আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে বাজে কথা বা ওয়াসওয়াসা আসলে ঈমানের কী হবে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 7450
Questioner: Momena
Question Asked: 27 Oct 2026, 05:22 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 06:36 PM
Views: 8
Tokens: 6,087
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)আমার আল্লাহ নবীকে নিয়ে মনে মনে বাজে কথা চলে আসে। তখন আমি নখ কামড়াতে কামড়াতে বলি, মানে চিন্তা করতে থাকি, বাজে কথা আসলেই আমি বলি আল্লাহ মহান। আবার নবীকে নিয়ে আসলে তখন বলি নবী মহান। পরে আমি এক সময় হঠাৎ বলে ফেলি তারা দুইজন ই ভালো। এখন আমি শুধু ভালো বলছিলাম নাকি ভালো মানুষ বলছিলাম আমার মনে পড়ে না। আমি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে মাফ চাইছি। এখন আমার ঈমানে কি কোনো সমস্যা হবে?

২) ভালো বলছি নাকি মানুষ ও বলছি মানে তারা দুইজন এ ভালো / নাকি ভালো মানুষ ও বলছি,
এটা যদি মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি তাহলে কোনো সমস্যা হবে?

৩) মানুষ তো সবাইকে বলা যায় না। এই জন্যই আমার টেনশন হচ্ছে। যদি আমি মুখে উচ্চারণ করে মানুষ ও বলে থাকি তাহলে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে" মানুষ বলা "এটা তো আমি বিশ্বাস করি না। তাই যদি ভুলে মুখে উচ্চারণ করে বলে ফেলি। বলে থাকি। তাহলে আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এগুলো ঈমান-সংক্রান্ত বিষয়। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখতে হবে: শয়তান মুমিনদের অন্তরে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) সৃষ্টি করে ঈমান নিয়ে সন্দেহ ও অস্থিরতা তৈরি করে। এ ধরনের ওয়াসওয়াসা দ্বারা আতঙ্কিত হওয়া বা বারবার ঈমান নিয়ে সন্দেহ করা শয়তানের কাম্য। সাহাবায়ে কেরামও (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এ ধরনের ওয়াসওয়াসার কথা নবী করিম ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, এটা তো সুস্পষ্ট ঈমানের লক্ষণ (অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা যত বেশি আসবে, ততই ঈমানের দৃঢ়তা বাড়বে, ইনশাআল্লাহ)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩২)

এখন আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর:


১) বাজে কথা আসলে "আল্লাহ মহান" বা "নবী মহান" বলা এবং "তারা দুইজনই ভালো" বলে ফেলা:

উত্তর: মনে মনে বাজে কথা আসা বা ওয়াসওয়াসা আসা আপনার ইচ্ছাধীন নয়, তাই এতে গুনাহ হবে না। তবে আপনি যখন বাজে কথা আসার পর "আল্লাহ মহান" বা "নবী মহান" বলে শয়তানকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন, এটি ভালো কাজ। কিন্তু আপনি যদি "তারা দুইজনই ভালো" বলে ফেলেন, তাহলে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন।

ঈমানের মূলনীতি: আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকর্তা ও রব, আর নবী ﷺ সৃষ্টি ও বান্দা। উভয়কে একই কাতারে ফেলে "দুইজনই ভালো" বলা ঈমানের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এতে আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে সমতা (তুলনা) সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে জানো না..." (সূরা আয-যুমার: ৬৭)। তবে আপনি যদি শুধু "ভালো" বলে থাকেন (যেমন: আল্লাহ ভালো, নবী ভালো), তবে এটি আল্লাহর জন্য "ভালো" বলা এবং নবীর জন্য "ভালো" বলা—এটি সরাসরি কুফরি নয়, তবে নবীর ক্ষেত্রে "ভালো" বলার চেয়ে "মহান" বা "সম্মানিত" বলা উত্তম। কিন্তু আপনি যদি "ভালো মানুষ" বলে থাকেন, তবে আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা স্পষ্ট কুফরি (নাউজুবিল্লাহ), কারণ আল্লাহ মানুষ নন, তিনি সৃষ্টির অতীত। আর নবীর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা সঠিক (তিনি মানুষ ছিলেন)। কিন্তু আল্লাহ ও নবীকে একসাথে "ভালো মানুষ" বলা কুফরি।

আপনার করণীয়: আপনি বলেছেন, "আমার মনে পড়ে না আমি শুধু ভালো বলছিলাম নাকি ভালো মানুষ বলছিলাম।" যেহেতু সন্দেহ রয়েছে, তাই আপনি তাওবা ও ইস্তিগফার করেছেন, এটি যথেষ্ট। সন্দেহের কারণে আপনি কাফির হয়ে যাবেন না, বরং আপনি মুমিনই আছেন, ইনশাআল্লাহ। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকুন এবং মুখে "আল্লাহ মহান" বা "নবী মহান" বলার সময় সতর্ক থাকুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন, যারা অজ্ঞতাবশত গুনাহ করে এবং শীঘ্রই তাওবা করে।" (সূরা আন-নিসা: ১৭)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন, কুফরি বা ঈমান-বিরোধী কথা যদি ভুলবশত বা সন্দেহের সাথে মুখ থেকে বের হয়, তবে তাওবা করলে ঈমান বহাল থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ২২৪-২২৫)


২) "তারা দুইজনই ভালো" বা "ভালো মানুষ" মুখে উচ্চারণ করলে কি সমস্যা হবে?

