অভাবী আত্মীয়কে যাকাত দেওয়া যাবে কি
Zakat and Charity · Hanafi
Question
সম্মানিত শায়খ, আমার একজন খালা শাশুড়ী আছেন যার এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। অভাব অনটনে দিন পার হয়। আত্নীয় স্বজনের কাছে সবসময় সাহায্য চান। আমাদের কাছে ও সবসময় সাহয্য চান। না দিলে ও বেজার হন। আত্নীয় স্বজন সবাই সাহায্য করে কয়েকবার উনার ছেলেকে বিদেশ পাঠানো হয়েছে, ব্যবসার জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে। কোন কিছুই ফলপ্রসূ হয় নি। ছেলে কোন স্থায়ী কাজ করেন না, বেশিরভাগই বেকার থাকেন। উনাদের নিজেদের বাড়ি আছে এবং টুকটাক কিছু ধানের জমি আছে। উনাকে কি যাকাত দেওয়া যাবে?
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার খালা শাশুড়ীকে যাকাত দেওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করে তাঁর মালিকানায় থাকা সম্পদের পরিমাণের উপর। শুধু “অভাব অনটন” বা “সাহায্য চাওয়া” দেখে যাকাত দেওয়া যাবে না; বরং দেখতে হবে তিনি সাহিবে নিসাব (নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক) কি না। যদি তাঁর মালিকানায় নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে এবং তাঁর প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর হাতে কিছু না থাকে, তাহলে তিনি যাকাতের হকদার হতে পারেন। আর যদি তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তিনি যাকাত গ্রহণের হকদার নন।
বিস্তারিত:
১. যাকাতের হকদার কারা?
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা হয়, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”
(সূরা তাওবা: ৬০)
২. নিসাবের হিসাব:
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, কারও কাছে সোনা ৭.৫ ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম), অথবা রূপা ৫২.৫ ভরি (৬১২.৩৬ গ্রাম), অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদি থাকে—এবং তা তার মৌলিক প্রয়োজন (বাসস্থান, আসবাব, যানবাহন, পোশাক, ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি) থেকে অতিরিক্ত হয়—তাহলে তিনি সাহিবে নিসাব। এমন ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করতে পারবেন না; বরং তাঁর উপর যাকাত ফরজ হতে পারে।
৩. বাড়ি ও জমির বিষয়:
- নিজের বসবাসের বাড়ি যাকাতের হিসাবে ধরা হয় না; এটি মৌলিক প্রয়োজন।
- টুকটাক ধানের জমি যদি শুধু নিজের খাওয়ার জন্য হয়, তবে তা-ও মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যদি জমি থেকে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে আয় হয় এবং তা নিসাব পরিমাণে পৌঁছে, তবে তা হিসাবে আসবে।
- যদি জমি বা বাড়ি অতিরিক্ত হয় এবং তা থেকে আয় হয়, তবে সেই আয় ও সম্পদ নিসাবের হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।
৪. ছেলের বেকারত্ব ও বিদেশ পাঠানোর বিষয়:
ছেলে স্থায়ী কাজ করে না বা বিদেশে গিয়ে ব্যবসায় লাভ হয়নি—এসব কারণে মা যাকাতের হকদার হয়ে যান না। যাকাত নির্ধারিত হয় সম্পদের মালিকানা ও নিসাব দ্বারা, সন্তানের কর্মক্ষমতা বা ব্যবসার লাভ-ক্ষতি দ্বারা নয়। তবে ছেলে যদি প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও কর্মক্ষম হয় এবং তার নিজের সম্পদ না থাকে, তবে তাকে যাকাত দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু মায়ের যাকাতের হকদার হওয়া আলাদা বিষয়।
৫. সাহায্য চাওয়া ও না দিলে বেজার হওয়া:
আত্মীয়দের কাছে সাহায্য চাওয়া বা না পেলে অসন্তুষ্ট হওয়া—এসব যাকাতের হুকুম নির্ধারণে প্রভাব ফেলে না। যাকাত হলো ইবাদত; তা শুধু আল্লাহর নির্ধারিত খাতেই দিতে হবে। কাউকে খুশি করার জন্য বা সম্পর্ক রক্ষার জন্য যাকাতের অপব্যবহার করা যাবে না।
সতর্কতা:
আপনি যদি সরাসরি জানতে না পারেন যে তাঁর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে কি নেই, তাহলে তাঁর অবস্থা যাচাই করুন। যদি তিনি নিজে বলেন বা বিশ্বস্তভাবে জানা যায় যে তাঁর কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তাহলে তাঁকে যাকাত দেওয়া যাবে। আর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে যাকাত দেওয়া যাবে না; বরং সাধারণ দান-সদকা করা যাবে, যা যাকাতের বাইরে।
উপসংহার:
আপনার খালা শাশুড়ীকে যাকাত দেওয়া যাবে যদি তিনি নিসাবের কম সম্পদের মালিক হন এবং তাঁর প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর হাতে কিছু না থাকে। আর যদি তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তাঁকে যাকাত দেওয়া যাবে না। ছেলের বেকারত্ব বা ব্যবসায় ক্ষতি এ হুকুম পরিবর্তন করে না।
তথ্যসূত্র:
- সূরা তাওবা: ৬০
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুয যাকাত: ৩/২৬৯-২৭০
- ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুয যাকাত: ১/১৮৬
- আল-হিদায়া, কিতাবুয যাকাত: ১/১০৫
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৪৫-৩৪৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/১৩৫-১৩৭
- বেহেশতী জেওর, যাকাত অধ্যায়
وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