বাবার দেওয়া টাকায় ভাইয়ের ব্যাবসা — বাবা মারা গেলে সেই ব্যাবসা বা টাকার ভাগ কে পাবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
নাকি যতোটুকু টাকা ব্যাবসায় দিছে তারই ভাগ পাবে?
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ভাইয়ের ব্যাবসায় বাবা যে টাকা দিয়েছেন, তা যদি ঋণ (করজ) হিসেবে দেওয়া হয়, তাহলে বাবা মারা গেলে সেই টাকা বাবার সম্পত্তি (তরকা) হিসেবে গণ্য হবে এবং সব ওয়ারিসরা শরীয়ত অনুযায়ী সেই টাকার ভাগ পাবে — ব্যাবসার লাভ বা মূলধনের ভাগ নয়। আর যদি বাবা শরিকানা (মুশারাকা) হিসেবে টাকা দেন — অর্থাৎ ব্যাবসায় অংশীদার হওয়ার নিয়তে — তাহলে বাবার মৃত্যুর পর তার অংশ তার সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সব ওয়ারিসরা সেই অংশের ভাগ পাবে।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মূল নীতি: দান, ঋণ ও শরিকানার পার্থক্য
ইসলামী ফিকহে সম্পত্তি হস্তান্তরের তিনটি ভিন্ন ধরন রয়েছে, এবং প্রতিটির হুকুম আলাদা:
| ধরন | বাবার জীবদ্দশায় মালিকানা | বাবার মৃত্যুর পর হুকুম | |---|---|---| | হেবা/দান (সম্পূর্ণ বিনিময়হীন) | ছেলের সম্পূর্ণ মালিকানা | তরকায় গণ্য হবে না; ভাই সম্পূর্ণ মালিক | | ঋণ (করজ) | বাবার পাওনা থাকে | বাবার তরকার অন্তর্ভুক্ত; সব ওয়ারিস ভাগ পাবে | | শরিকানা (মুশারাকা) | বাবা অংশীদার | বাবার অংশ তরকার অন্তর্ভুক্ত; সব ওয়ারিস ভাগ পাবে |
মূল প্রশ্ন হলো: বাবা টাকা দেওয়ার সময় নিয়ত কী ছিল — দান, ঋণ, নাকি শরিকানা? নিয়ত ও পরিস্থিতিই এখানে নির্ণায়ক।
২. যদি বাবা ঋণ হিসেবে টাকা দেন
বাবার জীবদ্দশায় ছেলের কাছে যে টাকা পাওনা থাকে, তা বাবার দেনা (দায়ীন) হিসেবে বহাল থাকে। বাবা মারা গেলে:
- প্রথমে বাবার তাজহীয-তাকফীন (কাফন-দাফন) খরচ বাদ যাবে।
- এরপর বাবার ঋণ পরিশোধ করতে হবে (যদি অন্য কোথাও ঋণ থাকে)।
- এরপর ওয়াসিয়্যাত (যদি এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে থাকে) পূর্ণ করতে হবে।
- অবশিষ্ট সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন হবে।
সুতরাং ছেলের কাছে থাকা বাবার ঋণও তরকার অন্তর্ভুক্ত হবে এবং সব ওয়ারিস (মা, ভাই, বোন ইত্যাদি) শরীয়তের নির্ধারিত অনুপাতে সেই টাকার ভাগ পাবে। ছেলে শুধু "ব্যাবসায় যত টাকা দিয়েছে ততটুকু" ফেরত দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না — বরং সেই টাকা তরকার অংশ হিসেবে বণ্টনযোগ্য।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন), কিতাবুল ফারায়েজ — "الديون التي على الورثة تعتبر من جملة التركة" (ওয়ারিসদের উপর থাকা ঋণ তরকার অন্তর্ভুক্ত)। আরও দেখুন ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ফারায়েজ, এবং আল-হিদায়া, কিতাবুল ফারায়েজ।
৩. যদি বাবা শরিকানা (মুশারাকা) হিসেবে টাকা দেন
