হারাম প্রেমের সম্পর্ক শেষ করে বৈধ বিবাহের উদ্দেশ্যে ছেলের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের সারমর্ম:
কোনো ছেলের সাথে অবৈধ (হারাম) প্রেম/সম্পর্কে জড়িত থাকার পর যদি মেয়ে তা জেনে-বুঝে সেই সম্পর্ক ও কথা-বার্তা বন্ধ করে দেয়, তবে ভবিষ্যতে বৈধ বিবাহের উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র ছেলেটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে কি?
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
আলহামদুলিল্লাহ, প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম, অবাধ কথা-বার্তা, মেলামেশা, একান্তে সাক্ষাৎ ইত্যাদি সবই হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।”
(সূরা আল-ইসরা: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হয় না, তবে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।”
(সুনানে তিরমিজি: ১১৭১; মুসনাদে আহমাদ: ১/১৮)
তাই এই ধরনের সম্পর্ক থেকে তাওবা করে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং ভবিষ্যতে বৈধ পন্থায় বিবাহ সম্পন্ন করা অত্যন্ত কর্তব্য। প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থায় মেয়েটি যদি হারাম সম্পর্ক ও কথা-বার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তবে বিবাহের উদ্দেশ্যে ছেলেটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা নীতিগতভাবে জায়েয হতে পারে, তবে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে:
১. যোগাযোগের উদ্দেশ্য হতে হবে শুধুমাত্র বৈধ বিবাহের প্রস্তাব ও পারিবারিক আলোচনা।
এতে কোনো প্রকার প্রেম, আবেগ বা ব্যক্তিগত কথা-বার্তার সুযোগ থাকবে না।
২. সরাসরি ছেলেটির সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকতে হবে।
মেয়ে নিজে ছেলেটির সাথে ফোন, মেসেজ বা সাক্ষাতে কোনো যোগাযোগ রাখবে না। যোগাযোগ হবে কেবল অভিভাবক/পরিবারের মাধ্যমে।
৩. মেয়ের অভিভাবক (ওয়ালি)-এর উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধান আবশ্যক।
ইসলামে বিবাহের প্রস্তাব ও আলোচনা ওয়ালির মাধ্যমে হওয়াই সুন্নত ও নিরাপদ পন্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা নারীদের তাদের অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ দিও না…” (মাফহুম)
এবং রাসূল ﷺ বলেন: “ওয়ালি ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।”
(সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫; সুনানে তিরমিজি: ১১০২)
৪. যোগাযোগে পর্দা ও শরিয়তের সীমা রক্ষা করতে হবে।
ফোনে বা সরাসরি কথা বলার সময়ও যদি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকে, তবে তা বর্জনীয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, নারীর জন্য পরপুরুষের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা-বার্তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব; বিশেষত ফিতনার আশঙ্কা থাকলে।
৫. ছেলেটির দ্বীনদারি, চরিত্র ও পরিবারের অবস্থা যাচাই করা।
রাসূল ﷺ বলেন:
“তোমরা দ্বীনদার ও চরিত্রবান পাত্রকে বিবাহ দাও; তা না হলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ফাসাদ ছড়িয়ে পড়বে।”
(সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪)
সারসংক্ষেপ:
হারাম সম্পর্ক ও কথা-বার্তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করার পর, শুধুমাত্র বৈধ বিবাহের প্রস্তাব ও পারিবারিক আলোচনার উদ্দেশ্যে ছেলেটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখা জায়েয, তবে তা হতে হবে অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে, পর্দা ও শরিয়তের সীমা রক্ষা করে এবং ছেলের সাথে সরাসরি যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে। আর যদি যোগাযোগের মাধ্যমে পুনরায় হারাম সম্পর্কের আশঙ্কা থাকে, তবে তা থেকেও বিরত থাকাই উত্তম ও তাকওয়ার পরিচায়ক।
ফিকহি রেফারেন্স:
- ইমাম ইবনে আবিদিন, «রাদ্দুল মুহতার», খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭ (বাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
- «ফাতাওয়া আলমগিরি», খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮ (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
- মোল্লা আলী কারী, «মিরকাতুল মাফাতিহ», খণ্ড ৫, পৃ. ২১৪
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, «মাআরিফুল কুরআন», সূরা ইসরা: ৩২-এর তাফসির
- মুফতি তাকি উসমানি, «ফাতাওয়া উসমানি», খণ্ড ২, পৃ. ৩০৫ (বিবাহ ও পর্দা সংক্রান্ত)
আল্লাহ ভালো জানেন।