সূরা মুলক নিয়মিত পড়ে কবরের আজাব থেকে মুক্তির আশা রাখা কি অহংকার?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: নিয়মিত সূরা মুলক পড়ি বলে মনে মনে কবরের আজাব থেকে মুক্তির আশা রাখা কি অহংকার?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এটি অহংকার নয়। বরং এটি আল্লাহর রহমত ও ওয়াদার উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং হাদীসে বর্ণিত ফযীলতের প্রতি বিশ্বাস। তবে এর সাথে দুটি বিষয় জরুরি:
- আমলকে নিজের কৃতিত্ব বা গর্বের কারণ মনে করা যাবে না — সব তাওফিক আল্লাহরই দান।
- আশা (রাজা) থাকবে, কিন্তু আমলে অবহেলা বা আত্মতুষ্টি (উজব) আসা যাবে না — বরং ভয় (খাওফ) ও আশার মাঝামাঝি অবস্থান রাখতে হবে।
কুরআন থেকে দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা যুমার: ৫৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَّقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَىٰ رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ
"যারা যা দান করে তা ভীত হৃদয়ে দান করে, কারণ তারা তাদের রবের কাছে ফিরে যাবে।" (সূরা মুমিনুন: ৬০)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি নবী ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন—এরা কি মদপানকারী বা চুরি করা লোক? তিনি বললেন: "না, বরং এরা রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, দান-সদকা করে, কিন্তু (আমল কবুল হবে কি না) ভয় করে।" (তিরমিজি: ৩১৭৫)
শিক্ষা: আমল করা ও আল্লাহর রহমতের আশা রাখা—দুটোই ইসলামে কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু আমল নিয়ে অহংকার বা আত্মতুষ্টি নিন্দনীয়।
হাদীস থেকে দলিল
সূরা মুলকের ফযীলত
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: إِنَّ سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ
"নিশ্চয়ই কুরআনের একটি সূরা, যাতে ত্রিশটি আয়াত আছে, সে এক ব্যক্তির জন্য শাফায়াত করবে, এমনকি তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো 'তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক' (সূরা মুলক)।" (তিরমিজি: ২৮৯১, আবু দাউদ: ১৪০০ — হাসান)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ قَالَ: مَنْ قَرَأَ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ كُلَّ لَيْلَةٍ مَنَعَهُ اللَّهُ بِهَا مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
"যে ব্যক্তি প্রতি রাতে 'তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক' পড়বে, আল্লাহ তাকে এর বদৌলতে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেন।" (নাসাঈ, আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ — হাসান)
এসব হাদীসই প্রমাণ করে—সূরা মুলক পড়ার মাধ্যমে কবরের আজাব থেকে মুক্তির আশা রাখা সুন্নত-সম্মত ও কুরআন-হাদীসের ওয়াদার উপর ঈমানের অংশ।
অহংকার ও আত্মতুষ্টির নিষেধাজ্ঞা
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
"যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (মুসলিম: ৯১)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: لَنْ يُدْخِلَ أَحَدًا عَمَلُهُ الْجَنَّةَ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَنْتَ؟ قَالَ: لَا، وَلَا أَنَا، إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَةٍ
"কোনো ব্যক্তির আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। সাহাবারা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেন: না, আমাকেও না—যদি না আল্লাহ তার রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেন।" (বুখারি: ৫৬৭৩, মুসলিম: ২৮১৬)
