নিঃসন্তান বৃদ্ধা মহিলার বেঁচে থাকতেই দানপত্র করা
Family Life · Hanafi
Question
এভাবে সেই বৃদ্ধা মহিলার দান করা কি ইসলামী বৈধ হয়েছে?
Answer
নিঃসন্তান বৃদ্ধা ও বিধবা মহিলার দানপত্র: ইসলামী বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন নিঃসন্তান, বিধবা ও বৃদ্ধা মহিলা তার সম্পত্তি পালক কন্যার দুই মেয়েকে লিখিতভাবে দান করেছেন। তবে তিনি তাদেরকে জীবদ্দশায় ভোগ করার অধিকার দেননি; বলেছেন—"আমার মৃত্যুর পর মালিকানার অধিকার পাবে।" প্রশ্ন হলো—এ ধরনের দান ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বৈধ হয়েছে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এ ধরনের দান ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ হয়নি। এটি মূলত ওয়াসিয়্যাত (মৃত্যুর পর কার্যকরী অসিয়ত)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক-তৃতীয়াংশের বেশি হলে তা মৃতের রেখে যাওয়া ওয়ারিসদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর হবে না। আর যেহেতু দাতা জীবদ্দশায় মালিকানা ও ভোগ হস্তান্তর করেননি, তাই এটি হিবা (দান) হিসেবে সম্পূর্ণ হয়নি; বরং মৃত্যু-সংশ্লিষ্ট অসিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. হিবা (দান) সম্পূর্ণ হওয়ার শর্ত
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী হিবা সম্পূর্ণ (তামলিক) হওয়ার জন্য তিনটি মূল শর্ত:
- ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ)
- কবজা (দখল) বা হস্তান্তর — দাতা দানকৃত বস্তু থেকে সম্পূর্ণ হাত উঠিয়ে দাতব্য গ্রহীতাকে তার অধিকারে দিয়ে দেবে
- দাতার মালিকানা থেকে বের হয়ে যাওয়া
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কবজা ছাড়া হিবা সম্পূর্ণ হয় না। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, দাতা যদি দান করার পর দানকৃত বস্তু নিজের অধিকারে রেখে দেয় এবং ভোগ করতে থাকে, তাহলে হিবা বাতিল হয়ে যায়।
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): "الْهِبَةُ لَا تَتِمُّ إِلَّا بِالْقَبْضِ" — "হিবা কবজা ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হিবা)
আল-হিদায়া: "وَلَا تَتِمُّ الْهِبَةُ إِلَّا بِالْقَبْضِ" — "দান কবজা ব্যতীত পূর্ণ হয় না।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল হিবা)
এখানে দাতা স্পষ্টভাবে বলেছেন—"আমার মৃত্যুর পর মালিকানার অধিকার পাবে।" অর্থাৎ জীবদ্দশায় কোনো দখল বা মালিকানা হস্তান্তর হয়নি। সুতরাং এটি হিবা হিসেবে সম্পূর্ণ হয়নি।
২. এটি ওয়াসিয়্যাত হিসেবে গণ্য হবে
যেহেতু দানটি মৃত্যুর সাথে সম্পৃক্ত এবং মৃত্যুর পর কার্যকর হবে, তাই এটি ওয়াসিয়্যাত-এর অন্তর্ভুক্ত। ওয়াসিয়্যাতের বিধান:
আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুর নিকটবর্তী হলে এবং সম্পদ রেখে যাচ্ছে, সে যেন তার পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়সংগতভাবে অসিয়ত করে।" (সূরা বাকারা: ১৮০)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—"তোমরা এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করতে পারো, আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক বেশি।" (সহিহ বুখারি: ২৭৪২; সহিহ মুসলিম: ১৬২৮)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন—"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা দান করেছেন তোমাদেরকে মৃত্যুর সময় তোমাদের সম্পদের এক-তৃতীয়াংশে অসিয়ত করার অনুমতি।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭০৯)
সুতরাং:
- এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত এই দান/অসিয়ত কার্যকর হবে।
- এক-তৃতীয়াংশের বেশি হলে, ওয়ারিসদের সম্মতি ছাড়া অতিরিক্ত অংশ কার্যকর হবে না।
- যদি ওয়ারিস থাকে এবং তারা সম্মতি না দেয়, তবে শুধু এক-তৃতীয়াংশ কার্যকর হবে।
৩. ওয়ারিসদের অধিকার রক্ষা
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং ওয়ারিসের জন্য কোনো অসিয়ত নেই।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৮৭০; সুনানে তিরমিজি: ২১২১)
