আসসালামু আলাইকুম, আমি একজন মেয়ে বয়স ২৮। আমার বাবা নেই মা আছেন। আমার মা আর আমি একা থাকি। আমার বড়

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7369
Questioner: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
Question Asked: 25 Oct 2026, 08:34 AM
Reviewed & Published: 25 Oct 2026, 09:53 AM
Views: 16
Tokens: 8,287
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি একজন মেয়ে বয়স ২৮। আমার বাবা নেই মা আছেন। আমার মা আর আমি একা থাকি। আমার বড়ো বোন আছে ওর বিয়ে হয়েছে এবং বিদেশে থাকে। আমি একজন কে বিয়ে করতে চাই এবং সেও আমাকে বিয়ে করতে চায়, আমরা একসাথে পড়াশোনা করেছি ইউনিভার্সিটিতে এবং ছেলে বর্তমানে চাকরি করছে। আমার সাথে বিয়ের জন্য সেই ছেলের বাবার তীব্র আপত্তি। তাই ছেলে তার খালা এবং খালুর সাথে পরামর্শ করে আমাকে বিয়ে করতে চাইছে। কিন্তু আমার মা ছেলের বাবা ছাড়া বিয়ে দিতে কোনভাবেই রাজি নয়। ছেলের খালা নিজে দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে করাইতে চাচ্ছে তাই আমার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে কিন্তু বিষয়টা ঝগড়ার দিকে চলে যায়, কোনও সমাধান হয়নি। এই অবস্থায় আমি খুবি কষ্টে আছি, ছেলের খালার কাছেও যেহেতু আমার মা বিয়ে দিতে রাজি নয় তাই ছেলের খালাও আর বিয়েতে আগাইতে চাচ্ছে না। আমি ভাবছি আমার মামা অথবা চাচা কে বিষয়টি জানাইতে তাহলে তারা হয়তো ছেলের খালার কাছেই আমাকে ছেলের সাথে বিয়ে দিবে। আমার মায়ের আপত্তি একটাই সেটা ছেলের বাবা ছাড়া বিয়ে দিবেনা কিন্তু ছেলের বাবাও রাজি না। আর এদিকে আমার বয়স হয়ে যাচ্ছে আমি খুবই কষ্ট আর দুশ্চিন্তায় আছি। আমার মামা অথবা চাচার সাথে পরামর্শ করে ছেলের খালা খালুর উপস্থিতিতে এই বিয়ে করলে কি আমার মায়ের মনে কষ্ট দেয়া হবে? আমি কি গুনাহগার হবো? এই মুহুর্তে আমার কি করনীয়?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি: (১) মায়ের অসম্মতিতে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে বিয়ে করা কি মায়ের মনে কষ্ট দেওয়া ও গুনাহ হবে? (২) এই মুহূর্তে করণীয় কী?

ইসলামী দৃষ্টিতে সিদ্ধান্ত:

একজন প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগা) সুস্থ মেয়ে নিজের বিবাহের ব্যাপারে শরীয়তগতভাবে স্বাধীন। পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়াও তার নিকাহ সহীহ হয়। তবে পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও সম্মতি কাম্য এবং তা ইহসান ও আখলাকের অংশ। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার অমতে বিয়ে করলে নিকাহ নাজায়েয বা বাতিল হয় না, এবং এ কারণে আপনি "গুনাহগার" হবেন না — যদি না আপনি পিতা-মাতার সাথে দুর্ব্যবহার করেন বা তাদের অধিকার নষ্ট করেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো: আপনার মায়ের আপত্তির কারণটি শরীয়তসম্মত নয় — তিনি ছেলের বাবার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দিতে রাজি নন, অথচ ছেলের বাবা শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার নিকাহর জন্য "অপরিহার্য পক্ষ" নন। ছেলের বাবার আপত্তি ছেলের নিজের বিবাহকে হারাম করে না; ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ হলে সে নিজেই নিজের নিকাহ করতে পারে। সুতরাং মায়ের এই শর্তটি শরীয়তে বাধ্যতামূলক নয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নিজের বিবাহের অধিকার