শিক্ষা: আমল করব, কিন্তু জান্নাত বা মুক্তির অধিকার নিজের আমলের কারণে মনে করা যাবে না—এটা আল্লাহর রহমত। এ বিশ্বাস রাখলে অহংকার আসবে না।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ
১. রাজা ও খাওফের ভারসাম্য (আশা ও ভয়)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন, সালাফদের নীতি ছিল—খাওফ (ভয়) ও রাজা (আশা) উভয়ই সমান রাখা। শুধু আশায় আত্মতুষ্ট হওয়া বা শুধু ভয়ে নিরাশ হওয়া—দুটোই নিন্দনীয়। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৪ প্রসঙ্গ)
ইমাম গাযালি (রহ.)-এর বরাতে ইবনে আবিদিন বলেন, 'উজব' (আত্মতুষ্টি) হলো শয়তানের ফাঁদ—যে ব্যক্তি নিজের আমলে গর্ব করে, সে ধীরে ধীরে আমল ছেড়ে দেয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সাওম অধ্যায়)
২. আমল ও তাওফিক আল্লাহর দান
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উদ্ধৃত:
الطاعة من الله والثواب من الله، والعبد لا يملك من نفسه شيئا
"আনুগত্য আল্লাহর পক্ষ থেকে, প্রতিদানও আল্লাহর পক্ষ থেকে; বান্দা নিজের পক্ষ থেকে কোনো কিছুই বাস্তবায়ন বা কার্যকর করে না।"
অর্থাৎ, সূরা মুলক পড়ার তাওফিকও আল্লাহর দান। এটা মনে রাখলে অহংকারের সুযোগই থাকে না।
৩. ফযীলতের হাদীসের উপর আমল ও বিশ্বাস
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা মুলকের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, হাদীসে বর্ণিত ফযীলতের উপর বিশ্বাস রাখা এবং আমল করা—এটাই কাম্য; কিন্তু ফযীলতকে নিজের কৃতিত্ব মনে করা বা অন্যদের তুচ্ছ করা নিষিদ্ধ।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে (১/৩৯৮ প্রসঙ্গ) উল্লেখ করেন, নফল ইবাদতের ফযীলতের হাদীসে বিশ্বাস রাখা ঈমানের অংশ, তবে ইবাদতকে গর্বের বিষয় বানানো বা অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা রিয়া ও কিবরের অন্তর্ভুক্ত।
৪. রিয়া ও কিবর থেকে বাঁচার উপায়
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বহিশতী জেওর-এ লেখেন:
"আমল করার পর নিজের আমলকে বড় মনে করা এবং অন্যদের তুচ্ছ করা—এটা 'উজব'। এর প্রতিকার হলো—আমলকে আল্লাহর দান মনে করা এবং নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি স্মরণ করা।"
তিনি আরও বলেন, "আমল করলে শুকরিয়া আদায় করবে, গুনাহ হলে তাওবা করবে—এটাই বান্দার কর্তব্য।" (বেহেশতী জেওর, তৃতীয় খণ্ড, আত্মশুদ্ধি অধ্যায়)
ব্যবহারিক নির্দেশনা
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | সূরা মুলক পড়া | নিয়মিত পড়ুন, এটি সুন্নত-সম্মত ও ফযীলতপূর্ণ | | মুক্তির আশা | আল্লাহর ওয়াদার উপর ভরসা রাখুন—এটি তাওয়াক্কুল | | অহংকার | নিজের আমলকে আল্লাহর দান মনে করুন, গর্ব করবেন না | | অন্যদের দেখা | নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাববেন না | | আত্মতুষ্টি | "আমি তো পড়ছি, তাই মুক্তি পাবই"—এমন নিশ্চিত ধারণা রাখবেন না; বরং ভয়ে-আশায় থাকুন | | ত্রুটি | আমলে ঘাটতি হলে তাওবা ও ইস্তিগফার করুন |
উপসংহার
সূরা মুলক নিয়মিত পড়া এবং এর বদৌলতে কবরের আজাব থেকে মুক্তির আশা রাখা অহংকার নয়—বরং এটি হাদীসের ওয়াদার উপর ঈমান ও আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা। অহংকার তখনই হবে যখন আপনি—
- নিজের আমলকে নিজের কৃতিত্ব ভাববেন,
- অন্যদের তুচ্ছ করবেন,
- "আমি পড়ছি, তাই মুক্তি পাবই"—এমন আত্মতুষ্টিতে ভুগবেন।
তাই আমল চালিয়ে যান, পাশাপাশি খাওফ ও রাজার ভারসাম্য রেখে আল্লাহর রহমতের আশা করুন এবং নিজের ত্রুটি স্বীকার করে তাওবা করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইখলাসের সাথে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।