আমলের অহংকার বা উজব কী? মনে মনে নিজের আমলকে বড় মনে করা ও অন্যকে তুচ্ছ করা কি অহংকার?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
আমলের অহংকার (العُجب) সম্পর্কে ফিকহি ও আকিদাগত বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—মনে মনে নিজের আমলকে বড় মনে করা, অন্যকে তুচ্ছ করা, কিন্তু কারও সামনে তা প্রকাশ না করা—এটি কি অহংকার (কিবর) হিসেবে গণ্য হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, এটি ‘উজব’ (العُجب — আত্মমুগ্ধতা/আত্মশ্লাঘা), যা কিবর (অহংকার)-এর অন্তর্ভুক্ত বা তার সমগোত্রীয়। এটি প্রকাশ করা বা না করা—উভয় অবস্থাতেই তা হারাম ও অন্তরের মারাত্মক রোগ। তবে প্রকাশ করা হলে গুনাহ আরও বাড়ে, কারণ তাতে অন্যকে তুচ্ছ করার ঘোষণা ও মুসলিমকে অপমান করা যুক্ত হয়।
১. ‘উজব’ ও ‘কিবর’-এর পার্থক্য (হানাফি ফিকহের পরিভাষায়)
- উজব (العُجب): নিজের আমল বা গুণকে বড় মনে করে নিজেই বিস্মিত/মুগ্ধ হওয়া; এতে অপরকে তুচ্ছ করার শর্ত নেই।
- কিবর (الكِبْر): নিজেকে বড় মনে করা এবং সত্যকে অস্বীকার করা বা মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা।
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ এবং মোল্লা আলী কারী (রহ.) মিরকাতুল মাফাতিহ-এ উল্লেখ করেছেন যে, উজব ও কিবর পরস্পর ঘনিষ্ঠ; উজব থেকে কিবর জন্ম নেয়। তাই প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা—নিজের আমলকে বড় মনে করা ও অন্যকে তুচ্ছ করা—উভয় দিক থেকেই নিন্দনীয়।
২. কুরআন থেকে দলিল
সূরা আন-নিসা (৪:৪৯):
«أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يُزَكُّونَ أَنفُسَهُم ۚ بَلِ اللَّهُ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ وَلَا يُظْلَمُونَ فَتِيلًا» “তুমি কি তাদের দেখনি, যারা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করে? বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন...”
সূরা আন-নাজম (৫৩:৩২):
«فَلَا تُزَكُّوا أَنفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ» “তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না; তিনিই ভালো জানেন কে মুত্তাকি।”
সূরা লুকমান (৩১:১৮):
«إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ» “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর মা‘আরিফুল কুরআন-এ সূরা আন-নাজমের আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—নিজের আমলকে বড় মনে করা আত্মপ্রশংসার শামিল, যা ইখলাস নষ্ট করে দেয়।
৩. হাদিস থেকে দলিল
সহিহ মুসলিম (হাদিস ২৭৪৯):
«ثَلَاثٌ مُهْلِكَاتٌ: شُحٌّ مُطَاعٌ، وَهَوًى مُتَّبَعٌ، وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ» “তিনটি বস্তু ধ্বংসকারী: কৃপণতা যার আনুগত্য করা হয়, প্রবৃত্তির অনুসরণ, এবং মানুষ নিজের প্রতি মুগ্ধ (উজব) হওয়া।”
সুনানে আবু দাউদ (হাদিস ৪০৯১) ও তিরমিজি (হাদিস ১৯৯৯)-এ:
«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ» “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
মুসলিম (হাদিস ২৬২০)-এ কিবরের সংজ্ঞা:
«الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ» “অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।”