ফিকহে হানাফি: "لَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ" — "ওয়ারিসের জন্য অসিয়ত নেই।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল ওয়াসায়া)
এখানে দাতা নিঃসন্তান ও বিধবা। তার ওয়ারিস কারা? ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী—স্বামী নেই, সন্তান নেই; তবে ভাই-বোন, ভাই-বোনের সন্তান, চাচা-ফুফু, মামা-খালা ইত্যাদি আসাবা ও যবিল আরহাম থাকলে তারা ওয়ারিস হবে। পালক কন্যা ও তার মেয়েরা শরীয়ত অনুযায়ী ওয়ারিস নয় (পালক সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক নয়)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: "আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন—পুত্রের জন্য কন্যার দ্বিগুণ..." (সূরা নিসা: ১১)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—"যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ নিজের ওয়ারিস ছাড়া অন্য কাউকে দান করে, সে যেন..." (সুনানে আবু দাউদ: ২৮৭০)
সুতরাং পালক কন্যা ও তার মেয়েরা ওয়ারিস না হওয়ায় তাদের জন্য অসিয়ত করা যাবে, কিন্তু এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে; ওয়ারিসদের সম্মতি ছাড়া বেশি নয়।
৪. পালক সন্তানের বিধান
আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার নামে ডাকো; এটাই আল্লাহর নিকটে ন্যায়সংগত।" (সূরা আহযাব: ৫)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—"আমি তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তির নিকটে বেশি নিকটবর্তী নই, যার প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে..." (সহিহ বুখারি: ২৩৯৯)
পালক সন্তান শরীয়ত অনুযায়ী সন্তান নয়; উত্তরাধিকারে অংশ পায় না। তবে দান-সদকা, অসিয়ত (১/৩-এর মধ্যে) বা জীবদ্দশায় বৈধ হিবা করা যাবে।
৫. দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার না দেওয়ার প্রভাব
দাতা বলেছেন—"আমার মৃত্যুর পর মালিকানার অধিকার পাবে।" এর অর্থ:
- জীবদ্দশায় দানকৃত সম্পদ দাতার মালিকানাতেই থাকবে
- গ্রহীতারা কোনো দখল বা ভোগ পাবে না
- মৃত্যুর পর ওয়াসিয়্যাত হিসেবে কার্যকর হবে
এটি হিবা নয়; বরং ওয়াসিয়্যাত। আর ওয়াসিয়্যাতের বিধান হলো—এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ওয়ারিসদের সম্মতি ছাড়া বেশি নয়।
রাদ্দুল মুহতার: "الْوَصِيَّةُ تَصِحُّ بِالثُّلُثِ" — "অসিয়ত এক-তৃতীয়াংশে বৈধ।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ওয়াসায়া)
ফাতাওয়া আলমগিরি: "الْوَصِيَّةُ بِأَكْثَرَ مِنْ الثُّلُثِ مَوْقُوفَةٌ عَلَى إِجَازَةِ الْوَرَثَةِ" — "এক-তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত ওয়ারিসদের সম্মতির উপর নির্ভরশীল।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ওয়াসায়া)
সারসংক্ষেপ ও করণীয়
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | জীবদ্দশায় দখল না দেওয়া | হিবা সম্পূর্ণ হয়নি | | মৃত্যুর পর কার্যকর | ওয়াসিয়্যাত হিসেবে গণ্য | | এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত | বৈধ ও কার্যকর | | এক-তৃতীয়াংশের বেশি | ওয়ারিসদের সম্মতি ছাড়া কার্যকর নয় | | পালক কন্যা ও তার মেয়েরা | ওয়ারিস নয়, তবে ১/৩-এর মধ্যে অসিয়ত পাবে | | ওয়ারিস থাকলে | তাদের হক রক্ষা করতে হবে |
পরামর্শ: দাতা জীবিত থাকলে চাইলে জীবদ্দশায় বৈধ হিবা করতে পারেন—যাতে দখল ও মালিকানা হস্তান্তর হয় এবং ওয়ারিসদের হক ক্ষুণ্ণ না হয়। আর মৃত্যুর পরের ব্যবস্থা হিসেবে এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওয়াসিয়্যাত করাই শরীয়তসম্মত। বেশি দিতে চাইলে ওয়ারিসদের সম্মতি নিতে হবে।
ইমদাদুল ফাতাওয়া: "وصیت کے نافذ ہونے کے لیے ایک تہائی سے زیادہ نہ ہونا ضروری ہے، ورنہ وارثوں کی اجازت کے بغیر نافذ نہ ہوگی۔" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, কিতাবুল ওয়াসায়া)
ফাতাওয়া উসমানি: "اگر کسی نے اپنی زندگی میں قبضہ نہ دیا اور کہا کہ میرے مرنے کے بعد ملکیت ملے گی تو یہ وصیت ہے، اور وصیت ایک تہائی میں نافذ ہوتی ہے۔" (ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুল ওয়াসায়া)