কোনও মুসলিম কানাডিয়ান আর্মি তে যোগ দেয়া যাবে কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
কোনও মুসলিম কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দেয়া যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: সাধারণভাবে কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দেওয়া জায়েজ হতে পারে, তবে শর্ত হলো—সেখানে গিয়ে কোনো হারাম কাজে (যেমন: মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অন্যায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ, শরিয়তবিরোধী কাজ) লিপ্ত না হওয়া। আর যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, যোগ দিলে হারাম কাজে বাধ্য করা হবে বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে, তাহলে যোগ দেওয়া জায়েজ হবে না।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূল নীতি: সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিধান
ইসলামে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা, সীমান্ত পাহারা, জুলুম প্রতিরোধ ইত্যাদি উদ্দেশ্যে যোগ দেওয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো—সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে অংশ নিতে হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা পরস্পরকে সৎকাজ ও তাকওয়ায় সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
এই আয়াতের আলোকে, যে কাজে গুনাহ ও জুলুমে সহায়তা হয়, তা নিষিদ্ধ। আর যে কাজে ন্যায় ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হয়, তা জায়েজ।
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের মূল গ্রন্থগুলোতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে মূলনীতি হলো—যুদ্ধ ও সেনাবাহিনীর কাজ মূলত জায়েজ, তবে উদ্দেশ্য ও পরিণতি বিবেচ্য।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর ছাত্রগণ (ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) ফতোয়া দিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন বাহিনীতে যোগ দেয় যেখানে অন্যায়ভাবে মুসলিমদের ওপর হামলা করা হয়, তাহলে তা জায়েজ নয়। পক্ষান্তরে, যদি তা ন্যায়সঙ্গত প্রতিরক্ষা বা শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ হয়, তাহলে জায়েজ।
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"যে কাজে মুসলিমদের ক্ষতি হয় বা কুফর-শিরকের সহায়তা হয়, তাতে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তখনই জায়েজ হবে, যখন সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে বাধ্য করা হবে না এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বলা হবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৫৬)
৩. কানাডিয়ান আর্মির প্রেক্ষাপট
কানাডা একটি অমুসলিম রাষ্ট্র। কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দিলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:
-
উদ্দেশ্য কী? — যদি উদ্দেশ্য হয় শুধু চাকরি, আর্থিক সুবিধা বা নাগরিকত্ব, এবং সেখানে শরিয়তবিরোধী কাজে বাধ্য করা হয় না, তাহলে জায়েজ হতে পারে।
-
কোন বিভাগে যোগ দিচ্ছেন? — যদি কমব্যাট (যুদ্ধ) বিভাগে যোগ দেন এবং সেই যুদ্ধ অন্যায় হয় বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে জায়েজ নয়। আর যদি লজিস্টিক, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রশাসনিক ইত্যাদি বিভাগে যোগ দেন, তাহলে জায়েজ হতে পারে।
-
শরিয়তবিরোধী কাজে বাধ্য করা হবে কি? — যদি বাধ্য করা হয়, যেমন: মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অন্যায় হত্যা, শরিয়তবিরোধী কাজ, তাহলে যোগ দেওয়া জায়েজ নয়।
-
নিয়ত ও নৈতিকতা — মুসলিম হিসেবে যোগ দিলে আপনার নিয়ত হতে হবে ন্যায় ও নিরাপত্তা রক্ষা, জুলুম প্রতিরোধ। শুধু অর্থ বা পদমর্যাদার জন্য হলে তা নিন্দনীয়।
৪. বিশেষ সতর্কতা
-
মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: যদি কানাডিয়ান আর্মি কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়, তাহলে সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া হারাম। আল্লাহ বলেন:
"আর যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না।" (সূরা আল-মুমতাহিনা: ৯)
-
অন্যায় যুদ্ধ: যদি কোনো যুদ্ধ অন্যায় হয় (যেমন: নিরপরাধ civilians হত্যা), তাহলে তাতে অংশ নেওয়া জায়েজ নয়।
-
শরিয়তবিরোধী কাজ: যদি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে নামাজ ছাড়তে বাধ্য করা হয়, বা হারাম কাজে বাধ্য করা হয়, তাহলে জায়েজ নয়।
৫. উপসংহার ও পরামর্শ
সিদ্ধান্ত: কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দেওয়া শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। শর্তগুলো হলো:
- সেখানে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে বাধ্য করা হবে না।
- মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হবে না।
- অন্যায় যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হবে না।
- আপনার নিয়ত হবে ন্যায় ও নিরাপত্তা রক্ষা।
যদি এই শর্তগুলো পূরণ হয়, তাহলে জায়েজ। আর যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, যোগ দিলে হারাম কাজে বাধ্য করা হবে, তাহলে জায়েজ নয়।
পরামর্শ: যোগ দেওয়ার আগে স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি ও আলেমদের সাথে পরামর্শ করুন, যারা কানাডার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানেন। আর যদি সন্দেহ থাকে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করুন—সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকে, সে নিজের দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২)
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
প্রশ্ন: কোনও মুসলিম কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দেয়া যাবে কি?
উত্তর: কানাডিয়ান আর্মিতে যোগ দেওয়া শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। যদি সেখানে শরিয়তবিরোধী কাজে বাধ্য করা না হয়, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা না হয়, এবং অন্যায় যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা না হয়—তাহলে জায়েজ। অন্যথায় জায়েজ নয়। সন্দেহ হলে বিরত থাকাই উত্তম।
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।