ইমাম তহাবি (রহ.) তাঁর শারহু মা‘আনিল আছার-এ এবং ইমাম বায়হাকি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন—‘গামতুন্নাস’ (মানুষকে তুচ্ছ করা) শুধু প্রকাশ্য আচরণেই নয়, অন্তরের অবজ্ঞাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৪. হানাফি কিতাবের বক্তব্য
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার (১/৪৯৯, দারুল ফিকর সংস্করণ):
“العُجبُ والكِبْرُ مِنَ المُهْلِكَاتِ، والعُجبُ يَتَوَلَّدُ مِنْهُ الكِبْرُ غَالِبًا، فَمَنْ أُعْجِبَ بِعَمَلِهِ اسْتَحْقَرَ غَيْرَهُ” “উজব ও কিবর ধ্বংসকারী রোগ; উজব থেকে সাধারণত কিবর জন্ম নেয়। যে নিজের আমলে মুগ্ধ হয়, সে অপরকে তুচ্ছ করে।”
ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) — আল-হিদায়া (কিতাবুল আদব): ইবাদতের পরও নিজের আমলকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে দেখা কর্তব্য; নিজের শক্তি-সামর্থ্যের ফল মনে করা উজব, যা ইবাদতের সওয়াব বিনষ্ট করে।
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) — বেহেশতি জেওর (তৃতীয় খণ্ড, “কিবর ও উজব” অধ্যায়): তিনি স্পষ্ট লিখেছেন—
“নিজের আমলকে বড় মনে করা এবং অপরকে হেয় জ্ঞান করা—এ দুটোই অন্তরের রোগ। কারও সামনে প্রকাশ না করলেও তা গুনাহ; প্রকাশ করলে গুনাহ আরও বাড়ে, কারণ তাতে মুসলিমকে অপমান করা হয়।”
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা.বা.) — ইসলাহি খুতুবাত ও ফাতাওয়া উসমানি: ইখলাস অধ্যায়ে তিনি বলেন—আমলকে ‘নিজের অর্জন’ ভাবা শিরক-সদৃশ উজব; প্রকৃত মুমিন আমলকে আল্লাহর তাওফিক ভাবে এবং নিজের ত্রুটি দেখে।
ফাতাওয়া আলমগিরি (কিতাবুল কারাহিয়াত): উজব ও কিবরকে ‘মুহলিকাত’ (ধ্বংসকারী) শ্রেণিতে গণ্য করা হয়েছে এবং এর চিকিৎসা হিসেবে তাওবা, ইস্তিগফার ও নিজের আমলকে তুচ্ছ ভাবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. প্রশ্নের নির্দিষ্ট জবাব
| অবস্থা | হুকুম | |---|---| | মনে মনে নিজের আমলকে বড় মনে করা | উজব — হারাম | | সাথে অপরকে তুচ্ছ করা (অন্তরে হলেও) | কিবর — হারাম | | কারও সামনে প্রকাশ না করা | গুনাহ কম হয় না, বরং রিয়া থেকে বাঁচার একটি দিক মাত্র; অন্তরের রোগ তো থেকেই যায় | | প্রকাশ করে বলা/দেখানো | আরও কঠিন গুনাহ — মুসলিমকে অপমান ও রিয়া উভয়ই যুক্ত হয় |
সারকথা: প্রকাশ না করলেও এটি অহংকার/উজব হিসেবে গণ্য হবে এবং তা থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। প্রকাশ করলে গুনাহ আরও বাড়বে।
৬. চিকিৎসা (হানাফি উলামায়ে কেরামের নির্দেশনা)
- প্রতিটি আমলকে আল্লাহর তাওফিক ভাবা — «وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ» (হুদ: ৮৮)।
- নিজের ত্রুটি ও গুনাহের কথা স্মরণ করা।
- অপর মুসলিমের ভালো আমল দেখে দুআ করা ও তার জন্য কল্যাণ কামনা করা।
- নিয়মিত ইস্তিগফার ও «اللهم لا تؤاخذني بما يقولون» পাঠ করা।
- থানভি (রহ.)-এর পরামর্শ: নিজের আমলকে ‘একটি ঋণ’ ভাবা, যা আল্লাহর অনুগ্রহে পরিশোধযোগ্য।
উপসংহার
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা—নিজের আমলকে বড় মনে করা ও অন্যকে তুচ্ছ করা—প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে, উভয় অবস্থাতেই উজব ও কিবরের অন্তর্ভুক্ত এবং হারাম। গোপনে রাখা মানে গুনাহ থেকে মুক্তি নয়; বরং অন্তরকে এ রোগ থেকে পবিত্র করা ও তাওবা করা আবশ্যক।
আল্লাহ ভালো জানেন।