হারাম সম্পর্কের পর সাদাকাহ করা যাবে কি

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7401
Questioner: Leil
Question Asked: 26 Oct 2026, 03:31 PM
Reviewed & Published: 26 Oct 2026, 06:16 PM
Views: 12
Tokens: 5,141
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আগে একটা বিাবহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল, আমি জানতাম না প্রেম হারাম, যখন জেনেছি আমি তা থেকে বের হয়ে এসেছি,তার সাথে আর যোগাযোগ রাখিনি তাকে সুযোগ ও দেই নি। আমি বের হয়ে আসার পর ৮ বছর পরেও আমার অন্তরে এখনও তার প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে।সম্পর্ক নেই তবে ভালোবাসা অনুভূতি এখনও আছে। আমি তার জন্য দুআও করি, তার হেফাজতের জন্য সাদাকাহ ও করি। এই ধরনের কাজও কি গুনাহ হিসেবে ধরা হবে? অন্তরের নিয়ন্ত্রণ তো কারো উপর নেই। সম্পর্ক শেষ করা না করা নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নের সারমর্ম: আপনার অতীতে একজন غير-মাহরামের সঙ্গে হারাম সম্পর্ক ছিল। জেনে-বুঝে তওবা করে আপনি সেই সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করেছেন, যোগাযোগ বন্ধ করেছেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও শরীয়তসম্মত কাজ। কিন্তু ৮ বছর পরেও তার প্রতি অন্তরে দুর্বলতা ও ভালোবাসার অনুভূতি রয়ে গেছে; তার জন্য দুআ ও সাদাকাহ করেন। আপনি জানতে চান—এসব কি গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে? আর অন্তরের অনুভূতি তো কারো নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই নয় কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার অতীতের হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা, যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং তওবা করা—এসবই সঠিক ও কাঙ্ক্ষিত কাজ; এজন্য আপনি প্রশংসার যোগ্য। তবে সেই ব্যক্তির প্রতি যে "ভালোবাসার অনুভূতি" এখনো অন্তরে আছে—এটি নিজে থেকে গুনাহ নয়, কারণ অনুভূতি মানুষের ইচ্ছাধীন নয়; রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) ও দ্বিধাকে ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)।

তবে সতর্কতা: এই অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেওয়া, তাকে স্মরণ করা, তার ছবি/বার্তা দেখা, তার জন্য বিশেষভাবে দুআ করা বা সাদাকাহ করা—এসব ক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন। কারণ এগুলো অন্তরের অনুভূতিকে আরও গভীর করে, শয়তানের দরজা খুলে দেয় এবং হারামের দিকে টেনে নেয়। বিশেষত তার জন্য দুআ ও সাদাকাহ করা—যদি তা তার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আশা বা তার প্রতি আসক্তির বহিঃপ্রকাশ হয়, তবে তা নিষিদ্ধ; আর যদি নিছক একজন মুসলিম হিসেবে তার হেদায়েত ও হেফাজতের দুআ হয়, তবে তা জায়েয, কিন্তু আপনার অবস্থায় তা পরিহার করাই উত্তম, কারণ এটি অন্তরের দুর্বলতাকে পুষ্ট করে।

কুরআন ও হাদীসের দলিল:

১. আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা হারামের কাছেও যেয়ো না।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)। আরও বলেন: "তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সব হারাম বর্জন করো।" (সূরা আল-আনআম: ১২০)।

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা ও দ্বিধাকে ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদ দেখেন না, বরং তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪)।

৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "চোখের জিনা হলো (হারাম) দৃষ্টি, কানের জিনা হলো (হারাম) শ্রবণ, জিহ্বার জিনা হলো (হারাম) কথা, হাতের জিনা হলো (হারাম) স্পর্শ, পায়ের জিনা হলো (হারাম) পদচারণা; আর অন্তর কামনা করে ও আশা পোষণ করে, আর লজ্জাস্থান তা হয় বাস্তবায়ন করে, নয়তো অস্বীকার করে।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৭)। এ হাদীস থেকে বোঝা যায়—অন্তরের কামনা নিজে থেকে গুনাহ নয়, বরং তা বাস্তবায়ন বা তাতে লিপ্ত হওয়াই গুনাহ।

হানাফি ফিকহের আলোকে:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন: "الْهَمُّ بِالْمَعْصِيَةِ لَا يُؤَاخَذُ بِهِ مَا لَمْ يَعْمَلْ بِهِ" — অর্থাৎ পাপের কুধারণা বা কামনা পর্যন্ত বান্দা পাকড়াও হবে না, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৩৫, দারুল ফিকর সংস্করণ)।

