বিবাহের প্রস্তাবের আগে দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করা কি ইসলামে জায়েয? বিদেশে বসবাসকারী প্রার্থীর সালাত, হালাল আয় ও আকীদা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্ন করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমরা একটি ছেলের বায়োডাটা পছন্দ করি। ছেলেও মেয়ের বায়োডাটা পছন্দ করে এবং পরবর্তীতে কীভাবে আগানো যায় তা জানতে চায়। ( কথাবার্তা হচ্ছিল ইমেইল এ,ছেলে ডেনমার্ক থাকে)। মেয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে,পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে আমাদের কিছু জানার ছিল, প্রশ্নগুলো ছিল এরকম-
১/ অমুসলিম দেশে কীভাবে নিয়মিত জামাআতে সালাত আদায় করেন? নাকি একাকী সালাত আদায় করতে হয়?
২/ অমুসলিম দেশে নিত্য চলাফেরা,কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবখানে কীভাবে ঈমান ও দ্বীন নিয়ে বেঁচে আছেন?
৩/আপনি বায়োডাটাতে বলেছেন যে চিরস্থায়ীভাবে সেখানে থাকার ইচ্ছে নেই।অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করাই আপনার আসল লক্ষ্য। এই কথার সত্যতা কতটুকু? যদি অধিক প্রাচুর্য অর্জনের আশা থাকে, তবে অমুসলিম দেশে স্থায়ী হওয়াটাকেই কি বেছে নিবেন? মুসলিম দেশে মুভ করার বিষয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কি?(
ছেলের বায়োডাটাতে এটা বলা ছিল যে চিরস্থায়ীভাবে সেখানে থাকার ইচ্ছে নেই, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন করা,ছেলে মুলত উচ্চশিক্ষার জন্যঐ দেশে যায় এবং বর্তমানে পাশাপাশি জব করে)
৪/ অনলাইন কিংবা অফলাইনে জাস্ট ফ্রেন্ডের নামেও কেনো মেয়ে বান্ধবী আছে কিনা?
৫/ আপনার আয় শতভাগ হালাল তো?
যেহেতু ছেলে অমুসলিম দেশে থাকে তাই আমাদের এত কঠোর কিছু প্রশ্ন করা। মেয়ে আসলে দ্বীনের ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতে চায় না
★প্রশ্ন হলো আমাদের প্রশ্নগুলো কি করা ঠিকাছে,, প্রশ্নগুলো পাঠানোর প্রায় ১২-১৩ ঘন্টা যাওয়ার পরও এখনো কোনো রিপ্লাই আসেনি,,আমার ভয় হচ্ছে আমার প্রশ্নে কোনো ভুল হলো কিনা বা ছেলের কোনো মনে কষ্ট গেল কিনা বা এত কঠোর প্রশ্ন করা কি ঠিক হয়েছে? ( আমার কথা হচ্ছে আগে দ্বীনের ব্যাপারে ঠিক থাকলে তারপর সামনে আগানো,, আমরা সামনে আগাবো কিন্তু পরবর্তীতে এসব ব্যাপার ঠিক থাকল না তাহলে তা আর হতাশ করবে)
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নিই: আপনার প্রশ্নগুলোতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো ভুল নেই; বরং বিবাহের প্রস্তাবের আগে দ্বীনি বিষয়ে স্পষ্টতা জানা একটি প্রশংসনীয় ও ইসলামসম্মত পদক্ষেপ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬
অর্থাৎ দ্বীনদারিত্বই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। অনুরূপভাবে ছেলের পক্ষ থেকেও কনের দ্বীনদারিত্ব ও চরিত্র যাচাই করা সুন্নতসম্মত। হাদীসে এসেছে—
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَةٍ» — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪৪৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২০৮২
সুতরাং দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করা, বিশেষত বিদেশে বসবাসকারী প্রার্থীর ইবাদত, হালাল-হারাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানা—এটি সম্পূর্ণ জায়েয, বরং বুদ্ধিমানের কাজ। তবে প্রশ্নের ভাষা ও পদ্ধতিতে কিছু নরম ভঙ্গি ও হিকমত রক্ষা করা উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
«وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا» — সূরা বাকারা: ৮৩
«وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ» — সূরা নাহল: ১২৫
এবং রাসূল ﷺ বলেছেন—
«إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ» — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৯৪
অর্থাৎ নরমতা যেখানে থাকে তা সৌন্দর্য বাড়ায়, আর যেখান থেকে চলে যায় তা কলুষিত করে।
আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর জবাব:
১. প্রশ্নগুলো করা কি ঠিক হয়েছে? — হ্যাঁ, দ্বীনি বিষয়ে স্পষ্টতা জানা ঠিক হয়েছে। বিশেষত বিদেশে বসবাসকারী প্রার্থীর সালাত, হালাল উপার্জন ও আকীদা-বিষয়ক অবস্থান জানা অত্যন্ত জরুরি। এতে কোনো গুনাহ নেই।
২. ১২-১৩ ঘণ্টা রিপ্লাই না আসা: — এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ইনশাআল্লাহ তিনি ভেবে-চিন্তে বিস্তারিত উত্তর দিতে চাইছেন, অথবা ব্যস্ত আছেন। আপনি ধৈর্য ধরুন এবং এক-দুই দিন অপেক্ষা করুন। প্রয়োজনে ভদ্রভাবে একবার অনুস্মারক (reminder) পাঠাতে পারেন। হাদীসে এসেছে—
«إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى» — সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৮৩
৩. প্রশ্নে ভুল হয়েছে বা ছেলের মনে কষ্ট হয়েছে কি? — সম্ভবত হয়নি; কারণ প্রশ্নগুলো দ্বীনি দায়বদ্ধতা থেকেই করা হয়েছে, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। তবে ভবিষ্যতে যোগাযোগে নরম ভাষা ব্যবহার করা উত্তম। যদি মনে হয় কোনো শব্দ কঠোর হয়েছে, তবে ভদ্রভাবে বলতে পারেন: "আমাদের উদ্দেশ্য শুধু দ্বীনি বিষয়ে স্পষ্টতা জানা, কোনো অসদুদ্দেশ্য নয়।"
৪. "আগে দ্বীনের ব্যাপারে ঠিক থাকলে তারপর সামনে আগানো" — এই নীতি ইসলামসম্মত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ফুকাহায়ে কেরামের নিকট বিবাহে কাফাআত (সামঞ্জস্য) ও দ্বীনদারিত্ব অন্যতম বিবেচ্য। রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া শামীতে উল্লেখ আছে যে, দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র প্রার্থীকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত (রদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৮৩)। ইমদাদুল ফাতাওয়া ও বাহিশতী যেওরে বিবাহের প্রস্তাব-বিষয়ক আলোচনায়ও দ্বীনদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ আছে।
৫. অমুসলিম দেশে বসবাস: — যদি দ্বীন রক্ষা করা সম্ভব হয়, তবে জরুরত বা উচ্চশিক্ষার জন্য অস্থায়ীভাবে বসবাস করা জায়েয। কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে হিজরত ত্যাগ করা এবং দ্বীন-ঈমানের ঝুঁকি নেওয়া নিন্দনীয়। ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ আছে যে, যেখানে দ্বীন পালনে প্রতিবন্ধকতা নেই সেখানে থাকা জায়েয; আর যেখানে ফিতনার আশঙ্কা আছে সেখানে হিজরত করা কর্তব্য (ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৫৯৮-৬০০)। মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.)-এর আলোচনায়ও এই মাসআলা স্পষ্ট।
পরামর্শ: প্রশ্নগুলো ঠিক আছে, তবে এখন ধৈর্য ধরুন। রিপ্লাই না এলে একবার ভদ্র অনুস্মারক পাঠান। আর মেয়ের দ্বীনি দৃঢ়তা প্রশংসনীয়—তবে হিকমত ও নরম ভাষার সাথে এগোনোই সুন্নতসম্মত পদ্ধতি। আল্লাহ তাআলা উভয়ের জন্য কল্যাণময় সিদ্ধান্ত দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।