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো: বালিগা, আকিলা (বুদ্ধিমতী) মেয়ে নিজের নিকাহ নিজেই সম্পাদন করতে পারে; তার জন্য ওলি (অভিভাবক) এর অনুমতি শরীয়তগতভাবে শর্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব এটাই।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুন নিকাহ — "وَالْبَالِغَةُ الْعَاقِلَةُ تَزَوَّجُ نَفْسَهَا" (বালিগা আকিলা নারী নিজেই নিজের বিবাহ করতে পারে)। আরও দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুন নিকাহ।

হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বলেছেন:

«الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا» — "সাবেক স্বামীযুক্ত/প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি হকদার।" সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪২১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৯৮; জামে তিরমিজি, হাদিস নং ১১০২।

ইমাম তহাবি (রহ.) শরহু মাআনিল আসার-এ এবং ইমাম মুহাম্মদ শায়বানি (রহ.) আল-আসার-এ এ মূলনীতি সমর্থন করেছেন।

২. পিতা-মাতার সম্মতি ও সন্তুষ্টির গুরুত্ব

অন্যদিকে ইসলাম পিতা-মাতার সন্তুষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا — "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" সূরা আল-ইসরা: ২৩

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا — "আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" সূরা আল-আনকাবুত: ৮

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ» — "প্রভুর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে, আর প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" জামে তিরমিজি, হাদিস নং ১৮৯৯ (হাসান)।

তবে লক্ষণীয়: এই হাদিসের প্রয়োগ পিতা-মাতার শরীয়তসম্মত নির্দেশের ক্ষেত্রে। পিতা-মাতা যদি শরীয়তবিরোধী বা অন্যায় দাবি করেন, তাহলে তা মানা ওয়াজিব নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্ট করেছেন যে, পিতা-মাতার আনুগত্য কেবল শরীয়তসম্মত বিষয়ে।

৩. আপনার মায়ের আপত্তি — শরীয়তসম্মত কি না?

আপনার মায়ের আপত্তির একমাত্র কারণ: "ছেলের বাবা ছাড়া বিয়ে দেবেন না।" কিন্তু:

  • ছেলের বাবা শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার নিকাহর পক্ষ নন; ছেলের নিকাহর জন্য ছেলের বাবার অনুমতিও শরীয়তগতভাবে শর্ত নয় (ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ)।
  • ছেলের বাবা আপত্তি করছেন — এটি ছেলের নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাকে শরীয়তে বাধা দেয় না।
  • সুতরাং মায়ের এই শর্তটি শরীয়তসম্মত কারণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; এটি সামাজিক/পারিবারিক চাপ।

এমতাবস্থায় শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার নিকাহ ছেলের খালা-খালুর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হলে নিকাহ সহীহ হবে, এবং আপনি "যিনা" বা "হারাম সম্পর্ক"-এর গুনাহে পড়বেন না।

৪. "মায়ের মনে কষ্ট দেওয়া" ও গুনাহের প্রশ্ন

এখানে দুটি স্তর আলাদা করতে হবে:

(ক) শরীয়তগত গুনাহ: পিতা-মাতার অমতে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের নিজের নিকাহ করা — এটি হানাফি মাযহাবে গুনাহ নয়, নিকাহ সহীহ। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মাযহাব এটাই। ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি রহ.)-তেও এ মূলনীতি সমর্থিত।

(খ) আখলাকি ও পারিবারিক দায়িত্ব: মায়ের মনে কষ্ট দেওয়া আখলাকের দৃষ্টিতে কাম্য নয়; বরং ইহসানের পরিপন্থী। তবে "কষ্ট" তখনই নিন্দনীয় যখন তা শরীয়তসম্মত দাবির ভিত্তিতে হয়। শরীয়তবিরোধী দাবি পূরণ না করায় সৃষ্ট কষ্টের দায়িত্ব মূলত সেই দাবিদারের উপর, আপনার উপর নয়।

