ঈদুল আযহার দিন কুরবানির গোশত ভক্ষণের পূর্বে কি পানিও পান করা যাবে না? যদি না যায় তাহলে এটা তো রোজার মত হয়ে যাবে? অথচ ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম! এখন করণীয় কি?
Food and Drink · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্ন: ঈদুল আজহার দিন কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম আহার করা সুন্নাহ। কিন্তু সকাল থেকে পানি পান করা যাবে কি? না যতক্ষণ গোশত রান্না না হয় ততক্ষণ পানিও খাওয়া যাবে না? যদি পানি না খাই, তাহলে তো রোজার মতো হয়ে যায়, অথচ ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম।
উত্তর:
আপনার উদ্বেগ সঠিক। ঈদুল আজহার দিন রোজা রাখা হারাম (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৯১)। তবে সুন্নাহ হলো প্রথম খাবার হিসেবে কোরবানির গোশত খাওয়া, আর সকালে কিছু না খেয়ে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তাই পানি পান করলে কোনো অসুবিধা নেই। আসলে এখানে সুন্নাহ হলো গোশত দিয়ে শুরু করা, কিন্তু তার আগে পানি বা অন্য কিছু খেলে সুন্নাহের বিপরীত হবে না - এটি সুন্নাহের বরখেলাফ নয়।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. সুন্নাহ কী:
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন প্রথমে খেজুর খেতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩) এবং ঈদুল আজহার দিন নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম আহার করতেন (মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ২৮৪৪৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৪২)। এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায় যে, কোরবানির গোশত দিয়ে শুরু করা মুস্তাহাব, তবে এটি এমন সুন্নাহ নয় যা পালন না করলে গোনাহ হবে। বরং তা একটি আদব বা পছন্দনীয় আমল।
২. পানি পান করা যাবে কি:
হ্যাঁ, পানি পান করা যাবে। কারণ:
- সুন্নাহর উদ্দেশ্য হলো প্রথম খাদ্য হিসেবে গোশত খাওয়া, কিন্তু তার আগে পানি পান করা সুন্নাহর বিরোধী নয়।
- হাদিসে সব ধরনের পানীয় বা খাদ্য নিষেধ করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, "গোশত দিয়ে আহার শুরু করো" - এর মানে এই নয় যে, তার আগে কিছুই মুখে দেওয়া যাবে না।
- ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "ঈদুল আজহার দিন প্রথম খাবার হিসেবে কোরবানির গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। তবে কেউ যদি অন্যান্য খাবার বা পানীয় দিয়ে শুরু করে, তবে তা মাকরুহ নয়।" (শরহু মুসলিম, ৭/১৭২)
- হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাব রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: "ঈদের দিন সকালে কিছু না খাওয়া শর্ত নয়; বরং কোরবানির গোশত দিয়ে শুরু করা উত্তম।" (রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৫)
৩. রোজার সাদৃশ্য তৈরি হবে কি:
আপনি ঠিকই বলেছেন, যদি সকাল থেকে সম্পূর্ণ কিছু না খাওয়া এবং পান না করাকে আপনি রোজা রাখার নিয়তে না করিয়ে নিছক গোশতের জন্য অপেক্ষা করেন, তাহলে তা রোজার মতো নয়। কারণ রোজা হলো নিয়ত সহকারে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা। আর এখানে আপনি রোজা রাখার ইচ্ছা করছেন না, বরং অপেক্ষা করছেন। তবুও যেহেতু অপেক্ষা করার সময় পানি না খেলে দেহের জন্য কষ্টকর হতে পারে, তাই পানি পান করা জায়েজ এবং উত্তম।
ইবনে আবেদিন (রহ.) লিখেছেন: "ঈদের দিন কোরবানির গোশত খাওয়ার আগে পানি পান করা মাকরুহ নয়, যদিও সুন্নাহ হলো গোশত দিয়ে শুরু করা।" (ফতোয়া শামি, ২/১৭৮)
৪. সংক্ষিপ্ত নিয়ম:
- আপনি সকালে উঠে কিছু না খেয়ে থাকতে পারেন, তবে পানি পান করতে পারেন।
- গোশত রান্না হতে দেরি হলে, পানি বা চা, দুধ, ফলমূল ইত্যাদি খেতে পারেন। সুন্নাহ ত্যাগ হয় না, বরং তা শুধু মুস্তাহাব।
- গুরুত্বপূর্ণ: ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। তাই যদি আপনি সকাল থেকে গোশত রান্না না হওয়া পর্যন্ত কিছু না খাওয়ার ইচ্ছা করেন, তবে তা রোজা নয়, কিন্তু অভ্যাসগতভাবে না খাওয়ায় দোষ নেই। তবে উত্তম হলো পানি পান করে নিজেকে হালকা রাখা।
উপসংহার:
ঈদুল আজহার দিন সকালে পানি পান করা সম্পূর্ণ জায়েজ। সুন্নাহ হলো কোরবানির গোশত দিয়ে প্রথম খাবার শুরু করা, কিন্তু তার আগে পানি পান করলে সুন্নাহ নষ্ট হয় না। রোজার সাদৃশ্যের আশঙ্কা থাকলে আপনি সহজেই পানি পান করতে পারেন। এটি বরং আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩, ১৯৯১
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৪২
- রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৫
- ফতোয়া শামি, ২/১৭৮
- শরহু মুসলিম লিন-নববী, ৭/১৭২