মৃত বাবাকে স্বপ্নে দেখা এবং বাবা মায়ের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ—ইসলামী দৃষ্টিতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
বাবা মারা গেছে,মা বেঁচে আছে।
এখন তার বড় মেয়ে স্বপ্ন দেখেছে বাবাকে অনেক চুমো খাচ্ছে আর বাবা বলছে তোমার আম্মুর সাথে আমাকে একটু দেখা করাও তো।আব্বুর পিছনে ছিল দাদি।
এই স্বপ্নের দেখার মানে কি জানতে চাই ইং শা আল্লহ। আর কি করণীয়।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বপ্ন ইসলামী শরীয়তে কোনো বিধান বা হুকুমের দলীল নয়; এটি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনার একটি মাধ্যম হতে পারে। মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা এবং তার কথা শোনা—এগুলোকে সরাসরি “আলামত” বা ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। তবে স্বপ্নে মৃত বাবার মায়ের (আম্মুর) সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ পাওয়াকে স্নেহ-মমতা ও আত্মিক সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে বোঝা যায়। করণীয় হলো: বাবার জন্য বেশি বেশি দুআ ও ইস্তিগফার করা, সদকা করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো, মায়ের খেদমত করা এবং স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো নতুন ধর্মীয় কাজ বা বিশ্বাস তৈরি না করা। প্রয়োজনে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
বিস্তারিত উত্তর
১. স্বপ্নের শরয়ী গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالرُّؤْيَا السَّوْءُ مِنَ الشَّيْطَانِ» “সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর মন্দ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
অন্য হাদীসে এসেছে:
«الرُّؤْيَا ثَلَاثَةٌ: رُؤْيَا مِنَ اللَّهِ، وَرُؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ، وَرُؤْيَا مِمَّا يُحَدِّثُ بِهِ الرَّجُلُ نَفْسَهُ» “স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে এবং মানুষের নিজের মনের কল্পনা।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩
সুতরাং স্বপ্নকে শরীয়তের হুকুম বা অদৃশ্যের নিশ্চিত খবর হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ইমাম ইবন আবিদীন রহ. বলেন, স্বপ্ন দ্বারা শরয়ী বিধান প্রমাণিত হয় না; তবে সৎ স্বপ্ন সান্ত্বনা ও সুসংবাদের কারণ হতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪২ প্রসঙ্গ)
২. মৃতকে স্বপ্নে দেখা
মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব; সাহাবায়ে কিরাম থেকেও এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে স্বপ্নে মৃতের কথাকে সরাসরি ওহী বা হুকুম মনে করা ঠিক নয়। ইমাম ইবন সীরীন রহ. স্বপ্নের ব্যাখ্যায় সতর্কতা অবলম্বন করতেন এবং স্বপ্নকে কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত অর্থে গ্রহণ করতে নিষেধ করতেন। (তাফসীরে ইবন সীরীন, স্বপ্নের আদব অধ্যায়)
আপনার স্বপ্নে বাবা বলেছেন, “তোমার আম্মুর সাথে আমাকে একটু দেখা করাও তো”—এটি মূলত পারিবারিক স্নেহ, মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা এবং সন্তানের মনে বাবার প্রতি টান—এসবের প্রতিফলন হতে পারে। দাদির পিছনে থাকা স্বপ্নে বিশেষ কোনো শরয়ী অর্থ নির্ধারণ করা যায় না; এটি স্বপ্নের দৃশ্যপট মাত্র। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়।
৩. করণীয়
১. বাবার জন্য দুআ ও ইস্তিগফার:
«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ» “হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি রহম করুন, তাকে নিরাপত্তা দিন এবং তাকে মাফ করুন।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৬৩ (জানাজার দুআ)
২. সদকা করা: বাবার পক্ষ থেকে সদকা করুন; বিশেষত অভাবীকে খাবার দেওয়া, দান করা। রাসূল ﷺ বলেছেন, মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা তার জন্য উপকারী। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৭৬০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০০৪)
৩. কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো: হানাফী মাযহাবে মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত ও দুআর সওয়াব পৌঁছানো বৈধ ও উপকারী। (রাদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৬৬)
৪. মায়ের খেদমত ও সান্ত্বনা: মাকে ভালোভাবে দেখাশোনা করুন, তার সাথে সদাচরণ করুন। স্বপ্নের কারণে মাকে ভয় দেখানো বা অস্থির করা ঠিক নয়।
৫. স্বপ্নের ভিত্তিতে নতুন আমল তৈরি না করা: স্বপ্নে বলা হয়েছে বলে বিশেষ কোনো ইবাদত, রীতিনীতি বা মানত করা শরীয়তে প্রমাণিত নয়। বরং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করুন।
৬. স্বপ্ন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা: সৎ স্বপ্নকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা মনে করে শুকরিয়া আদায় করুন; খারাপ বা বিভ্রান্তিকর কিছু মনে হলে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না এবং কারও কাছে জোর করে ব্যাখ্যা চাইবেন না।
৪. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে
- মৃতের জন্য দুআ, ইস্তিগফার, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো—এসব শরীয়তসম্মত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৬৬; রাদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)
- স্বপ্নকে শরয়ী দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না; স্বপ্নের ভিত্তিতে ওয়াজিব বা নতুন বিধান সাব্যস্ত হয় না। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪২ প্রসঙ্গ; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৩৩০ প্রসঙ্গ)
- মৃতের রুহ ও জীবিতদের সম্পর্ক আল্লাহরই জানা; আমরা শুধু দুআ ও আমল করি।
উপসংহার:
এই স্বপ্নকে ভয় বা দুশ্চিন্তার কারণ মনে করবেন না। এটি স্নেহ-মমতার প্রতিফলন হতে পারে। বাবার জন্য দুআ, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত করুন; মায়ের খেদমত করুন; স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো নতুন ধর্মীয় রীতি তৈরি করবেন না। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
والله أعلم بالصواب