যদি বাবা স্পষ্টভাবে ব্যাবসায় অংশীদার হিসেবে টাকা দেন (যেমন: "এই টাকা ব্যাবসায় লাগাও, লাভ-ক্ষতিতে আমি অংশীদার"), তাহলে বাবা সেই ব্যাবসায় তার অংশের মালিক। বাবা মারা গেলে:
- বাবার শরিকানা অংশ (মূলধন + সেই অনুপাতে অর্জিত লাভ) তার তরকার অন্তর্ভুক্ত হবে।
- সেই অংশ সব ওয়ারিসের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টিত হবে।
- ভাই শুধু "বাবা যত টাকা দিয়েছে ততটুকু" ফেরত দিলে হবে না; বরং বাবার অংশের সঠিক মূল্য (মূলধন ও লাভের অনুপাতসহ) হিসাব করে তরকায় যোগ করতে হবে।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুশ শিরকাহ; ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), কিতাবুল বুয়ূ ও শিরকাহ অধ্যায়।
৪. যদি বাবা দান (হেবা) হিসেবে টাকা দেন
যদি বাবা নিঃস্বার্থ দান হিসেবে টাকা দেন — অর্থাৎ ছেলেকে সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দেন, ফেরতের কোনো নিয়ত না থাকে — তাহলে সেই টাকা ছেলের নিজের সম্পত্তি। বাবা মারা গেলে সেই টাকা তরকার অন্তর্ভুক্ত হবে না; ভাই সম্পূর্ণ মালিক থাকবে।
তবে শর্ত হলো:
- হেবা কবজা (দখল) সহ সম্পন্ন হতে হবে।
- অন্য ওয়ারিসদের সাথে বৈষম্য (অসমতা) সৃষ্টি করা যাবে না — বিশেষত যদি বাবা অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করে শুধু এক ছেলেকে দেন, তবে তা শরীয়তসম্মত হলেও তা গুনাহ ও ঝগড়ার কারণ হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।" (সহীহ বুখারি: ২৫৮৬; সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হিবা; বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), হিবা অধ্যায়।
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
- নিয়ত নির্ধারণ করুন: বাবা টাকা দেওয়ার সময় কী নিয়ত ছিল — ঋণ, শরিকানা, নাকি দান? পারিবারিক সাক্ষী বা লিখিত প্রমাণ থাকলে ভালো।
- হিসাব সংরক্ষণ করুন: ব্যাবসায় বাবার দেওয়া টাকার পরিমাণ, তারিখ ও শর্ত লিখিতভাবে রাখুন।
- বাবার জীবদ্দশায় সমাধান করুন: বাবা জীবিত থাকতেই বিষয়টি স্পষ্ট করে নিন — এটি ঝগড়া ও গুনাহ থেকে বাঁচার সর্বোত্তম পথ।
- মৃত্যুর পর: বাবার তরকা হিসাব করে প্রথমে ঋণ-ওয়াসিয়্যাত পূর্ণ করুন, তারপর ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন করুন। প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য মুফতি/দারুল ইফতার সাথে পরামর্শ করুন।
সারসংক্ষেপ
- ঋণ হিসেবে দিলে: শুধু ঋণের টাকা (সুদ ছাড়া) বাবার তরকায় যোগ হবে; সব ওয়ারিস ভাগ পাবে। ব্যাবসার লাভের ভাগ পাবে না।
- শরিকানা হিসেবে দিলে: বাবার অংশ (মূলধন + লাভের অনুপাত) তরকায় যোগ হবে; সব ওয়ারিস ভাগ পাবে।
- দান হিসেবে দিলে: টাকা ভাইয়ের; তরকায় যোগ হবে না।
সুতরাং "ব্যাবসার ভাগ পাবে কি না" — এটি নির্ভর করে বাবার নিয়ত ও শর্তের উপর, শুধু টাকার পরিমাণের উপর নয়।
আল্লাহ ভালো জানেন।