প্র‍য়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য লোন নেয়া যাবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7409
Questioner: Sabrina Akter Nadi
Question Asked: 26 Oct 2026, 05:47 PM
Reviewed & Published: 26 Oct 2026, 06:11 PM
Views: 30
Tokens: 6,046
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কারো যদি বেতনের টাকা মাস শেষে না থাকে, ধার করে চলতে হয়, অফিস দূরে হওয়ার কারণে যাতায়াতে কষ্ট হয় বলে একটা মোটরসাইকেল কেনা জরুরি মনে করে লোন নেয়া যাবে? লোনের এপ্লাই করার পর অবশ্য তার শ্বশুর কিনে দেয়। কিন্তু ড্রাইভিং লাইসেন্স, আরও প্রয়োজনীয় কিছু সংসারের জন্য কেনার জন্য লোন টা নেয়া জায়েজ হবে তার জন্য?
২. আর যদি জায়েজ না হয়, তাহলে ওই টাকা দিয়ে কাউকে কিছু গিফট করলে নেয়া যাবে? ওই টাকা দিয়ে খাবার কিনলে সেই খাবার খাওয়া যাবে?

Answer

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য লোন নেওয়া এবং সুদি লোনের টাকা দিয়ে গিফট/খাবার কেনার হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—(১) বেতনের টাকা মাস শেষে না থাকলে, অফিস দূরে হওয়ায় যাতায়াতের কষ্ট লাঘবের জন্য মোটরসাইকেল কেনা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য সুদি লোন (ঋণ) নেওয়া জায়েজ কি না; (২) যদি জায়েজ না হয়, তবে সেই সুদের টাকা দিয়ে কাউকে গিফট করলে বা খাবার কিনে খেলে হুকুম কী?


১ম অংশ: সুদি লোন নেওয়ার হুকুম

মূলনীতি: সুদ সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ

কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ . فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। আর যদি না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ করো।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮-২৭৯)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও তার দুই সাক্ষীর উপর লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহে)।" (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮; মুসনাদে আহমাদ; সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৩)

হানাফি ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)-এ উল্লেখ আছে, সুদি লেনদেন সম্পূর্ণ নাজায়েজ; প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে কেউ সুদি ঋণ নিলে তা গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য নয়—তবে চরম বাধ্যবাধকতা (যেখানে প্রাণনাশের আশঙ্কা) ভিন্ন বিষয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু, অধ্যায়: রিবা)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া)-তে বলা হয়েছে: "الربا حرام بالكتاب والسنة والإجماع" — সুদ কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা হারাম। (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল বুয়ু, ফাসল ফির রিবা)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-তে স্পষ্ট ফতোয়া আছে: ব্যাংক/সুদি ঋণ নিয়ে বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা—যেকোনো প্রয়োজনে নেওয়া জায়েজ নয়; এতে সুদ ও আল্লাহর সাথে যুদ্ধের ঘোষণায় লিপ্ত হওয়ার গুনাহ হয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, রিবা অধ্যায়)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)-তে ব্যাংকের সুদি লোনকে "قرض ربوي" হিসেবে চিহ্নিত করে স্পষ্টভাবে নাজায়েজ বলা হয়েছে; ইসলামি ব্যাংকের মুশারাকা/মুদারাবা/ইজারা ইত্যাদি বৈধ বিকল্প গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, ব্যাংকিং অধ্যায়)

প্রশ্নের নির্দিষ্ট দৃষ্টান্তে প্রয়োগ

১. মোটরসাইকেল কেনা: অফিস দূরে হওয়া, যাতায়াতে কষ্ট—এগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে "চরম বাধ্যবাধকতা (ضرورة)" নয়; বরং এটি "প্রয়োজন (حاجة)" মাত্র। হানাফি উসুল অনুযায়ী, حاجة (প্রয়োজন) কখনো حرام (সুদ)-কে হালাল করে না। বাস/রিকশা/শেয়ার-ভিত্তিক যানবাহন ব্যবহার করে ধৈর্য ধরা বা হালাল উপায়ে সঞ্চয় করে পরে কেনা কর্তব্য। সুতরাং মোটরসাইকেল কেনার জন্য সুদি লোন নেওয়া জায়েজ নয়। ২. ড্রাইভিং লাইসেন্স ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস: এগুলোও "প্রয়োজন" পর্যায়ের; সুদি লোন নেওয়ার বৈধ ওজর নয়। বরং হালাল উপায়ে (আত্মীয়ের নিকট সুদমুক্ত ঋণ, বিক্রয়-বায়ু বিক্রয়, ইসলামি ব্যাংক/সমবায়ের শরীয়াহসম্মত স্কিম) ব্যবস্থা করা আবশ্যক। ৩. শ্বশুর কর্তৃক কিনে দেওয়া: শ্বশুর যদি নিজের হালাল টাকা থেকে কিনে দেন, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ; এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শ্বশুরও যদি সুদি লোন নিয়ে কিনে দেন, তবে তা নাজায়েজ হবে—তবে গ্রহীতা (প্রশ্নকারী) সরাসরি সুদি চুক্তির পক্ষ না হলে তার উপর সুদের গুনাহ বর্তাবে না; কিন্তু শ্বশুরের উপর গুনাহ বর্তাবে। ৪. লোনের আবেদন করার পর শ্বশুর কিনে দেওয়া: আবেদন করাই যদি সুদি চুক্তি সম্পাদন না হয় এবং শ্বশুর হালাল টাকায় কিনে দেন, তবে তা জায়েজ; তবে ভবিষ্যতে সুদি লোনের আবেদন থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

