জার্মান থেকে উমরাহ করতে গিয়ে জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নিলে ইহরাম কখন বাঁধবো?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আমার পরিচিত একজন বোন জার্মান থাকে,, তিনি চাচ্ছেন জার্মান থেকে ওমরাহ করতে যাবে।কিন্তু প্রথম তার ভাইয়ের বাসায় জেদ্দায় বিশ্রাম নিবে তারপর সেখান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হবেন।
এখন আমার প্রশ্ন
১) জার্মান থেকে যদি প্রথম ভাইয়ের বাসায় যায় তাহলে তিনি ইহরাম কখন বাধবে?
২) প্রথমে ভাইয়ের বাসায় যাবো তারপর উমরাহ করবো এরকম নিয়ত করা যাবে কি-না।
৩) কেউ যদি জানতে চায় সৌদি কেন যাচ্ছেন তখন তিনি উত্তর কি বলবে? ওমরাহ করতে যাচ্ছি বলবে না-কি ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছি বলবে?
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন মুসলিম বোন জার্মানিতে থাকেন। তিনি উমরাহ করার ইচ্ছা রাখেন। কিন্তু প্রথমে সৌদি আরবের জেদ্দায় তার ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নিতে চান, এরপর সেখান থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে উমরাহ আদায় করতে চান। জানতে চেয়েছেন—(১) ইহরাম কখন বাঁধবেন? (২) প্রথমে ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার পর উমরাহ করার নিয়ত করা যাবে কি? (৩) কেউ জিজ্ঞেস করলে সৌদি যাওয়ার কারণ হিসেবে কী উত্তর দেবেন?
১) ইহরাম কখন বাঁধবেন?
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:
ইহরাম হলো উমরাহ বা হজের আনুষ্ঠানিক সূচনা। মীকাত (নির্ধারিত সীমানা) অতিক্রম করার আগেই ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«وَقَّتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ ذَا الْحُلَيْفَةِ، وَلِأَهْلِ الشَّامِ الْجُحْفَةَ، وَلِأَهْلِ نَجْدٍ قَرْنَ الْمَنَازِلِ، وَلِأَهْلِ الْيَمَنِ يَلَمْلَمَ، فَهُنَّ لَهُنَّ وَلِمَنْ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِ أَهْلِهِنَّ مِمَّنْ أَرَادَ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ»
— সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫২৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৮১
অর্থাৎ যে ব্যক্তি হজ বা উমরাহর ইচ্ছা রাখে, সে যদি মীকাত অতিক্রম করে, তবে তাকে ইহরাম বাঁধতেই হবে।
জেদ্দার অবস্থান:
জেদ্দা মীকাতের ভেতরে পড়ে না; বরং জেদ্দা মক্কার নিকটবর্তী একটি শহর, যা মীকাতের সীমানার ভেতরে অবস্থিত। তবে জেদ্দায় পৌঁছার আগেই বিমান মীকাতের উপর দিয়ে অতিক্রম করে।
হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার (২/১৫৫) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (১/২১৭)-এ উল্লেখ আছে:
“যে ব্যক্তি মীকাত অতিক্রম করবে, তার জন্য ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব। যদি মীকাত অতিক্রম করে ইহরাম না বাঁধে, তবে দম (একটি ছাগল বা ভেড়া কুরবানি) ওয়াজিব হবে।”
সিদ্ধান্ত:
যেহেতু জার্মান থেকে বিমানযোগে সৌদি আরবে আসার সময় বিমানটি মীকাতের উপর দিয়ে অতিক্রম করবে, তাই মীকাত অতিক্রম করার আগেই (অর্থাৎ জার্মান থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় বা বিমানে মীকাতের নিকট পৌঁছার আগে) ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব।
যদি তিনি জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেওয়ার পর মক্কায় যাওয়ার সময় ইহরাম বাঁধেন, তবে তা মীকাত অতিক্রম করার পর হবে—এটি জায়েয নয়; বরং দম ওয়াজিব হবে।
তবে একটি ব্যতিক্রম:
যদি তিনি মীকাতের আগেই ইহরাম বাঁধেন এবং জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেন, তাহলে ইহরাম এর নিয়ম কানুন ভঙ্গ যাবে না; বরং ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে। বিশ্রাম নেওয়া যাবে, কিন্তু ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো (যেমন সুগন্ধি ব্যবহার, চুল কাটা, নখ কাটা, স্ত্রী-সহবাস ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকতে হবে।
অথবা তিনি মীকাত অতিক্রম করার আগেই ইহরাম বাঁধবেন, তারপর জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নিয়ে মক্কায় গিয়ে উমরাহর তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করবেন।
সারকথা:
- জার্মান থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় বা বিমানে মীকাতের আগে ইহরাম বাঁধতে হবে।
- জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেওয়া যাবে, কিন্তু ইহরাম অবস্থায় থাকতে হবে।
- মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বাঁধলে দম ওয়াজিব হবে।
২) প্রথমে ভাইয়ের বাসায় যাবো, তারপর উমরাহ করবো—এমন নিয়ত করা যাবে কি?
নিয়তের বিধান:
উমরাহর নিয়ত হলো ইহরাম বাঁধার সময় অন্তরে সংকল্প করা। মুখে বলা সুন্নত।
রাদ্দুল মুহতার (২/১৫৭)-এ আছে:
“ইহরামের নিয়ত হলো অন্তরের সংকল্প; মুখে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব।”
প্রশ্নের উত্তর:
“প্রথমে ভাইয়ের বাসায় যাবো, তারপর উমরাহ করবো”—এটি একটি সাধারণ পরিকল্পনা বা সফরের কর্মসূচি। এটি নিয়ত হিসেবে বলা যাবে, তবে ইহরামের নিয়ত হিসেবে নয়।
ইহরামের নিয়ত করতে হবে মীকাত অতিক্রম করার আগে। তখন নিয়ত হবে:
“আমি উমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধছি।”
অতএব, ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার পরিকল্পনা করা জায়েয, কিন্তু ইহরাম বাঁধার নিয়ত মীকাতের আগেই করতে হবে।
যদি তিনি ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে তারপর ইহরাম বাঁধার নিয়ত করেন, তবে তা মীকাত অতিক্রমের পর হবে—এটি জায়েয নয়।
সারকথা:
- ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেওয়ার পরিকল্পনা করা জায়েয।
- কিন্তু ইহরামের নিয়ত মীকাত অতিক্রমের আগেই করতে হবে।
- ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে ইহরাম বাঁধার নিয়ত করা জায়েয নয়।
৩) কেউ জিজ্ঞেস করলে সৌদি যাওয়ার কারণ হিসেবে কী উত্তর দেবেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যা বলা হারাম।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ»
— সূরা আত-তাওবাহ: ১১৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ، وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ»
— সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬০৭
উত্তরের পদ্ধতি:
তিনি সত্য কথা বলবেন। তবে প্রয়োজনে সংক্ষেপে বা সাধারণভাবে বলতে পারেন।
- যদি জিজ্ঞেস করে: “সৌদি কেন যাচ্ছেন?”
তিনি বলতে পারেন: “আমি উমরাহ করতে যাচ্ছি।” - যদি আরও জিজ্ঞেস করে: “কোথায় থাকবেন?”
তিনি বলতে পারেন: “জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেব, তারপর মক্কায় যাব।”
এতে কোনো মিথ্যা বলা হচ্ছে না; বরং সত্য ও স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হচ্ছে।
যদি নিরাপত্তার কারণে বা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন এড়াতে চান, তবে সাধারণভাবে বলতে পারেন: “পারিবারিক সফরে যাচ্ছি” বা “আত্মীয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি”—এটিও মিথ্যা নয়, যদি সত্যিই ভাইয়ের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য থাকে।
তবে “শুধু ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছি” বলে উমরাহর কথা গোপন করা—যদি সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়—তাহলে তা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাই সত্য বলা উত্তম।
সারকথা:
- সত্য কথা বলাই ওয়াজিব।
- “উমরাহ করতে যাচ্ছি” বলা উত্তম।
- প্রয়োজনে “জেদ্দায় ভাইয়ের বাসায় বিশ্রাম নেব, তারপর উমরাহ করব” বলতে পারেন।
- মিথ্যা বলা যাবে না।