ঈমান ও কুফর নিয়ে সন্দেহ, মুখে কুফরি কথা বলে ফেলার ভয়, দুই দিন পর তওবা, বিবাহ ও নিকাহ বহাল থাকার বিধান জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১)আপনারা বলেছেন, সন্দেহ যুক্ত জিনিস বাদ দিতে। আল্লাহ কে নিয়ে কোন কিছু মুখে উচ্চারণ করে বললাম কিনা আমার যেহেতু সন্দেহ আছে তাই এই বিষয় টা আমি বাদ দিব। কিন্তু এটা বাদ দিলে যদি ঈমানে কোনো সমস্যা হয়? মানে আমি হয়তো আল্লাহকে নিয়ে এমন কথা বলে ফেললাম যেটা বলা ঠিক না, কিন্তু আমার তা খেয়াল করি নাই। বা আমার সজ্ঞ্যানে হয় নাই। খেয়াল করি নাই দেখেই তো আমি চিন্তিত মনে মনে বললাম নাকি মুখে উচ্চারণ করে বললাম। তাহলে এই অবস্থা তে ঈমানের কোনো সমস্যা হবে? যদি আমি ভুলেই মুখে উচ্চারণ করে বলে থাকি আর সেটা আমার মাথায় নাই। ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
২) আমি আগের প্রশ্নে বলেছি আমার মনে আল্লাহ কে নিয়ে বাজে কথা বলার মত কিছু ছিল না। তাও আমি একটা কথা বলে ফেলি যেটা বলা ঠিক না। আমি মনে মনে বললাম নাকি মুখেই বললাম নিশ্চিত না। তাও আমি আপনাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মুখে উচ্চারণ করে যদি বলে ফেলি তাহলে কি হবে? আপনারা বলেছেন যে, মনে যদি কুফরী বিশ্বাস না থাকে, তাহলে এমন কথা বলার জন্য সাথে সাথে তওবা করলে ঈমান ঠিক থাকবে। এখন আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন করে উত্তর জানতে সিউর হয়ে জানতে ২ দিন চলে গেছে। আবার আমি নিশ্চিত না মনে মনে বলছি নাকি সেগুলো শুধু খন্ড খন্ড ভাবনা ছিল নাকি মুখে উচ্চারণ করেই বলেছি। এখন ২ দিন পরে তওবা করলে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৩) আমার বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
৪) আমার বিয়ে নবায়ন করতে হবে?
৫) আমার ঈমান নবায়ন করতে হবে?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে ঈমান ও কুফরের বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। আপনি যে মানসিক দ্বিধা ও উদ্বেগের মধ্যে আছেন, তা বোঝা যাচ্ছে। দয়া করে নিচের বিস্তারিত উত্তর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি জেনে নিন: ইসলামি শরিয়তের একটি বড় মূলনীতি হলো, "নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না" (আল-ইয়াকিনু লা ইয়াযুলু বিস-শাক্ক)। অর্থাৎ, আপনার ঈমানের ব্যাপারে মূল ভিত্তি হলো নিশ্চয়তা। আপনি মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ঈমান এনেছেন—এটি নিশ্চিত। কিন্তু আপনি কি কুফরি কথা বলেছেন বা আপনার ঈমান ভঙ্গ হয়েছে—এটি একটি সন্দেহ। যেহেতু কুফর প্রমাণিত হওয়ার জন্য নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন, আর আপনার ক্ষেত্রে সন্দেহ রয়েছে, তাই আপনার ঈমান ঠিকই আছে। শুধু সন্দেহের বশে আপনি নিজেকে কাফির ভাববেন না বা ঈমান ভঙ্গ হয়েছে বলে ধরে নেবেন না।
এছাড়া, হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কুমন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)।
এখন আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর:
১) সন্দেহযুক্ত বিষয় বাদ দেওয়া এবং ঈমানের সমস্যা হওয়ার প্রশ্ন:
আপনি বলেছেন, "সন্দেহ যুক্ত জিনিস বাদ দিতে"—এটি ইসলামের একটি সুন্দর মূলনীতি। হাদিসে আছে, "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহে ফেলে না, তা গ্রহণ করো।" (তিরমিজি: ২৫১৮)।
আপনি যদি সন্দেহের কারণে এই ভাবনা বাদ দেন যে "আমি হয়তো আল্লাহকে নিয়ে খারাপ কথা বলেছি", তাহলে আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে আপনি কুফরি কথা বলেছেন। আর কুফর প্রমাণিত হওয়ার জন্য নিশ্চিত কথা বা বিশ্বাস প্রয়োজন। শুধু মনে সন্দেহ বা ভয় থাকলে אדם কাফির হয় না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কুফরের ভয় বা ওয়াসওয়াসা কুফর নয়, বরং এটি ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)।
তাই, আপনি যদি ভুলে বা অজ্ঞতাবশত মুখে কোনো খারাপ কথা বলে থাকেন, কিন্তু আপনার অন্তরে কুফরি বিশ্বাস ছিল না, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
২) দুই দিন পর তওবা করলে ঈমানের সমস্যা হবে কি?