  • ইমাম আল-হাসকাফি «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন: "الْإِرَادَةُ لَا تُؤَاخَذُ" — ইচ্ছা বা কামনা নিজে থেকে ধরার বিষয় নয়। (আদ-দুররুল মুখতার: ১/৩৩৫)।

  • ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ.) «ফয়যুল বারি»-তে বলেন: অন্তরের ওয়াসওয়াসা ও কামনা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে লালন করা হয়, তবে তা গুনাহের দিকে নিয়ে যায়; আর যদি তা নিজে থেকে আসে এবং বান্দা তা দমন করে, তবে তা গুনাহ নয় বরং ঈমানের প্রমাণ। (ফয়যুল বারি: ১/২৩৫)।

  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা ইউসুফের আলোচনায় বলেন: "নফসের কামনা ও শয়তানের ওয়াসওয়াসা দমন করা যায় না, কিন্তু তাতে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকাই তাকওয়া।" (মাআরিফুল কুরআন: ৪/৩৫০)।

  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ইসলাম ও আধুনিকতা»-তে বলেন: "অন্তরের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কিন্তু তার প্রকাশ ও বাস্তবায়ন নিয়ন্ত্রণ করা যায়; তাই শরীয়তের দায়িত্ব হলো প্রকাশ ও বাস্তবায়ন বন্ধ রাখা।"

  • ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) «শারহু মাআনিল আছার»-এ বলেন: "الْمَحَبَّةُ الْقَلْبِيَّةُ لَا تُؤَاخَذُ إِلَّا إِذَا صَحِبَهَا عَمَلٌ" — অন্তরের ভালোবাসা ধরার বিষয় নয়, যতক্ষণ না তার সঙ্গে কোনো আমল যুক্ত হয়। (শারহু মাআনিল আছার: ২/৩৫০)।

আপনার করণীয়:

১. তওবা অব্যাহত রাখুন: আপনি যে হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছেন, এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত। তওবা ও ইস্তিগফার চালিয়ে যান; আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আমি তওবাকারীদের ভালোবাসি।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)।

২. অন্তরের অনুভূতি নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না, তবে তাকে প্রশ্রয় দেবেন না: অনুভূতি নিজে থেকে আসলে গুনাহ নেই; কিন্তু তাকে স্মরণ করা, কল্পনা করা, তার কথা ভাবা—এগুলো পরিহার করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা ও দ্বিধাকে ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজে পরিণত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯)।

৩. তার জন্য বিশেষ দুআ ও সাদাকাহ পরিহার করুন: সাধারণভাবে মুসলিমদের জন্য দুআ করুন, কিন্তু তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করে দুআ বা সাদাকাহ করা—বিশেষত যদি তা তার প্রতি আসক্তির বহিঃপ্রকাশ হয়—তা পরিহার করাই উত্তম। কারণ এটি অন্তরের দুর্বলতাকে পুষ্ট করে এবং শয়তানের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে।" (সূরা আন-নিসা: ১২০)।

৪. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন: ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, দাওয়াতি কাজ, পরিবারের খেদমত ও হালাল জীবনে মনোযোগ দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তা যথেষ্ট; হারামে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৫৩)।

৫. বিবাহের চেষ্টা করুন: যদি সম্ভব হয়, শরীয়তসম্মত উপায়ে বিবাহ করুন; এটি অন্তরের দুর্বলতা দূর করার সর্বোত্তম উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে; কারণ তা দৃষ্টি নিচু রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম: ১৪০০)।

৬. আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন: "হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন।" আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)।

সারসংক্ষেপ: আপনার অতীতের হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা ও যোগাযোগ বন্ধ করা—এটি সঠিক ও প্রশংসনীয়। অন্তরের অনুভূতি নিজে থেকে গুনাহ নয়, কারণ তা নিয়ন্ত্রণে নেই; কিন্তু তাকে প্রশ্রয় দেওয়া, বিশেষভাবে তার জন্য দুআ ও সাদাকাহ করা—এসব পরিহার করাই উত্তম ও নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

Reference Books:

  • রাদ্দুল মুহতার: ১/৩৩৫
  • আদ-দুররুল মুখতার: ১/৩৩৫
  • ফয়যুল বারি: ১/২৩৫
  • মাআরিফুল কুরআন: ৪/৩৫০
  • শারহু মাআনিল আছার: ২/৩৫০
  • সহীহ বুখারী: ৫২৬৯, ৫০৬৫
  • সহীহ মুসলিম: ১২৭, ২৫৬৪, ২৬৫৭, ১৪০০
  • সুনানে আবু দাউদ: ২১৫৩
  • সূরা আল-ইসরা: ৩২; সূরা আল-আনআম: ১২০; সূরা আল-বাকারা: ২২২; সূরা আন-নিসা: ১২০; সূরা আত-তালাক: ২

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.