সারকথা: প্রশ্নে উল্লিখিত কোনো প্রয়োজনের জন্যই সুদি লোন নেওয়া জায়েজ নয়। এটি কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধের ঘোষণায় লিপ্ত হওয়ার সমতুল্য। হালাল বিকল্প অবলম্বন করা ফরজ।


২য় অংশ: সুদি লোনের টাকা দিয়ে গিফট বা খাবার কেনার হুকুম

মূলনীতি: সুদের টাকা "خبيث" (অপবিত্র/মালখবিস) — তবে মালিকানা বিতর্কিত

হানাফি ফিকহে সুদি লোনের টাকা সম্পর্কে দুটি দিক বিবেচনা করতে হয়:

ক) সুদি ঋণ নেওয়ার চুক্তি: সুদি ঋণ নেওয়া নিজেই হারাম। ঋণগ্রহীতা যখন সুদি ঋণ নেয়, তখন সে একটি হারাম চুক্তিতে লিপ্ত হয় এবং সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ হয়। কিন্তু ঋণগ্রহীতার হাতে আসা মূল টাকা (principal) তার মালিকানায় আসে—এবং হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতা মূল টাকার মালিক হয়ে যায় (قبض)। সুতরাং সেই টাকা দিয়ে হালাল জিনিস কেনা ও খাওয়া—নিজের মালিকানাধীন টাকা দিয়ে কেনা হিসেবে—নিজের জন্য জায়েজ; তবে টাকা অর্জনের মাধ্যম হারাম হওয়ায় গুনাহ বর্তাবে।

খ) তবে সতর্কতা: ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন, সুদি ঋণ নেওয়া ব্যক্তি গুনাহগার; কিন্তু ঋণগ্রহীতার হাতে আসা টাকা "মালে খাবিস" (অপবিত্র সম্পদ) হিসেবে বিবেচিত হলেও তা তার মালিকানায় প্রবেশ করে এবং সে তা দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারে; তবে উত্তম হলো তাওবা করে সেই টাকা থেকে মুক্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সুদ থেকে বিরত থাকা। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু, রিবা অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

গ) গিফট দেওয়া: নিজের মালিকানাধীন টাকা দিয়ে কাউকে গিফট করা—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জায়েজ; কারণ গিফটের বৈধতা নির্ভর করে টাকার মালিকানার উপর, অর্জনের মাধ্যমের উপর নয় (যদিও মাধ্যম হারাম হলে গুনাহ আলাদা)। তবে উত্তম ও সতর্ক পন্থা হলো—সুদি ঋণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং তাওবা করা। ফাতাওয়া উসমানি-তে স্পষ্ট আছে, সুদি ঋণ নেওয়া ব্যক্তির উপর আবশ্যক হলো তাওবা ও ভবিষ্যতে বিরত থাকা; তার হাতে আসা টাকা দিয়ে প্রয়োজন মেটানো জায়েজ, তবে তা "حلال طيب" নয় বরং "خبيث" হিসেবে গণ্য। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, রিবা অধ্যায়)

ঘ) খাবার কেনা ও খাওয়া: নিজের মালিকানাধীন টাকা দিয়ে হালাল খাবার কিনে খাওয়া জায়েজ; খাবার নিজেই হালাল হলে তা খাওয়া জায়েজ। সুদি টাকা দিয়ে কেনা হালাল খাবার "হারাম" হয়ে যায় না—কারণ হারাম হলো টাকা অর্জনের মাধ্যম, খাবার নয়। তবে গুনাহ বর্তাবে সুদি ঋণ নেওয়ার উপর।

চূড়ান্ত ফতোয়া (خلاصة الفتوى)

১. মোটরসাইকেল, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য সুদি লোন নেওয়া জায়েজ নয়। এটি কবিরা গুনাহ; হালাল বিকল্প (সুদমুক্ত ঋণ, ইসলামি ব্যাংকিং, সমবায়, ধৈর্য ও সঞ্চয়) অবলম্বন করা ফরজ। ২. শ্বশুর হালাল টাকায় কিনে দিলে গ্রহণ করা জায়েজ। শ্বশুর সুদি লোন নিলে তার উপর গুনাহ, গ্রহীতার উপর নয় (সে সরাসরি চুক্তির পক্ষ না হলে)। ৩. সুদি লোনের টাকা দিয়ে গিফট বা হালাল খাবার কেনা—নিজের মালিকানার ভিত্তিতে জায়েজ, তবে মাধ্যম হারাম হওয়ায় গুনাহ বর্তাবে; উত্তম হলো তাওবা ও হালাল উপায়ে ঋণ পরিশোধ। সুদি টাকা সদকা হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুদ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকে হালাল উপার্জনে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.