সতর্কতা: যদি আপনি মাকে গালমন্দ করেন, তিরস্কার করেন, তার ভরণপোষণ বা সেবা বন্ধ করেন — তাহলে সেটি গুনাহ ও হারাম হবে। কিন্তু শুধু তার অসম্মতিতে শরীয়তসম্মতভাবে বিয়ে করা — এতে গুনাহ নেই।

৫. মায়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষার শর্ত

আপনি বিয়ে করলেও মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, কথা বন্ধ করা, তার খেদমত ত্যাগ করা জায়েয হবে না। বরং বিয়ে করার পরেও মায়ের সেবা, ভরণপোষণ ও সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখা আপনার দ্বীনি দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:

وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا — "দুনিয়াতে তাদের (পিতা-মাতার) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" সূরা লুকমান: ১৫

এই আয়াতটি সেই প্রসঙ্গে নাজিল হয় যখন পিতা-মাতা সন্তানকে শিরক করতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন — অর্থাৎ শরীয়তবিরোধী দাবির ক্ষেত্রেও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ। এটি আপনার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক দলিল।


এই মুহূর্তে করণীয় (ধাপে ধাপে)

  1. ধৈর্য ও ইস্তিখারা: দুশ্চিন্তায় আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেবেন না। সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। বয়স নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করবেন না — রিযিক ও জীবনসঙ্গী আল্লাহ নির্ধারিত সময়েই আসে।

  2. মায়ের সাথে শান্তভাবে কথা বলুন: তর্ক নয়, ভালোবাসা দিয়ে বুঝান। তাকে বলুন — ছেলের বাবার সম্মতি শরীয়তে শর্ত নয়, ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক ও দায়িত্বশীল, তার খালা-খালু অভিভাবক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। মায়ের ভয় দূর করার চেষ্টা করুন (যেমন: ভবিষ্যতে তার সেবা-যত্নের নিশ্চয়তা)।

  3. মামা/চাচাকে সম্পৃক্ত করুন: আপনার পরিকল্পনা যুক্তিসঙ্গত। মামা বা চাচা — যিনি মায়ের নিকট শ্রদ্ধেয় ও প্রভাবশালী — তাকে বিষয়টি জানান। তিনি মাকে বোঝাতে পারেন এবং নিকাহর সময় ওলি/সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন। এটি মায়ের কষ্ট কমাবে এবং শরীয়তগতভাবে নিকাহকে আরও সুসংহত করবে।

  4. ছেলের খালা-খালুর সাথে সমন্বয়: তাদের মাধ্যমে নিকাহর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিন। শরীয়তের শর্ত পূরণ করুন — দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী, মোহর, ইজাব-কবুল। ছেলের পক্ষ থেকে তার খালা-খালু বা অন্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি উপস্থিত থাকুন।

  5. মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন: বিয়ে যেন মায়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়। বরং বিয়ের পর মাকে আরও বেশি সময় ও সেবা দিন — এতে তার কষ্ট ধীরে ধীরে কমবে এবং সম্পর্ক ভালো থাকবে।

  6. স্থানীয় মুফতি/আলেমের পরামর্শ: আপনার এলাকার বিশ্বস্ত হানাফি মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন; তিনি পারিবারিক সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতাও করতে পারেন।


সারসংক্ষেপ

  • প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মেয়ের নিজের নিকাহ শরীয়তগতভাবে সহীহ, পিতা-মাতার সম্মতি ছাড়াও — হানাফি মাযহাবের মূলনীতি।
  • মায়ের আপত্তির কারণ (ছেলের বাবার সম্মতি) শরীয়তসম্মত শর্ত নয়; তাই তা পূরণ না করায় আপনি গুনাহগার হবেন না।
  • তবে মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার, সম্পর্কচ্ছেদ বা তার অধিকার নষ্ট করা গুনাহ — এটি থেকে বিরত থাকুন।
  • মামা/চাচার মাধ্যমে সমঝোতা, শান্ত আলোচনা, ইস্তিখারা ও ধৈর্য — এটাই এই মুহূর্তের করণীয়।
  • নিকাহর পরও মায়ের সেবা ও সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখুন (সূরা লুকমান: ১৫)।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণকর সিদ্ধান্ত ও সহজ পথ দান করুন। আমিন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.