আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে বাজে কথা, "ভালো মানুষ" বলা, ঈমান ও বিবাহ নবায়ন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে চাই?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7494
Questioner: Nira
Question Asked: 28 Oct 2026, 06:09 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 06:34 PM
Views: 56
Tokens: 8,225
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)আমার আল্লাহ নবীকে নিয়ে মনে মনে বাজে কথা চলে আসে। তখন আমি নখ কামড়াতে কামড়াতে বলি, মানে চিন্তা করতে থাকি, বাজে কথা আসলেই আমি বলি আল্লাহ মহান। আবার নবীকে নিয়ে আসলে তখন বলি নবী মহান। পরে আমি এক সময় হঠাৎ বলে ফেলি তারা দুইজন ই ভালো। এখন আমি শুধু ভালো বলছিলাম নাকি ভালো মানুষ বলছিলাম আমার মনে পড়ে না। আমি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে মাফ চাইছি। এখন আমার ঈমানে কি কোনো সমস্যা হবে?

২) ভালো বলছি নাকি মানুষ ও বলছি মানে তারা দুইজন এ ভালো / নাকি ভালো মানুষ ও বলছি,
এটা যদি মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি তাহলে কোনো সমস্যা হবে?

৩) মানুষ তো সবাইকে বলা যায় না। এই জন্যই আমার টেনশন হচ্ছে। যদি আমি মুখে উচ্চারণ করে মানুষ ও বলে থাকি তাহলে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে" মানুষ বলা "এটা তো আমি বিশ্বাস করি না। তাই যদি ভুলে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি। বলে থাকি। তাহলে আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৫) এখানে দুইজন কেই মহান বললাম এই জন্য ঈমানে কোনো সমস্যা হবে? আল্লাহর সাথে তো কারোর তুলনা হয় না।

৬) আমি ভাত খাচ্ছিলাম। ভাত খাওয়ার সময় মনে মনে আল্লাহ কে নিয়ে একটা কথা বলে ফেলি যেটা বলা উচিত না। পরে আমি সাথে সাথে মনে মনেই আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ি, নাউজুবিল্লাহ পড়ি। এখন আমি কথাটা মনে মনে বলেছিলাম নাকি মুখে উচ্চারণ করে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। কারন আমার মুখ খোলা ছিল। খাওয়ার সাউন্ড হচ্ছিলো। এখন আমার ঈমানে কি কোনো সমস্যা হবে?
৭) আপনারা একবার বলেন, মুখে উচ্চারণ করলে ঈমানে সমস্যা হয়। আবার বলেন উচ্চারণ করলেও সমস্যা হয় না। এখন আমার ক্ষেত্রে কি হবে? ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?
৮) আমার ঈমান বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে? নাকি নবায়ন করতে হবে?
৯) আপনাদের উত্তর এর উপর আমল করে ঈমান বিবাহিত জীবন নবায়ন না করলে কোন সমস্যা হবে?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে ঈমান ও তাওহীদ হলো সর্বোচ্চ বিষয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন: "তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রগামী হয়ো না" (সূরা হুজুরাত: ১)। অন্যত্র বলেছেন: "আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না" (সূরা লুকমান: ১৩)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না" (সহীহ মুসলিম: ৮২)।

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর ধাপে ধাপে দিচ্ছি:

১) মনে মনে বাজে কথা আসা এবং "তারা দুইজনই ভালো" বলা: মনে মনে কুচিন্তা আসা বা ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা) আসলে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয় বা অন্তরে বিশ্বাস করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা আমল করে" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯)। কিন্তু আপনি "তারা দুইজনই ভালো" বলে ফেলেছেন—এটি একটি গুরুতর বিষয়। কারণ "ভালো" শব্দটি আল্লাহ ও নবী ﷺ উভয়ের ক্ষেত্রে একসাথে ব্যবহার করা তাওহীদের পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাঁর কোনো তুলনা নেই (সূরা ইখলাস: ৪)। তবে আপনি যদি না জানেন যে "ভালো" বলতে "ভালো মানুষ" বুঝিয়েছেন কি না, এবং আপনি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে তাওবা করেছেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন। তবে সতর্কতা: আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা কুফর, কিন্তু "ভালো" বলা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে যদি আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়। আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন না, তাই তাওবা করলে ঈমান ঠিক আছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ এড়িয়ে চলুন।

২) "তারা দুইজনই ভালো মানুষ" বলা: যদি আপনি "ভালো মানুষ" বলে থাকেন, তবে আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা কুফর, কারণ আল্লাহ মানুষ নন। কিন্তু আপনি যদি না জেনে বা ভুলে বলে ফেলেন এবং সাথে সাথে তাওবা করেন, তাহলে ঈমানের সমস্যা হবে না। তবে সচেতনভাবে বলা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "তিনি সৃষ্টির কোনো সদৃশ নন" (সূরা শূরা: ১১)। সুতরাং আল্লাহকে "মানুষ" বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৩) মুখে "মানুষ" বলা: যদি আপনি আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলে ফেলেন, তবে তা কুফর। কিন্তু আপনি যদি না জেনে, ভুলে বা ওয়াসওয়াসায় পড়ে বলে ফেলেন এবং সাথে সাথে তাওবা করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ ক্ষমা হবে। তবে যদি সচেতনভাবে বলেন, তাহলে ঈমান চলে যাবে এবং তাওবা করে ঈমান নবায়ন করতে হবে। আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন না, তাই ভুলে বলা ক্ষমার যোগ্য।

৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা: আপনি নিজেই বলেছেন আপনি বিশ্বাস করেন না। সুতরাং ভুলে মুখে উচ্চারণ করলে এবং তাওবা করলে ঈমানের সমস্যা হবে না। কিন্তু সতর্ক থাকুন, কারণ শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে ঈমান নষ্ট করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায়" (সূরা নিসা: ৬০)।

৫) দুইজনকে "মহান" বলা: আল্লাহর সাথে কাউকে "মহান" বলা শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি একই মর্যাদায় তুলনা করা হয়। কিন্তু আপনি যদি নবী ﷺ-কে "মহান" বলেন আল্লাহর তুলনায় নয়, বরং তাঁর সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে, তবে তা জায়েজ। তবে "তারা দুইজনই মহান" বলে একসাথে বলা তাওহীদের পরিপন্থী। আপনি যেহেতু আল্লাহর সাথে তুলনা করেন না, তাই তাওবা করলে ঈমান ঠিক আছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ এড়িয়ে চলুন।

৬) ভাত খাওয়ার সময় মনে মনে বা মুখে বলা: আপনি যদি মনে মনে বলে থাকেন, তবে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয়নি। আর যদি মুখে উচ্চারণ করে থাকেন এবং তা কুফর হয়, তবে সাথে সাথে আস্তাগফিরুল্লাহ ও নাউজুবিল্লাহ পড়ে তাওবা করেছেন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন। তবে আপনার সন্দেহ রয়েছে—মুখে বলেছেন কি না। ইসলামে সন্দেহের উপর ভিত্তি করে ঈমান নষ্ট হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও ওয়াসওয়াসার উপর থেকে শাস্তি উঠিয়ে নিয়েছেন" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩)। সুতরাং আপনি তাওবা করেছেন, ঈমান ঠিক আছে।

৭) পরস্পরবিরোধী উত্তর সম্পর্কে: আমি স্পষ্ট করছি: মুখে উচ্চারণ করলে ঈমানের সমস্যা হয় যদি তা কুফর বা শিরকের কথা হয় এবং সচেতনভাবে বলা হয়। আর যদি ভুলে, না জেনে বা ওয়াসওয়াসায় পড়ে বলা হয় এবং সাথে সাথে তাওবা করা হয়, তাহলে সমস্যা হয় না। আপনার ক্ষেত্রে আপনি তাওবা করেছেন, তাই ইনশাআল্লাহ ঈমান ঠিক আছে। তবে সতর্কতা: ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকুন।

৮) ঈমান ও বিবাহিত জীবন: আপনার ঈমান ঠিক আছে ইনশাআল্লাহ, কারণ আপনি তাওবা করেছেন এবং বিশ্বাসে কোনো সমস্যা নেই। বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে, কারণ ঈমান নষ্ট হয়নি। তবে আপনি যদি নিশ্চিত হন যে কুফরী কথা সচেতনভাবে বলেছেন এবং তাওবা করেননি, তাহলে ঈমান নবায়ন করতে হবে এবং বিবাহ নতুন করে করতে হবে। কিন্তু আপনার বর্ণনায় আপনি তাওবা করেছেন, তাই নবায়নের প্রয়োজন নেই।

৯) উত্তর অনুযায়ী আমল না করলে: আপনি যদি তাওবা করে থাকেন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকেন, তবে ঈমান ও বিবাহ নবায়ন না করলেও কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি আপনি সচেতনভাবে কুফরী কথা বলেন এবং তাওবা না করেন, তাহলে ঈমান চলে যাবে এবং বিবাহ বাতিল হবে। তাই সতর্ক থাকুন এবং বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ুন।

উপসংহার: আপনার ঈমান ইনশাআল্লাহ ঠিক আছে, কারণ আপনি তাওবা করেছেন। তবে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে বেশি বেশি "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (সূরা যুমার: ৫৩)। আপনার বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে, নবায়নের প্রয়োজন নেই। তবে ভবিষ্যতে আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর শানে কোনো ধরনের অবমাননাকর শব্দ থেকে বিরত থাকুন।

তথ্যসূত্র:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৪/২২১ (কুফর ও শিরক সম্পর্কিত)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ১/১৩৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ৪/৩৮৫
  • বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ঈমান ও কুফর অধ্যায়
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শাফি): সূরা হুজুরাতের তাফসীর

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং ঈমানের উপর অটল রাখুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.