উত্তর:

  • "তারা দুইজনই ভালো" বললে: এটি সরাসরি কুফরি নয়, তবে আল্লাহ ও নবীর মধ্যে সমতা সৃষ্টি করার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এটি বলা থেকে বিরত থাকুন। যদি ভুলে বলে ফেলেন, তবে তাওবা করুন।
  • "তারা দুইজনই ভালো মানুষ" বললে: এটি স্পষ্ট কুফরি, কারণ আল্লাহকে "মানুষ" বলা কুফরি। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তিনি সৃষ্টি করেন, কিন্তু তিনি সৃষ্ট নন; তিনি কারও সদৃশ নন।" (সূরা আশ-শূরা: ১১)। আল্লাহকে মানুষের সাথে তুলনা করা বা মানুষ বলা ঈমান ভঙ্গের কারণ। তবে আপনি বলেছেন আপনি বিশ্বাস করেন না, শুধু ভুলে মুখে উচ্চারণ করেছেন। ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কুফরি কথা মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান ভঙ্গ হয় না, যদি অন্তরে বিশ্বাস না থাকে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করে—কিন্তু যে বাধ্য হয়, অথচ তার অন্তর ঈমানে দৃঢ়—সে নয়; বরং যে ব্যক্তি কুফরির জন্য মন খুলে দেয়, তাদের উপর আল্লাহর গজব..." (সূরা আন-নাহল: ১০৬)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, জবরদস্তি বা ভুলের কারণে কুফরি কথা মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান ভঙ্গ হয় না, যদি অন্তরে বিশ্বাস থাকে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ২২৩)

তবে সতর্কতা: যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহকে "মানুষ" বলে, তবে ঈমান ভঙ্গ হবে। আপনি যেহেতু বিশ্বাস করেন না, তাই ভুলে বলা ক্ষতিকর নয়, তবে তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।


৩) "মানুষ" বলে থাকলে ঈমানে সমস্যা হবে?

উত্তর: আপনি বলেছেন, "মানুষ তো সবাইকে বলা যায় না।" হ্যাঁ, আল্লাহকে "মানুষ" বলা যায় না, এটি কুফরি। কিন্তু আপনি যদি ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলে ফেলেন, তবে আপনার ঈমানে সমস্যা হবে না, কারণ আপনি অন্তরে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে বা আল্লাহকে মানুষের সাথে তুলনা করে বলেন, তবে ঈমান ভঙ্গ হবে। আপনি যেহেতু ভুলে বলেছেন এবং বিশ্বাস করেন না, তাই তাওবা করলেই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন না তোমাদের ভুলের জন্য, কিন্তু তিনি শাস্তি দেবেন তোমাদের অন্তরের ইচ্ছার জন্য।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৫)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুফরি কথা যদি ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ থেকে বের হয়, তবে ঈমান ভঙ্গ হয় না। (আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৪; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৮)


৪) আল্লাহর ক্ষেত্রে "মানুষ" বলা বিশ্বাস না করলেও ভুলে মুখে উচ্চারণ করলে কি ঈমানে সমস্যা হবে?

উত্তর: না, সমস্যা হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ ঈমানের মূল বিষয় হলো অন্তরের বিশ্বাস। আপনি অন্তরে বিশ্বাস করেন না যে আল্লাহ মানুষ, তাই ভুলে মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান ভঙ্গ হবে না। তবে তাওবা ও ইস্তিগফার করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমাদের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ তা জানেন; সুতরাং তাকে ভয় করো।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩৫)

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: আপনি বারবার এ ধরনের ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। আপনি যখনই বাজে কথা আসে, তখন "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং আল্লাহর যিকির করুন। নবী ﷺ বলেছেন: "শয়তান আদম সন্তানের অন্তরে আসে এবং ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে; যখন আল্লাহর যিকির করে, তখন শয়তান পলায়ন করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০৩)


সারসংক্ষেপ ও করণীয়:

১. মনে মনে বাজে কথা আসা আপনার ইচ্ছাধীন নয়, এতে গুনাহ নেই। তবে শয়তানকে প্রতিহত করতে আল্লাহর যিকির করুন। ২. "তারা দুইজনই ভালো" বলা থেকে বিরত থাকুন; যদি ভুলে বলে ফেলেন, তাওবা করুন। "ভালো মানুষ" বলা আল্লাহর ক্ষেত্রে কুফরি, তবে ভুলে বললে ঈমান ভঙ্গ হয় না, যদি অন্তরে বিশ্বাস না থাকে। ৩. আল্লাহকে "মানুষ" বলা কুফরি, কিন্তু ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বললে ঈমান ভঙ্গ হয় না। তাওবা করুন। ৪. আপনি মুমিন আছেন, ইনশাআল্লাহ। বারবার ঈমান নিয়ে সন্দেহ করবেন না; এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং নিয়মিত ইস্তিগফার ও দরুদ শরিফ পড়ুন।

দোয়া: আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং ঈমানের উপর দৃঢ় রাখুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.