মূর্তিকে স্রষ্টার মাধ্যম মনে করলে কি শিরক হয়?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7481
Questioner: Fatema Juthi
Question Asked: 28 Oct 2026, 12:54 PM
Reviewed & Published: 28 Oct 2026, 12:58 PM
Views: 49
Tokens: 5,309
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

৯/ মুর্তি পূজারকরা আগে মুর্তি বানিয়ে নিজেদের নিয়মকে মুর্তির নিয়ম বলে চালিয়ে দিত তাই মুর্তি পুজা তখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, অনুসারে ধর্ম পালন করে যদি মুর্তিকে স্রষ্টার একটি মাধ্যম বিবেচনা করে মুর্তি পূজা করা হয় তাহলে কেন মুর্তি পূজা নিষিদ্ধ হবে?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: (১) মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ কি শুধু ঐতিহাসিক (অর্থাৎ পূর্ববর্তীরা নিজের নিয়ম চালানোর কারণে)? (২) হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মূর্তিকে স্রষ্টার মাধ্যম মনে করে পূজা করলে তা কেন নিষিদ্ধ হবে?

উভয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হওয়ার মূল কারণ ঐতিহাসিক নয়, বরং আকীদাগত — এটি সরাসরি শিরক, আর ইসলামের মৌলিক আকীদা হলো তাওহীদ। শিরক এমন অপরাধ, যা আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করবেন না (যদি তাওবা না করা হয়)। মূর্তিকে "মাধ্যম" বা "শাফা'আতের অসীলা" মনে করাও শিরকের অন্তর্ভুক্ত; কুরআনে মুশরিকরা ঠিক এই অজুহাতই দিয়েছিল।


১. মূর্তিপূজা নিষিদ্ধের মূল দলিল: শিরক

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা: ৪৮)

وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ "আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না।" (সূরা ইউনুস: ১০৬)

إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ "নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।" (সূরা লুকমান: ১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৯৩; মুসনাদে আহমাদ)

হানাফি ফিকহের উসূল: ইমাম তাহাবী (রহ.) তাঁর আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ-তে বলেন, "আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই... তিনি ছাড়া কোনো মা'বূদ নেই।" ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর আল-ফিকহুল আকবার-এ তাওহীদই সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বর্ণিত। ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (১/৫৬ প্রসঙ্গ) শিরক ও কুফরের বিধান আলোচনা করেছেন এবং স্পষ্ট করেছেন যে, শিরক সব ইবাদত বাতিল করে দেয়।


২. "মূর্তি স্রষ্টার মাধ্যম" — এ অজুহাত নতুন নয়, কুরআনেই এর জবাব আছে

প্রশ্নে বলা হয়েছে, মূর্তিকে স্রষ্টার "মাধ্যম" মনে করে পূজা করা হয়। কুরআনে মুশরিকরা ঠিক এই যুক্তিই দিয়েছিল:

مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ "আমরা তাদের (মূর্তিদের) ইবাদত এজন্য করি না যে, তারা আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।" (সূরা যুমার: ৩)

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ (একই অর্থ, সূরা যুমার: ৩)

وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَٰؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ "তারা আল্লাহকে ছাড়া এমন বস্তুর ইবাদত করে, যা তাদের ক্ষতিও করে না, উপকারও করে না, আর বলে: এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী।" (সূরা ইউনুস: ১৮)

আল্লাহ তা'আলা এই যুক্তিকে সরাসরি খণ্ডন করেছেন:

قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ ۚ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ "বলুন: তোমরা কি আল্লাহকে জানাচ্ছ যা আসমান ও জমিনে নেই? তিনি পবিত্র ও তারা যাকে শরিক করে তা থেকে ঊর্ধ্বে।" (সূরা ইউনুস: ১৮)

অর্থাৎ "মাধ্যম" বা "শাফা'আতের অসীলা" বানিয়ে ইবাদত করা — এটাই শিরকের প্রকৃত রূপ। মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা যুমার ৩-এর তাফসীরে স্পষ্ট বলেন: মুশরিকরা মূর্তিকে আল্লাহর প্রতিনিধি বা মাধ্যম মনে করত, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এটিকে শিরক বলে ঘোষণা করেছেন — কারণ ইবাদতের কোনো অংশ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া যায় না।

মূল পার্থক্য: ইসলামে "অসীলা" বা "মাধ্যম" বৈধ কেবল তখনই, যখন অসীলা আল্লাহরই নির্ধারিত পদ্ধতিতে (যেমন: নিজের আমল, নেককার জীবিত ব্যক্তির দু'আ, আল্লাহর নাম-সিফাত) হয় — মূর্তি বা প্রতিমার মাধ্যমে নয়। মূর্তি নিজে অচেতন, শোনে না, দেখে না, উপকার-ক্ষতির ক্ষমতা রাখে না (সূরা শু'আরা: ৭২-৮৯; সূরা ফাতির: ১৪)। অচেতন বস্তুকে ইবাদতের মাধ্যম বানানো আল্লাহর নির্ধারিত পথের পরিপন্থী।


