুন এবং আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ ও আমলের তাওফিক দান করুন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহের (ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, আল-হিদায়া, বেহেশতি জেওয়ার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া) আলোকে প্রদান করা হলো।
১. পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানির নিয়ত ও নাম নির্ধারণ
পরিবারের সদস্যরা যদি একসঙ্গে সাতজনে (অথবা ২-৭ জন) একটি পশুতে শরিক হন, তাহলে প্রত্যেকের আলাদা নিয়ত করতে হবে। কুরবানি প্রত্যেকের নিজ নিজ নামে হবে। শরিয়তে কুরবানির জন্য শুধু বাবা বা মায়ের নাম নির্ধারণ করে ফেললে অন্যদের অংশ সহিহ হবে না (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২২)। তবে বাবা-মা যদি নিজের ও ছোট সন্তানদের পক্ষ থেকে নেকির নিয়তে কুরবানি করেন, তাহলে তা জায়েজ। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্য আলাদা কুরবানি ওয়াজিব (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭২)।
২. কুরবানির মাংস তিন ভাগ করা কি বাধ্যতামূলক?
তিন ভাগ করা বাধ্যতামূলক নয়, বরং মুস্তাহাব। কুরবানির মাংস নিজেরা খাওয়া, আত্মীয়স্বজন ও গরিবদের দেওয়া উত্তম। তবে সম্পূর্ণ মাংস নিজেরা খেলেও গুনাহ নেই, কিন্তু তা মাকরুহ তানজিহি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩০০; বেহেশতি জেওয়ার, ৪/২২৫)।
৩. মাংস বণ্টনের সঠিক পদ্ধতি
মাংস ওজন করে সমানভাবে ভাগ করা জরুরি। শুধু আন্দাজ করে ভাগ করলে কারো সঙ্গে জুলুম হতে পারে। তবে যদি সবাই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে আন্দাজেও জায়েজ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৫; আল-হিদায়া, ৪/৩২১)।
৪. কলিজা, ভুঁড়ি, মাথা, পা ইত্যাদির বিধান
কলিজা, ভুঁড়ি, মাথা, পা ইত্যাদিও মাংসের মতো সমানভাবে ভাগ করতে হবে। নিজেদের খাওয়ার জন্য আলাদা রাখা জায়েজ নয়, কারণ এগুলো পশুর অংশ হিসেবে শরিকদের সম্পত্তি। তবে সবাই রাজি থাকলে আলাদা রাখা যেতে পারে (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৫০; বেহেশতি জেওয়ার, ২/২৩০)।
৫. বিদেশে থাকা ভাইয়ের কুরবানির মাংস বণ্টন
যদি ভাই বিদেশ থেকে কেবল টাকা পাঠায় (নিয়ত তার), তাহলে মাংস বণ্টনের দায়িত্ব ভাইয়ের ওপর। সে ইচ্ছা করলে তার অংশ থেকে তিন ভাগ করতে পারে অথবা সব নিজে খেতে পারে। বোনেরা নিজেদের অংশ থেকে তিন ভাগ করতে বাধ্য নয়, বরং তা মুস্তাহাব (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৯৮)।
৬. ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানি
পশু কেনার পর ত্রুটি দেখা দিলে:
- যদি ত্রুটিটি কুরবানির জন্য বাধাগ্রস্তকারী হয় (যেমন: অন্ধ, খোঁড়া, রোগা), তাহলে পশু পরিবর্তন করতে হবে।
- ত্রুটিটি ছোটখাটো হলে (যেমন: এক পা খোঁড়া, ছোট ক্ষত) কুরবানি সহিহ হবে, তবে মাকরুহ (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৮; আল-হিদায়া, ৪/৩১২)।
৭. জবাইয়ের সময় নিয়ত ও দোয়া
জবাইয়ের সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়া সুন্নত:
بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُ أَكْبَرُ
(উচ্চারণ: "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার")
নিয়ত অন্তরে করবেন: "আমি আল্লাহর জন্য এ কুরবানি করছি" (মা’আরিফুল কুরআন, ৬/৪৫০; বেহেশতি জেওয়ার, ২/২২০)।
৮. চামড়া বিক্রি ও এর মূল্য ব্যবহার
কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা জায়েজ নয়। বিক্রি করলে তার মূল্য সদকা করতে হবে (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪০; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৫০)। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ।
৯. কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস বা চামড়া দেওয়া
কসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে মাংস বা চামড়া দেওয়া জায়েজ নয়। বরং আলাদা অর্থ দিয়ে পারিশ্রমিক দিতে হবে। তবে হাদিয়া স্বরূপ (বিনা শর্তে) কিছু দেওয়া জায়েজ (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৯০; আল-হিদায়া, ৪/৩৩০)।
১০. অমুসলিমকে মাংস দেওয়া
কুরবানির মাংস অমুসলিম প্রতিবেশী বা পরিচিতকে দেওয়া জায়েজ। তবে যদি তাতে ফেতনার আশঙ্কা থাকে (যেমন: কঠোর শত্রুতা), তাহলে না দেওয়াই ভালো (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৬০; বেহেশতি জেওয়ার, ২/২৩৫)।
১১. আর্থিক সমস্যায় কুরবানির হুকুম
নিয়ত করার পর আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে:
- যদি কুরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে (যেমন: মান্নত বা নির্দিষ্ট ওয়াজিব কিংবা নেসাব পারিমাণ মালের মালিক হওয়ার কারণে হয়), তাহলে ঋণ নিয়ে হলেও আদায় করতে হবে।
- যদি নফল হিসেবে কুরবানির নিয়ত করা হয় , তাহলে অর্থ না থাকলে ছেড়ে দেওয়া যাবে (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৪)।
১২. পরিবারের একজন কুরবানি দিলে কি অন্যদের জন্য যথেষ্ট?
না, প্রত্যেক সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর জন্য আলাদা কুরবানি ওয়াজিব। পরিবারের একজন কুরবানি দিলে অন্যদের ওয়াজিব। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৯৫; বেহেশতি জেওয়ার, ২/২১৫)।
১৩. মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া জায়েজ এবং সওয়াব পৌঁছায়। যদি মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত করে থাকে, তাহলে তার সম্পদ থেকে কুরবানি করা ওয়াজিব। অন্যথায় জীবিতরা নফল হিসেবে দিতে পারে (মা’আরিফুল কুরআন, ৮/৪৮০; ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৪০)।
১৪. পশুর অংশ (চর্বি, মাথা, চামড়া) বিক্রি
পশুর কোনো অংশই বিক্রি করা জায়েজ নয়। বিক্রি করলে তার মূল্য সদকা করতে হবে (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৫০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪২)।
১৫. জিলহজের প্রথম ১০ দিনে চুল ও নখ না কাটা
- এ বিধান কুরবানি দাতার জন্য এবং যারা দিবে না তাদের জন্যও
- জিলহজের ১ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত চুল-নখ কাটা মাকরুহ (মুস্তাহাব হলো না কাটা)। তবে প্রয়োজনে (যেমন: রোগমুক্তি, বিবাহ, কাজের বাধা) কাটা যাবে (সহিহ মুসলিম ১/৩৭৪; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৭; ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৭০)।
উপসংহার:
প্রিয় ভাইয়া, কুরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। উপরোক্ত নিয়মগুলো মেনে চললে ইনশাআল্লাহ কুরবানি সহিহ ও কবুল হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কুরবানি করার তওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب