ব্র্যাক (এনজিও)-এর সুদভিত্তিক আয়ের টাকায় খাওয়া বিস্কিট কি হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6773
Questioner: M Rafiz Uddin
Question Asked: 12 Oct 2026, 07:22 AM
Reviewed & Published: 12 Oct 2026, 09:30 AM
Views: 17
Tokens: 7,601
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

গতকাল আমরা ৪ জন তালিমের শেষে গল্প করতে করতে এক ভাই বল্লো যে চা দোকানে চা খাওয়ার জন্য। ইশা এর পর সাধারণত আমি বাইরে খুব একটা সময় থাকি না, কিন্তু গতকাল বের হলাম - সকালে পরামর্শ হয়েছিলো যে ইশা এরপর দাওয়াতের জন্য বের হতে হবে, এইজন্যই মন টানছিলো তাদের সাথে একত্রিত হওয়ার। কিন্তু তার মধ্যে একজন ছিলো ব্র্যাক (এনজিও) তে কর্মরত, তার ইনকাম সোর্স আমি আগে খুব ভালো করে জানতাম না, এটাই জানতাম যে তিনি ব্র্যাক এ কর্মরত - তিনি নিজেই একদিন বলেছিলো যে তার ইনকাম ভালো না(এর বেশি তেমন খুব একটা আমি জানতাম না)। তো সবাইকে তিনি চা এর দোকানে দাওয়াত খাওয়ালেন। আমি সুধু বিস্কিট খেয়েছিলাম। এর পরে তার থেকে আমি তার ইনকামের বিস্তারিত জানলাম - জানতে পারলাম যে তার কাজ কিস্তিতে ঋন দান (সুদ সহ) এর সাথে জড়িত। তিনি নিজেও এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত এবং বের হতে চান এই চাকরি থেক, কিন্তু দেশে চাকরির অবস্থা খারাপ দেখে এখনো বের হননি। তাকে বল্লাম যেন এই চাকরি থেকে বের হয়। তার ইচ্ছা আছে এইটা থেকে বের হয়ে ব্যাবসা করবে এমন।


তো সমস্যা হলো আমি যে বিস্কিট খেলাম তার ইনকামের টাকা থেকে, এইটা কি আমার হারাম। এইটা কি সেই জিনিস যেইটার কথা হাদিসে এসেছে যে "হারাম এর খাদ্য থেকে ভক্ষণকারী দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না"? আমি খাওয়ার পরে এই বিস্তারিত জানার পরে এইটা অনুভব করলাম। সাহাবিরা নাকি এমন খাবার ভুল করে খেলেও বমি করে বের করে দিত। দুয়া' করলেও নাকি কবুল হবে না। এসব মনে পড়ে আমার খুব ভয় হলো। এইটা যদি আমার ভুল হয়েই থাকে তাহলে এখন আমার করণীয় কি? এটার কাফফারা কি?

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আপনার মনের এই আকুলতা, ঈমানী অনুভূতি ও হারাম খাবার সম্পর্কে জাগ্রত ভয়প্রবণতা মূলত আপনার ঈমানের সততা ও জীবন্ত হওয়ার বড় একটি প্রমাণ। তবে আপনার চিন্তিত, ভীত বা হতাশ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

শরীয়তের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী: যেহেতু বিস্কুটটি খাওয়ার সময় আপনি ওই ভাইয়ের উপার্জনের সুনির্দিষ্ট হারাম উৎস সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না এবং না জেনেই তা ভক্ষণ করেছিলেন, তাই এর জন্য আপনি গোনাহগার হবেন না এবং এর কারণে আপনার দোয়া কবুল না হওয়া কিংবা শরীর জাহান্নামী হওয়ার হাদীসের ধমকি আপনার ওপর প্রযোজ্য হবে না।

ফাতাওয়া ও ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ আপনার প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত উত্তর নিচে পেশ করা হলো:


১. না জেনে খাওয়ার শরয়ী হুকুম ও হাদীসের ধমকির বিষয়:

  • গোনাহ না হওয়া: ইসলামি শরীআতের একটি মৌলিক উসূল হলো—বান্দা যখন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা হারাম কাজ ভুলবশত কিংবা না জেনে করে ফেলে, তখন আল্লাহর দরবারে সে জন্য তাকে অপরাধী করা হয় না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: "আমার উম্মতের ভুলবশত, ভুলে গিয়ে এবং বাধ্য হয়ে করা কাজকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।"
  • হাদীসের ধমকী কার জন্য প্রযোজ্য? হাদীস শরীফে "হারাম খাদ্যে লালিত-পালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না" কিংবা "হারাম খেলে দোয়া কবুল হবে না"—এসব কঠোর ধমকি ঐ ব্যক্তির জন্য, যে জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে হারাম উপার্জনে লিপ্ত থাকে কিংবা জেনেশুনে হারাম খাদ্য ভক্ষণ করে। না জেনে বা অজ্ঞতাবশত হঠাৎ খেয়ে ফেললে এই শাস্তি বা ধমকি তার ওপর বর্তায় না।

