"শয়তানের কুমন্ত্রণায় আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে বাজে চিন্তা আসলে ঈমান নষ্ট হয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
২) ভালো বলছি নাকি মানুষ ও বলছি মানে তারা দুইজন এ ভালো / নাকি ভালো মানুষ ও বলছি,
এটা যদি মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি তাহলে কোনো সমস্যা হবে?
৩) মানুষ তো সবাইকে বলা যায় না। এই জন্যই আমার টেনশন হচ্ছে। যদি আমি মুখে উচ্চারণ করে মানুষ ও বলে থাকি তাহলে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে" মানুষ বলা "এটা তো আমি বিশ্বাস করি না। তাই যদি ভুলে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি। বলে থাকি। তাহলে আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৫) এখানে দুইজন কেই মহান বললাম এই জন্য ঈমানে কোনো সমস্যা হবে? আল্লাহর সাথে তো কারোর তুলনা হয় না।
আমার মনে অন্য কোনো কিছু কিছু না। শয়তান এর কুমন্ত্রনা দুর করতে আমার উদেশ্য ছিল সব ভালো বলা।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় প্রশ্নকর্তা, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ। শয়তানের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) থেকে উদ্ভূত এই ধরনের চিন্তা অনেকেরই হয়ে থাকে। ইসলামে এ ধরনের কুমন্ত্রণার দ্বারা ঈমান নষ্ট হয় না, বরং এটি ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হলো:
১) বাজে কথা চলে আসা এবং "আল্লাহ মহান", "নবী মহান" বলা:
আপনি যখন শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে আল্লাহ ও নবী (সা.)-কে নিয়ে বাজে চিন্তা করেন, তখন আপনি "আল্লাহ মহান" বা "নবী মহান" বলে তা দূর করার চেষ্টা করেছেন—এটি আপনার ঈমানের দৃঢ়তারই প্রমাণ। ইসলামি শরিয়তে, মনে খারাপ চিন্তা আসলে বা মুখে ভুলে কোনো কথা বলে ফেললে (যা অন্তরে বিশ্বাস করেন না) ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)
আপনি "তারা দুইজনই ভালো" বলে ফেলেছেন—এটি যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করার নিয়তে বলে থাকেন, তবে এটি ঈমানের কোনো ক্ষতি করবে না। আপনি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে তাওবা করেছেন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না।
২) "তারা দুইজনই ভালো" বা "ভালো মানুষ" বলা:
আপনি যদি মুখে উচ্চারণ করে "তারা দুইজনই ভালো" বা "ভালো মানুষ" বলে ফেলেন, তবে এর দ্বারা ঈমান নষ্ট হয় না। কারণ, "ভালো" বা "ভালো মানুষ" বলা কুফর বা শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকো না, যারা তোমার উপকার করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না।" (সূরা ইউনুস: ১০৬)
তবে, আল্লাহ ও নবী (সা.)-কে একই পর্যায়ে ফেলে "দুইজনই ভালো" বলা যদি অন্তরে বিশ্বাস করে বলা হয়, তবে তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু আপনি তা বিশ্বাস করেন না, বরং শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করার জন্য বলেছেন। তাই আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না।
৩) "মানুষ" বলা:
আপনি যদি মুখে উচ্চারণ করে "মানুষ" বলে ফেলেন, তবে ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"তিনি (আল্লাহ) কোনো মানুষের মতো নন।" (সূরা শূরা: ১১)
আপনি অন্তরে বিশ্বাস করেন যে আল্লাহ মানুষ নন, তাই মুখে ভুলে "মানুষ" বলে ফেললে ঈমান নষ্ট হবে না। তবে, আল্লাহর শানে "মানুষ" বলা কুফরি বা শিরকি কথা, যা মুখে বলা জায়েজ নয়। কিন্তু ভুলে বা ওয়াসওয়াসার কারণে বলে ফেললে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ বলা" বিশ্বাস না করা:
আপনি যদি আল্লাহকে "মানুষ" বলা বিশ্বাস না করেন, শুধু ভুলে মুখে বলে ফেলেন, তবে আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও আমল। আপনি অন্তরে আল্লাহকে মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করেন না, তাই মুখে ভুলে বলা আপনার ঈমান নষ্ট করবে না। তবে, এ ধরনের কথা মুখে বলা থেকে সতর্ক থাকুন এবং তাওবা করুন।
৫) "দুইজনকেই মহান" বলা:
আপনি "আল্লাহ মহান" এবং "নবী মহান" বলে দুজনকেই মহান বলেছেন। এখানে "মহান" শব্দটি যদি আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে তা তাঁর মহত্ত্বের জন্য প্রযোজ্য। আর নবী (সা.)-কে "মহান" বলা যদি তাঁর সম্মান ও মর্যাদার জন্য হয়, তবে তা জায়েজ। কিন্তু যদি "মহান" শব্দটি এমনভাবে বলা হয় যা আল্লাহর সাথে তুলনা করে, তবে তা শিরক হবে।
আপনি বলেছেন, "আল্লাহর সাথে তো কারোর তুলনা হয় না"—এটি আপনার ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ। আপনি যদি অন্তরে বিশ্বাস করেন যে আল্লাহর সাথে কারোর তুলনা হয় না, তবে মুখে "দুইজনকেই মহান" বলে ফেললে ঈমান নষ্ট হবে না। কারণ, আপনি আল্লাহর সাথে তুলনা করেননি, বরং নবী (সা.)-কে তাঁর মর্যাদার কারণে "মহান" বলেছেন।
সারসংক্ষেপ:
- শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করার জন্য আপনি যা করেছেন, তা ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।
- মুখে ভুলে বা ওয়াসওয়াসার কারণে কোনো কথা বলে ফেললে, যা অন্তরে বিশ্বাস করেন না, তাতে ঈমান নষ্ট হয় না।
- আপনি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে তাওবা করেছেন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
- আল্লাহর সাথে কাউকে তুলনা করা বা শিরক করা থেকে সতর্ক থাকুন, কিন্তু ওয়াসওয়াসার কারণে ভুলে বলে ফেললে তাওবা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন এবং ঈমানের উপর দৃঢ় রাখুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।