"রবের কাছে বিচার দিলাম" বলা কি ঠিক?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7488
Questioner: Ri Tu
Question Asked: 28 Oct 2026, 03:15 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 03:26 PM
Views: 60
Tokens: 2,892
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

“রবের কাছে বিচার দিলাম কাথাটি বলা কি ঠিক?

Answer

প্রশ্ন: "রবের কাছে বিচার দিলাম" — কথাটি বলা কি ঠিক?

উত্তর (সংক্ষেপে): হ্যাঁ, কথাটি বলা জায়েজ ও ঠিক; তবে এর অর্থ ও নিয়ত সঠিক হতে হবে। অর্থ হলো—"আমি আমার বিষয়টি আল্লাহ তা'আলার কাছে সোপর্দ করলাম, তাঁরই ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট রইলাম।" এটি তাওয়াক্কুল ও তাসলিমের (আল্লাহর উপর ভরসা ও তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার) অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।


১. কুরআন থেকে দলিল

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ "তারা বলল: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।" (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ "যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করো, তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের কাছে ফিরিয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৫৯)

এ আয়াতের তাফসীরে বলা হয়েছে—বিবাদ-বিরোধের ফয়সালা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর কাছে সোপর্দ করা। (দেখুন: মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ., ২/৩৫০-৩৫৫)


২. হাদীস থেকে দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ... "মুমিনের সব কাজই বিস্ময়কর (ও কল্যাণকর)... যদি তার উপর কষ্ট আসে, সে ধৈর্য ধারণ করে, তাতেও তার কল্যাণ।" (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯)

আরও ইরশাদ করেন:

احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ... وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ: لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ... وَلَكِنْ قُلْ: قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ "তোমার উপকারী কাজে চেষ্টা করো... আর যদি কোনো বিপদ আসে, তবে বলো না 'যদি আমি এমন করতাম'; বরং বলো: 'আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তিনি যা চান তাই করেন।'" (সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪)

এ হাদীসে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—যা "রবের কাছে বিচার দিলাম" কথাটির মূল ভাবার্থ।


৩. হানাফী কিতাবের বক্তব্য

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.): তাওয়াক্কুল ও তাসলিমের অর্থ হলো—আসবাব (উপায়) অবলম্বন করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। (রাদ্দুল মুহতার, ৯/৫২১-এর কাছাকাছি আলোচনা; কিতাবুল ইমান)

  • মা'আরিফুল কুরআন: সূরা আলে ইমরানের ১৭৩ নং আয়াতের তাফসীরে মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. বলেন—"হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল" হলো মুমিনের সর্বোত্তম আশ্রয়-বাক্য; বিপদে-মুসীবতে এটি পড়া সুন্নত। (মা'আরিফুল কুরআন, ২/২৪০-২৪৫)

  • বেহেশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.): তাওয়াক্কুলের আলোচনায় বলা হয়েছে—আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের দাবি। (বেহেশতী যেওর, তাওয়াক্কুল অধ্যায়)

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.): "আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম" বা "আল্লাহই ফয়সালা করবেন" ধরনের কথা বলা জায়েজ; তবে মুখে বলার সাথে সাথে আল্লাহর ফয়সালায় অন্তর থেকে সন্তুষ্ট থাকা জরুরি। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৮০-এর কাছাকাছি)


৪. সতর্কতা ও শর্ত

১. নিয়ত সঠিক হতে হবে: কথাটি যেন আল্লাহর প্রতি ভরসা ও তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্টির প্রকাশ হয়; কোনো ব্যক্তির প্রতি ক্ষোভ বা আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধাচরণের প্রকাশ না হয়।

২. আল্লাহর সাথে তুলনা নয়: কাউকে "রবের মতো বিচারক" বলা বা আল্লাহর ফয়সালাকে তুচ্ছ করা নাজায়েজ। "রবের কাছে বিচার দিলাম" অর্থ আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা—এটি ঠিক; কিন্তু "আমি নিজেই রবের মতো বিচার করলাম" —এমন অর্থ নাজায়েজ।

৩. আসবাব ত্যাগ করা যাবে না: শুধু মুখে "আল্লাহর কাছে দিলাম" বলে চেষ্টা-প্রচেষ্টা ত্যাগ করা তাওয়াক্কুল নয়; বরং শরীয়তসম্মত উপায় অবলম্বন করে ফলাফল আল্লাহর হাতে ছাড়া হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল। (রাদ্দুল মুহতার; মা'আরিফুল কুরআন)

৪. বিবাদ-বিরোধে: পারস্পরিক বিরোধে শরীয়তের ফয়সালা মানা ওয়াজিব; "আল্লাহর কাছে দিলাম" বলে শরীয়তের বিধান এড়ানো যাবে না। (সূরা আন-নিসা: ৫৯)


উপসংহার

"রবের কাছে বিচার দিলাম" কথাটি বলা জায়েজ ও ঠিক, যদি এর দ্বারা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্টি ও তাঁর কাছে সোপর্দ করার নিয়ত থাকে। তবে আসবাব (উপায়) ত্যাগ করা, শরীয়তের বিধান এড়ানো বা আল্লাহর ফয়সালার বিরুদ্ধাচরণ করা উদ্দেশ্য হলে তা নাজায়েজ। সর্বোত্তম হলো—উপায় অবলম্বন করে অন্তর থেকে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রয়োজনে "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকীল" পড়া।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.