নাপাক অবস্থায় খাবার রান্না করা এবং খাওয়া।
Family Life · Hanafi
Question
জনাব আমার প্রশ্ন টা হচ্ছে, আমার স্ত্রী ০৭ মাসের প্রেগনেন্ট। গোসল ফরজ হলে গোসল করতে দেরি করে, যেমন একবারে যোহর নামাজের আগে করে। এর আগে বাসার সব কাজ করে, রান্না - খাওয়া। তবে আমি দিন দিন দেখতেছি শুকিয়ে যাচ্ছি। নাপাক অবস্থায় রান্না করা বা ওসব পরিবেশন করলে কি স্বাস্থ্যের উপরে কোনো প্রভাব পড়ে? তাকে সকাল বেলা গোসল করতে বললে বলে সব কাজ শেষ করে একবারে করে নিবে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, নাপাক অবস্থায় (অর্থাৎ জানাবত বা হায়েজ-নিফাসের অপবিত্রতায়) রান্না করা, খাবার পরিবেশন করা বা ঘরের কাজ করার কারণে স্বাস্থ্যের উপর কোনো ক্ষতি হয় না — এটি শরীয়তের দৃষ্টিতেও নিষিদ্ধ নয় এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানেও এর কোনো ভিত্তি নেই। আপনার স্ত্রীর "শুকিয়ে যাওয়া"র অনুভূতির কারণ ভিন্ন — সম্ভবত গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন, পানি ও পুষ্টির ঘাটতি, রক্তশূন্যতা (anemia) বা ক্লান্তি। এজন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
বিস্তারিত আলোচনা
১. নাপাক অবস্থায় রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ করা জায়েয
জানাবত বা হায়েজ-নিফাসের অবস্থায় নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো নিষিদ্ধ নয়:
- রান্না করা, খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা
- ঘরের সাধারণ কাজ করা
- খাওয়া-দাওয়া করা
- ঘুমানো (তবে উত্তম হলো অজু করে ঘুমানো)
- সন্তানকে দুধ পান করানো
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ জানাবত অবস্থায় থাকলেও খাবার খেতেন, ঘুমাতেন — তবে অজু করে নিতেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন:
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا كَانَ جُنُبًا فَأَرَادَ أَنْ يَأْكُلَ أَوْ يَنَامَ تَوَضَّأَ وُضُوءَهُ لِلصَّلَاةِ
"নবী ﷺ জানাবত অবস্থায় থাকলে যখন খেতে বা ঘুমাতে ইচ্ছা করতেন, নামাজের অজুর মতো অজু করে নিতেন।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩০৫; সহীহ বুখারী, হাদিস ২৮৬
এতে প্রমাণ হয় যে, জানাবত অবস্থা খাবার-পানীয় বা ঘরের কাজকে নিষিদ্ধ করে না; বরং অজু করে নেওয়া সুন্নত ও উত্তম।
হায়েজ সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ তাঁকে হায়েজ অবস্থায় বলতেন: "তোমার কাজ করে নাও" — অর্থাৎ হায়েজ অবস্থায়ও তিনি স্বাভাবিক কাজ করতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৯৩-২৯৪)
২. ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে স্পষ্ট আছে — জানাবত বা হায়েজ-নিফাসের অপবিত্রতা শুধু নামাজ, তাওয়াফ, কুরআন স্পর্শ/তিলাওয়াত, মসজিদে অবস্থান ইত্যাদি ইবাদতের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। রান্না, খাওয়া, ঘরের কাজ ইত্যাদি দুনিয়াবি কাজে কোনো বাধা নেই।
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — ১/১৬৮-১৭০ (গোসল ও জানাবত অধ্যায়): জানাবত অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ইত্যাদি জায়েয; অজু করে নেওয়া মুস্তাহাব।
- ফাতাওয়া আলমগিরি — কিতাবুত তাহারাত অধ্যায়: অপবিত্র ব্যক্তির জন্য কেবল ইবাদত-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা, দুনিয়াবি কাজে নিষেধ নেই।
- বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী) — তাহারাত অধ্যায়: জানাবতের হুকুম শুধু ইবাদতের সাথে সম্পৃক্ত।
- ফাতাওয়া উসমানি — তাহারাত অধ্যায়: নাপাক অবস্থায় রান্না-বান্না ও ঘরের কাজ জায়েয।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.) — তাহারাত অধ্যায়: অপবিত্র অবস্থায় খাবার তৈরি বা পরিবেশনে কোনো নিষেধ নেই।
- বেহেশতী জেওর — তাহারাত অধ্যায়: নাপাক অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া, রান্না ইত্যাদি জায়েয; অজু করে নেওয়া উত্তম।
৩. স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব — শরীয়ত ও বিজ্ঞান উভয় দৃষ্টিতে
- শরীয়তের দৃষ্টিতে: নাপাক অবস্থা একটি আনুষ্ঠানিক/ইবাদত-সংক্রান্ত অপবিত্রতা (হুকমি নাপাকি), যা শরীরে কোনো দৃশ্যমান ময়লা বা জীবাণু সৃষ্টি করে না। তাই এর সাথে রোগ-ব্যাধি বা স্বাস্থ্যহানির কোনো সম্পর্ক নেই।
- চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে: জানাবত বা হায়েজ-নিফাসের অপবিত্রতার সাথে রান্না বা খাবারের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর কোনো প্রমাণ নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
- আপনার স্ত্রীর "শুকিয়ে যাওয়া"র কারণ: ৭ মাসের গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়ে, পানির চাহিদা বাড়ে, অনেকের রক্তশূন্যতা (anemia) হয়, ঘন ঘন ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দেয়। এগুলো গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া — নাপাক অবস্থার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অবশ্যই একজন গাইনোকোলজিস্ট/ডাক্তারের পরামর্শ নিন, রক্ত পরীক্ষা (CBC) করান।
৪. আপনার স্ত্রীকে গোসলের ব্যাপারে পরামর্শ
- শরীয়তের দৃষ্টিতে ফরজ গোসল যত দেরি হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নামাজ-রোজা ইত্যাদি ইবাদত আদায় করা যাবে না — এটাই মূল ক্ষতি। তবে রান্না-বান্না বা ঘরের কাজে কোনো বাধা নেই।
- গর্ভাবস্থায় বারবার গোসল করা কষ্টকর হতে পারে — এটা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তবে নামাজের সময় হয়ে গেলে গোসল করে নামাজ আদায় করা ফরজ। এ বিষয়ে তাকে ধীরে সুস্থভাবে বুঝিয়ে বলুন, কঠোরতা নয়।
- গোসল দেরি হলে অন্তত অজু করে নেওয়া উত্তম — এতে ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি থাকে এবং সুন্নতের অনুসরণ হয়।
- গর্ভাবস্থায় গোসলের সময় পিছলে পড়া বা কষ্টের ঝুঁকি থাকে, তাই নিরাপদ ব্যবস্থা (সিট, গরম পানি, সহায়তা) রাখুন।
৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
নাপাক অবস্থায় রান্না-বান্নাকে "অশুভ" বা "স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর" মনে করা — এটি কুসংস্কার এবং শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরনের বিশ্বাস মনে পোষণ করা ঠিক নয়। বরং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।
উপসংহার: নাপাক অবস্থায় রান্না, খাবার পরিবেশন ও ঘরের কাজ করা সম্পূর্ণ জায়েয, স্বাস্থ্যের উপর এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। আপনার স্ত্রীর শারীরিক দুর্বলতার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং তাকে গোসল ও নামাজের ব্যাপারে স্নেহের সাথে বুঝিয়ে বলুন।
والله أعلم بالصواب