আপনি আগের উত্তরে জেনেছেন যে, মনে কুফরি বিশ্বাস না থাকলে মুখে খারাপ কথা বলার জন্য সাথে সাথে তওবা করলে ঈমান ঠিক থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, দুই দিন পর তওবা করলে কি সমস্যা হবে?
উত্তর: না, দুই দিন পর তওবা করলেও আপনার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ, তওবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই; বরং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তওবার দরজা খোলা। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সূরা বাকারা: ১৭৩)। আরও বলেন: "হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা নূর: ৩১)।
তবে, আপনি যেহেতু সন্দেহে আছেন যে মুখে বলেছেন কি না, তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আপনি এখনই তওবা করে নিন এবং ভবিষ্যতে এমন কথা থেকে বিরত থাকুন। তওবা করার নিয়ম হলো: (১) অন্তরে অনুশোচনা করা, (২) মুখে ইস্তিগফার পড়া, (৩) ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে কুফরি কথা বলেছেন, তবুও সন্দেহের কারণে তওবা করে নিলে কোনো ক্ষতি নেই; বরং এটি ইহতিয়াত (সতর্কতা) হিসেবে গণ্য হবে।
মনে রাখবেন: শয়তান আপনার মনে সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে আপনাকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে। আপনি তার ধোঁকায় পড়বেন না। আপনার ঈমান ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ। আপনি শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং নিজের কাজ চালিয়ে যান।
৩) আমার বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
আপনার বিবাহিত জীবন ঠিক আছে কি না, তা নির্ভর করে আপনি কুফরি কথা বলেছেন কি না এবং আপনার ঈমান ভঙ্গ হয়েছে কি না তার উপর। যেহেতু আমরা উপরে বলেছি, আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে (কারণ আপনি নিশ্চিত নন এবং আপনার অন্তরে কুফরি বিশ্বাস ছিল না), তাই আপনার বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ। আপনার নিকাহ বহাল আছে। আপনাকে নতুন করে বিয়ে করতে হবে না।
ইসলামি ফিকহের নিয়ম হলো, কুফর প্রমাণিত না হলে নিকাহ ভঙ্গ হয় না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেছেন, "শুধু সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার কারণে নিকাহ ভঙ্গ হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৬০)। তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
৪) আমার বিয়ে নবায়ন করতে হবে?
উত্তর: না, আপনার বিয়ে নবায়ন করতে হবে না। যেহেতু আপনার ঈমান ঠিক আছে এবং কুফর প্রমাণিত হয়নি, তাই আপনার নিকাহ বহাল আছে। তবে, আপনি যদি সতর্কতামূলকভাবে (ইহতিয়াত হিসেবে) বিয়ে নবায়ন করতে চান, তাহলে সেটি আলাদা বিষয়; কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এর প্রয়োজন নেই। ফিকহের কিতাবগুলোতে বলা হয়েছে, "যদি কোনো ব্যক্তি সন্দেহ করে যে সে কুফরি কথা বলেছে কি না, তাহলে তার নিকাহ ভঙ্গ হয় না; তবে সতর্কতামূলকভাবে নবায়ন করা যেতে পারে।" (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৪৫)।
৫) আমার ঈমান নবায়ন করতে হবে?
উত্তর: না, আপনার ঈমান নবায়ন করা আবশ্যক নয়। কারণ, আপনার ঈমান ভঙ্গ হয়নি (ইনশাআল্লাহ)। তবে, আপনি যদি মানসিক শান্তির জন্য বা সতর্কতামূলকভাবে ঈমান নবায়ন করতে চান, তাহলে সেটি জায়েজ আছে। ঈমান নবায়ন করার সহজ পদ্ধতি হলো: "আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু" পড়া এবং অন্তরে বিশ্বাস করা। এটি করলে কোনো ক্ষতি নেই; বরং এটি আপনার ঈমানকে আরও দৃঢ় করবে।
পরামর্শ: আপনি যেহেতু বারবার সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসায় ভুগছেন, তাই দয়া করে কোনো অভিজ্ঞ আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন। এছাড়া, নিয়মিত ইস্তিগফার পড়ুন, "আউযু বিল্লাহি মিনাশ-শাইতানির-রাজিম" পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ঈমানের হেফাজতের দোয়া করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার ঈমানকে মজবুত করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।