৩. "হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী" — ইসলামে ইবাদতের মানদণ্ড কুরআন-সুন্নাহ, অন্য ধর্মগ্রন্থ নয়

ইসলামে ইবাদতের বিধান নির্ধারিত হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশনা দ্বারা, কোনো মানুষের রচিত ধর্মগ্রন্থ বা ব্যাখ্যা দ্বারা নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ "তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করো, এবং তিনি ছাড়া অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ করো না।" (সূরা আ'রাফ: ৩)

ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ "এরপর আমরা তোমাকে একটি শরী'আতের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি; সুতরাং তা অনুসরণ করো এবং অজ্ঞদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।" (সূরা জাসিয়া: ১৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহীহ বুখারী: ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)

সুতরাং কোনো ইবাদতের বৈধতা প্রমাণের জন্য "অন্য ধর্মগ্রন্থে এভাবে বলা আছে" — এটি ইসলামি শরী'আতে কোনো দলিল নয়। ইবাদতের মানদণ্ড কেবল ওহী (কুরআন ও সুন্নাহ)।


৪. মূর্তিপূজা নিষিদ্ধের দলিল শুধু "পূর্ববর্তীদের নিয়ম পরিবর্তন" নয়

প্রশ্নে ধারণা করা হয়েছে, মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হয়েছে কেবল এ কারণে যে, পূর্ববর্তীরা মূর্তি বানিয়ে নিজেদের নিয়ম মূর্তির নামে চালাত। প্রকৃতপক্ষে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হওয়ার দলিল বহুবিধ:

  1. শিরক হওয়ার কারণে — এটি মূল কারণ (উপরের আয়াতসমূহ)।
  2. মূর্তি নিজে অপারগ — সূরা শু'আরা: ৭২-৮৯, সূরা ফাতির: ১৪, সূরা হজ: ৭৩।
  3. নবী ﷺ-এর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা — মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ মূর্তি ভাঙার নির্দেশ দেন এবং তাওহীদের ঘোষণা দেন (সহীহ বুখারী: ২৪৭৮ প্রসঙ্গ; সহীহ মুসলিম)। তিনি বলেন: "আমি সেই দ্বীন নিয়ে এসেছি যা ইবরাহীম (আ.)-এর দ্বীন — তাওহীদ।"
  4. শিরক সব নেক আমল বিনষ্ট করে — সূরা যুমার: ৬৫; সূরা আন'আম: ৮৮।

অর্থাৎ ঐতিহাসিক কারণ একটি দিক হতে পারে, কিন্তু মূল ও চূড়ান্ত কারণ আকীদাগত — শিরক।


৫. হিন্দু বন্ধু-প্রতিবেশীর প্রতি ইসলামের নির্দেশনা

এটি স্পষ্ট করা জরুরি: ইসলামে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি জুলুম বা জবরদস্তি নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ "দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।" (সূরা বাকারা: ২৫৬)

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ "তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।" (সূরা কাফিরুন: ৬)

হিন্দু প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মীর সাথে সদাচরণ, তাদের জান-মালের হেফাজত ইসলামের নির্দেশ। কিন্তু আকীদার প্রশ্নে ইসলাম স্পষ্ট — শিরক শিরকই, তা যে নামেই হোক। কাউকে জোর করে ইসলামে আনা ইসলামের বিধান নয়; কেবল সত্য ব্যাখ্যা করা এবং নিজে শিরক থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য।


সারসংক্ষেপ

  • মূর্তিপূজা নিষিদ্ধের মূল কারণ শুধু ঐতিহাসিক নয়, বরং এটি শিরক — আর শিরক আল্লাহ ক্ষমা করেন না (সূরা নিসা: ৪৮)।
  • মূর্তিকে "স্রষ্টার মাধ্যম" বা "শাফা'আতের অসীলা" মনে করা — এ অজুহাত কুরআনে মুশরিকদেরই ছিল (সূরা যুমার: ৩; ইউনুস: ১৮), এবং আল্লাহ তা খণ্ডন করেছেন।
  • ইবাদতের মানদণ্ড কুরআন-সুন্নাহ, অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় (সূরা আ'রাফ: ৩; জাসিয়া: ১৮)।
  • ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি জবরদস্তি করে না, কিন্তু তাওহীদের আকীদা স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয়।

হানাফি কিতাবের রেফারেন্স: আল-ফিকহুল আকবার (ইমাম আবু হানীফা), আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ (ইমাম তাহাবী), রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী, শিরক-কুফর অধ্যায়), মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী, সূরা যুমার ৩-এর তাফসীর), ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী), বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী, আকীদা অধ্যায়)।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.