ফরয গোসল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
১.ফরয গোসলে কানে কিভাবে পানি দিবো? সুন্নত নিয়ম কি?
২.ফরয গোসলে নাভিতে কিভাবে পানি দিবো? সুন্নত নিয়ম কি?
৩.ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় কিভাবে পানি পৌছাবো? সুন্নত নিয়ম কি? ইমামদের মতামত দলীল প্রমাণ সহ জানাবেন!
৪.ফরয গোসলের আগে ব্রাশ করা বেশি ভালো নাকি মেসওয়াক করা? কারন ফরয গোসলে তো দাতের মাড়ির গোড়ায় পানি যেতে হবে। তাই কোনটা করলে দাতের মাড়ির গোড়া পরিষ্কার হবে? আর গোসল হবে ? হাদিস অনুযায়ী ইমামদের মত জানাবেন!
৫.ফরয গোসলে কি দাড়ি অনেক বড় ও ঘন হলেও কি গোড়াতে পানি পৌছাতে হবে? আর ছোট হলেও কি পৌছাতে হবে? সুন্নত নিয়ম কি?
৬.ফরয গোসলে চোখের ভ্রু এর গোড়াতে কিভাবে পানি পৌছাবো? সুন্নত পদ্ধতি কি?
৭.ফরয গোসলে কি নবিজি কাপড় পড়ে গোসল করতেন? মানে একেবারে উলংগ না হওয়া কি নবিজি,সাহাবিদের আমল ছিলো?
Answer
প্রশ্নোত্তর: ফরয গোসলের সুন্নত পদ্ধতি ও মাসআলা
১. ফরয গোসলে কানে কিভাবে পানি দিবো? সুন্নত নিয়ম কি?
সুন্নত পদ্ধতি: কানের ছিদ্রে পানি প্রবেশ করানো ওয়াজিব নয়। তবে কানের ভেতরের অংশ (যেখানে আঙুল যায়) পর্যন্ত পানি পৌঁছানো সুন্নত। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কানের গর্তে পানি না গেলেও গোসল শুদ্ধ হবে, কারণ কান মুখ বা নাকের মতো খোলা অঙ্গ নয়। তবে সুন্নত হলো কানে পানি দিয়ে কান খিলাল করা।
পদ্ধতি:
- ডান হাতের ছোট আঙুল ভিজিয়ে কানের ভেতর ঘুরিয়ে দিন।
- বাম হাতের বুড়ো আঙুল ও ছোট আঙুল দিয়ে কানের পেছনের খাঁজ পরিষ্কার করুন।
হাদিস: হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) গোসলের সময় কানের খিলাল করতেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৯; ইমাম নববী বলেছেন হাদিসটি সহিহ)
হানাফি কিতাব: “কানের অভ্যন্তরীণ অংশে পানি পৌঁছানো ওয়াজিব নয়; তবে সুন্নত হলো খিলাল করা।” (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০)
২. ফরয গোসলে নাভিতে কিভাবে পানি দিবো? সুন্নত নিয়ম কি?
সুন্নত পদ্ধতি: নাভির ভেতর পানি পৌঁছানো ওয়াজিব। কারণ নাভি শরীরের বাহ্যিক অংশ। যদি নাভি গভীর হয়, তবে পানি প্রবেশ করানো জরুরি।
পদ্ধতি:
- আঙুল নাভির ভেতর ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিন, যাতে পানি ভালোভাবে পৌঁছে।
- নাভির চারপাশেও পানি ঢালুন।
হানাফি ফিকাহ: “নাভি যদি গভীর হয়, তবে তাতে পানি পৌঁছানো ফরয। আর যদি সমতল হয়, তাহলে পানি পড়লেই যথেষ্ট।” (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৪; বাহিশতি জেওর, গোসলের মাসায়েল)
হাদিসের দলিল: গোসল ফরজ হওয়ার মূলনীতি হলো সারা শরীরে পানি পৌঁছানো। (সূরা মায়িদা: ৬)
৩. ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় কিভাবে পানি পৌছাবো? সুন্নত নিয়ম কি? ইমামদের মতামত দলীল প্রমাণ সহ জানাবেন!
