পরকীয়ায় লিপ্ত পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
পরকীয়ায় লিপ্ত পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক রাখা প্রসঙ্গে
উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ — (সূরা নূর: ২)
মূল মাসআলা: পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে কি?
সংক্ষেপে: না, সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী সতর্কতা ও দূরত্ব অবলম্বন করা যাবে।
অর্থাৎ সাময়িক ভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে,তবে কোনো দিন যদি তারা আবারো সঠিক পথে ফিরে আসে,সেক্ষেত্রে আবারো সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে।
১. পিতা-মাতার হক কখনো রহিত হয় না
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
এ আয়াতের বিধান পিতা-মাতা ফাসিক বা গুনাহগার হলেও বহাল থাকে। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, পিতা-মাতা কাফির হলেও সন্তানের উপর তাদের সাথে সদাচরণ করা ওয়াজিব; তবে কুফরির বিষয়ে অনুসরণ করা যাবে না। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৯০-এর কাছাকাছি)
২. হাদিসে পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" — (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম: ২৫৫৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" — (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
৩. তবে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা মায়িদা: ২)
সঠিক পদ্ধতি: সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং সীমিত ও সতর্ক সম্পর্ক
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:
| বিষয় | বিধান | |------|------| | সালাম-সম্ভাষণ, খোঁজখবর | জারি রাখা উত্তম | | হক আদায় (খেদমত, দোয়া) | যথাসাধ্য চালিয়ে যাওয়া | | গুনাহের কাজে সহযোগিতা | সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ | | পরকীয়ার সম্পর্কে সাহায্য/আশ্রয় | হারাম | | নিজ পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষা | ওয়াজিব |
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) সিলাতুর রাহিম প্রসঙ্গে বলেন: সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে শুধু সালাম-সম্ভাষণ ও সাক্ষাতে বন্ধ করা; আর গুনাহগার আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখার অর্থ হলো — তার গুনাহে সাহায্য না করা, কিন্তু ইসলামি সীমার ভেতরে সদাচরণ বজায় রাখা। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭০-এর কাছাকাছি)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে: পিতা-মাতা ফাসিক হলে সন্তান তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না; বরং নরমভাবে উপদেশ দেবে, দোয়া করবে এবং নিজেকে ও পরিবারকে গুনাহ থেকে বাঁচাবে। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৯০-এর কাছাকাছি)
আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে করণীয়
১. সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না — এটি কবিরা গুনাহ হবে। ২. কিন্তু পরকীয়ার বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করবেন না — টাকা-পয়সা, আশ্রয়, সুবিধা কিছুই দেবেন না। ৩. নিরাপত্তার জন্য দূরত্ব রাখুন — যদি তার উপস্থিতি পরিবারের নিরাপত্তা ও ইজ্জতের জন্য হুমকি হয়, তবে আলাদা থাকা জায়েজ। ৪. নরমভাবে দাওয়াত চালিয়ে যান — হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করা ইসলামে কাঙ্ক্ষিত পদ্ধতি নয়; বরং হিকমতের সাথে উপদেশ দিন। ৫. দোয়া করুন — হিদায়াতের মালিক আল্লাহ। ৬. কাফির দেশে যাওয়ার বিষয় — যদি সে কুফরি রাষ্ট্রে গিয়ে কুফরি বা ফাহিশার কাজে লিপ্ত হয়, তবে তার সাথে সম্পর্ক রাখার অর্থ এই নয় যে তার কাজকে সমর্থন করা হচ্ছে।
দুআ
উক্ত বোনের জন্য এবং পুরো পরিবারের হিফাযতের জন্য দুআ:
اللَّهُمَّ اكْفِنَا بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنَا بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ "হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাদের হারাম থেকে বাঁচান এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা অন্য সবার থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।" — (তিরমিজি: ৩৫৬৩)
اللَّهُمَّ أَصْلِحْ لَنَا أَهْلَنَا وَذُرِّيَّاتِنَا وَاحْفَظْنَا مِنَ الْفَوَاحِشِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