২. সাহাবীদের বমি করে ফেলার ঘটনা ও এর শরয়ী মর্যাদা:

  • হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) একবার তাঁর দাসের অর্জিত খাবার খাওয়ার পর যখন জানতে পারেন যে তা গণকগিরি বা জাহেলিয়াতের অসুন্দর উপার্জনের আয়ের, তখন তিনি মুখে আঙুল দিয়ে বমি করে বের করে দিয়েছিলেন।
  • শরয়ী ব্যাখ্যা: ফুকাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীনগণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন—এটি কোনো সাধারণ ফরয বা ওয়াজিব বিধান ছিল না; বরং এটি ছিল সাহাবীদের উচ্চতম তাকওয়া, পরহেযগারী ও আত্মিক পরিচ্ছন্নতার (الورع والتقوى) এক অনন্য নজীর। খাদ্য ইতোমধ্যে পেটে হজম বা শোষিত হয়ে গেলে কৃত্রিমভাবে বমি করা শরীয়তে ওয়াজিব বা আবশ্যক নয়।

৩. আপনার বর্তমান করণীয় ও কাফফারা:

১. নির্দিষ্ট কোনো কাফফারা নেই: এ ভুলের জন্য শরীআতে কোনো আর্থিক বা শারীরিক কাফফারা নির্ধারিত নেই। ২. ইস্তেগফার করা: খাওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরে আপনার অন্তরে যে অনুশোচনা এসেছে, এটিই প্রকৃত তওবা। আল্লাহর দরবারে আন্তরিকভাবে ইস্তেগফার করাই যথেষ্ট। ৩. সদকা করা (তাকওয়া ও মনের তৃপ্তির জন্য): আপনার মনকে সম্পূর্ণ সংশয়মুক্ত ও প্রশান্ত করার জন্য উক্ত বিস্কুটের আনুমানিক যে দাম (যেমন ১০, ২০ বা ৩০ টাকা) ছিল, সে পরিমাণ টাকা কোনো গরীব-মিসকীনকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে পারেন। এটি ওয়াজিব নয়, তবে তাকওয়া হাসিলের জন্য উত্তম। ৪. ভবিষ্যতের সতর্কতা: যেহেতু এখন আপনি ওই ভাইয়ের চাকরির ধরণ জেনে গেছেন, তাই ভবিষ্যতে তিনি আপনাকে কোনো খাবার বা চা-নাস্তা খাওয়াতে চাইলে কৌশল অবলম্বন করে বিনম্রে তা এড়িয়ে চলবেন। ৫. ওই ভাইয়ের জন্য দু'আ ও সহযোগিতা: যেহেতু ওই ভাই নিজেও এই সুদী চাকরি নিয়ে লজ্জিত, অনুতপ্ত এবং বের হতে চান, তাই তাকে ঘৃণা না করে তার জন্য একটি হালাল রিজিকের ব্যবস্থার চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর কাছে দু'আ করুন যেন আল্লাহ তাকে দ্রুত এই সুদী চাকরি থেকে মুক্ত হয়ে হালাল ব্যবসা শুরু করার তৌফিক দেন।


সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ১৮৪–১৮৫: (অধ্যায়: হারাম অর্থ-সম্পদ: মালিকানা ও ব্যবহারবিধি — "الحرمة تتعدى في الأموال مع العلم بها" মূলনীতি অনুযায়ী না জেনে হারাম সম্পদ থেকে আপ্যায়ন গ্রহণ করলে অনভিজ্ঞতার কারণে ব্যক্তি গোনাহগার না হওয়া সংক্রান্ত ফিকহী বিশ্লেষণ)।
  • পৃষ্ঠা: ১৯৯–২০০: (অধ্যায়: হারাম অর্থ-সম্পদ — হারাম উপার্জনের দাওয়াত বা হাদিয়া গ্রহণের মাসআলা এবং অজ্ঞতাবশত গ্রহণের শরয়ী হুকুম)।

২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:

  • ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১০০–১০১ & ১১২–১১৩: (অধ্যায়: বাবুল হাদিইয়্যাতি ওয়াদ দিয়্যাফাত — সুদী বা হারাম উপার্জনকারীর দাওয়াত ও হাদিয়া গ্রহণের ফিকহী ফায়সালা এবং না জেনে খাওয়ার পর করণীয়)।
  • ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৭ & ১৩৪: (অধ্যায়: কিতাবুল কসব ওয়াল বিউ' — হারাম খাদ্য ও উপার্জনের হাদীসের ধমকী ইচ্ছাকৃত ভক্ষণকারীর জন্য প্রযোজ্য হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।

৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৫ম খণ্ড):

  • পৃষ্ঠা: ৩৪৩ (অধ্যায়: কিতাবুল কারাহিয়্যাহ, ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ): (যে ব্যক্তির অধিকাংশ উপার্জন হারাম, না জেনে তার খাবার খেলে গোনাহ না হওয়া এবং জানার পর করণীয়)।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.