সুন্নত পদ্ধতি: ফরয গোসলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। পানি শুধু চুলের ডগায় পৌঁছালেই যথেষ্ট নয়। চুলের গোড়া ভিজতে হবে।
পদ্ধতি:
১. প্রথমে নিয়ত করে উভয় হাতের কপালি পর্যন্ত ধুতে হবে।
২. তারপর তিনবার পানি ঢেলে মাথা ভিজাতে হবে, যাতে প্রতিটি চুলের গোড়া সিক্ত হয়।
৩. চুল পেঁচানো থাকলে খুলে ফেলা ভালো, তবে পানি গোড়ায় পৌঁছালেই যথেষ্ট।
ইমামদের মত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয।
- ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, একবার পানি ঢেলেই যথেষ্ট, তবে তিনবার সুন্নত।
হাদিস: হযরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমি তো আমার মাথায় তিনবার পানি ঢালি।’” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫)
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) জানাবাতের গোসলের সময় প্রথমে হাত ধুতেন, তারপর শরীরের অন্যান্য অংশে পানি দিতেন এবং অবশেষে মাথায় পানি ঢালতেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩১৬)
হানাফি কিতাব: “মাথার চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছানো ফরয। যদি চুল জড়ানো থাকে, তবে তার ভেতর পানি পৌঁছাতে হবে।” (আল-হিদায়া, ১/১৭; রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৩)
৪. ফরয গোসলের আগে ব্রাশ করা ভালো নাকি মেসওয়াক? (ইমামদের মত ও হাদিস)
অগ্রাধিকার: মেসওয়াক করা অনেক উত্তম এবং সুন্নত। তবে দাঁতের মাড়ির গোড়ায় পানি পৌঁছানোর জন্য মেসওয়াকই বেশি কার্যকর, কারণ এটি মাড়ি পরিষ্কার করে এবং পানি প্রবেশে সহায়তা করে।
হাদিসের দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যদি আমি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে তাদের প্রতি ওজু ও গোসলের সময় মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৮৭; ইমাম নববী বলেছেন সহিহ)
- অন্য হাদিসে আছে, “মেসওয়াক মুখ পরিষ্কার করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৮)
ইমামদের মত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, গোসলের আগে মেসওয়াক করা সুন্নত।
- ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতে, গোসলের সময় মেসওয়াক করা মুস্তাহাব।
ব্রাশের ব্যাপারে: আধুনিক ব্রাশ মেসওয়াকের বিকল্প হতে পারে, কিন্তু মেসওয়াকের সাওয়াব ও সুন্নতের ফজিলত নেই। মেসওয়াক করলে মাড়ি ভালো পরিষ্কার হয় এবং পানি প্রবেশ সহজ হয়।
হানাফি কিতাব: “গোসলের পূর্বে ও ওজুর সময় মেসওয়াক করা সুন্নত।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২; বাহিশতি জেওর, ওজু ও গোসলের সুন্নত)
৫. ফরয গোসলে দাড়ি (বড়/ছোট) – গোড়াতে পানি পৌঁছানো কি জরুরি?
উত্তর: হ্যাঁ, দাড়ি যত বড় বা ঘনই হোক না কেন, চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। শুধুমাত্র দাড়ির বাইরের পানি পৌঁছালেই চলবে না; ভেতরের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে।
পদ্ধতি:
- দাড়ি ঘন হলে আঙুল দিয়ে খিলাল (চিরুনির মতো) করে পানি ভেতরে পৌঁছান।
- ছোট দাড়ির ক্ষেত্রে পানি ঢাললেই গোড়ায় পৌঁছে যায়।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) ওজুতে দাড়ি খিলাল করতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩১; ইমাম তিরমিজি বলেছেন সহিহ) আর গোসলের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
হানাফি ফিকাহ: “দাড়ির চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয। দাড়ি খিলাল করা সুন্নত।” (রদ্দুল মুহতার, ১/২২৫; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৯৩)
৬. ফরয গোসলে চোখের ভ্রু এর গোড়াতে কিভাবে পানি পৌছাবো? সুন্নত পদ্ধতি
সুন্নত পদ্ধতি: ভ্রুর গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরয, কারণ ভ্রু শরীরের বাহ্যিক অংশ। পানি ঢালার সময় হাত দিয়ে ভ্রুর ওপর পানি ঘষে দিন, যাতে পানি গোড়ায় পৌঁছে।
পদ্ধতি:
- ভিজা হাতের আঙুল ভ্রুর ওপর দিয়ে সরান, বিশেষ করে নিচের দিক থেকে উপরের দিকে।
- ঘন ভ্রু হলে আঙুল দিয়ে খিলাল করুন।
হানাফি কিতাব: “ভ্রু ও চোখের পাতা শরীরের অংশ; তাই পানি পৌঁছানো ফরয।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০; বাহিশতি জেওর)
৭. ফরয গোসলে কি নবিজি কাপড় পড়ে গোসল করতেন? (উলঙ্গ না হওয়া)
উত্তর: সাধারণত রাসূলুল্লাহ (সা.) জনসম্মুখে বা অন্যদের দেখার আশঙ্কায় গোসল করলে পর্দা করতেন। নিচে দলিলসহ ব্যাখ্যা:
হাদিস:
- হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) একই পাত্র থেকে গোসল করতাম, আমরা উভয়ে জানাবাতের অবস্থায় থাকতাম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫০) –
সাহাবাদের আমল: সাহাবিরা গোসলের সময় অন্যের দৃষ্টির আশঙ্কায় পর্দা করতেন।
হানাফি ফিকাহ: “গোসলের সময় নির্জনে উলঙ্গ হওয়া জায়েজ, তবে পর্দার পেছনে গোসল করা উত্তম। যদি কেউ কাপড় পরে গোসল করে, তবে পানি কাপড়ের ভেদ করে শরীরে পৌঁছালে গোসল শুদ্ধ হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ১/১৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১১)
সারসংক্ষেপ: কাপড় পরে গোসল করা জায়েজ, তবে সুন্নত নয়।