হাই রিস্ক প্রেগনেন্সিতে সিজার না করলে কি গুনাহ হবে?

Janazah-Burial · Hanafi

Question No: 6538
Questioner: সোডিয়াম লাইট
Question Asked: 07 Oct 2026, 08:16 PM
Reviewed & Published: 07 Oct 2026, 08:22 PM
Views: 35
Tokens: 7,024
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম শায়েখ।
একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা বাচ্চা হওয়ার সময় পেটে বাচ্চাসহ মারা গেছেন। তার হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি ছিল ( থাইরয়েড, হাই প্রেসার,ডায়বেটিস, অ্যাজমা, হার্টে সমস্যা, হিমোগ্লোবিন কম), ডাঃ তাকে সিজার করতে বলেছিলো কিন্তু সে সিজার না করে আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করে যে আল্লাহ তার নরমাল ডেলিভারি করাবে।তার ডেলিভারি ডেট পার হয়ে যাওয়া স্বত্বেও সে জিদ করেছিলো মৃত্যু হলে হাসপাতালে, বাসায় সবজায়গায় ই হবে। সিজার করালে পর্দা নষ্ট হবে ( শায়েখ আজকালকার যুগে এনেস্থেসিওলজিস্ট থেকে শুরু করে সব মহিলা পাওয়া যায়)। এবং
শেষ পর্যন্ত জিদ করে তার বাসায় বসেই মৃত্যু হয়। বাসায় অবশ্য নার্স আনা হয়েছিল। নার্স অনেক জোর করছিলো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য, এমারজেন্সি অক্সিজেন লাগাতে হবে, পর্দা লঙ্ঘন হবে না বুঝানোর পরেও তাকে রাজি করানো যায় নি। বাচ্চার মাথা নরম হয়ে আসছিলো আরেকটু চেষ্টা করলেই বাচ্চা বের হতো। কিন্তু এরমধ্যেই উনি মারা যান।

এভাবে মৃত্যু হলে শহীদি মৃত্যু হিসেবে গন্য হবে? তিনি কি সঠিক ছিলেন?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

উত্তর

এটি একটি দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক মৃত্যু, তবে এটি ইসলামি দৃষ্টিতে **আত্মহত্যা নয়।

তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ও নার্সের জোরালো অনুরোধ উপেক্ষা করে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন,এটি অন্যায় হয়েছে।

তার মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু (শাহাদাত) হিসেবে গণ্য করা যাবে কিনা, চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে; আমরা শুধু শরীয়তের দৃষ্টিকোণ ব্যাখ্যা করছি।


বিস্তারিত আলোচনা

১. ইসলামে জীবন রক্ষা করা ফরজ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا "নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" — (সূরা আন-নিসা: ২৯)

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা জায়েজ, বরং কখনো ওয়াজিব হয়ে যায় যখন জীবন সংশয়াপন্ন হয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫৪ প্রসঙ্গ)

২. চিকিৎসকের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً "চিকিৎসা করো; কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার তিনি সৃষ্টি করেননি।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫, তিরমিজি: ২০৩৮)

ফাতাওয়া উসমানি-তে (১/৩৩০) উল্লেখ আছে: যখন অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার জীবন রক্ষার জন্য সিজার বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা আবশ্যক বলে মত দেন, তখন তা গ্রহণ করা কর্তব্য; অবহেলা করা আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

৩. "তাওয়াক্কুল" এর ভুল ব্যাখ্যা

তাওয়াক্কুল মানে আল্লাহর উপর ভরসা করা — কিন্তু উপায়-উপকরণ গ্রহণ না করে বিপদের মুখে ঝাঁপ দেওয়া তাওয়াক্কুল নয়, বরং তা "তাওয়াক্কুল" নামে পরিচিত একটি ভুল ধারণা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ "উট বেঁধে রাখো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।" — (তিরমিজি: ২৫১৭)

হাদিসে আরও এসেছে, এক ব্যক্তি বলল: "হে আল্লাহর রাসূল! আমি উট ছেড়ে দিয়ে তাওয়াক্কুল করব?" তিনি বললেন: "না, বরং বেঁধে রাখো, তারপর তাওয়াক্কুল করো।"

মা'আরিফুল কুরআন-এ (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫ এর তাফসীরে) মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং উপায় বর্জন করা আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন।"

৪. পর্দার অজুহাতে চিকিৎসা বর্জন

শরীয়তে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে পর্দার বিধানে শিথিলতা রয়েছে। আল্লাহ বলেন:

فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغٍ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ "যে ব্যক্তি বাধ্য হয়, অথচ সে সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো গুনাহ নেই।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৭৩)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে (৫/৩২৮) উল্লেখ আছে: চিকিৎসার প্রয়োজনে মাহরাম-গায়ের মাহরামের সামনে শরীরের প্রয়োজনীয় অংশ খোলার অনুমতি আছে, যদি জীবন সংশয়াপন্ন হয়।

বাহিশতী জেওর-এ (হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ.) স্পষ্ট বলা হয়েছে: "জীবন রক্ষার প্রয়োজনে পর্দার বিধান শিথিল হয়, কিন্তু পর্দা রক্ষার নামে জীবন ধ্বংস করা জায়েজ নয়।"

আরও লক্ষণীয়: তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে মহিলা এনেস্থেসিওলজিস্ট পাওয়া যায় — অর্থাৎ পর্দা রক্ষা করেই চিকিৎসা সম্ভব ছিল। তাহলে পর্দার অজুহাতে সিজার প্রত্যাখ্যান করা শরীয়তসম্মত ছিল না।

৫. শহীদি মৃত্যুর সংজ্ঞা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

الشَّهِيدُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِيقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ "শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারিতে মৃত, পেটের রোগে মৃত, ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত, এবং আল্লাহর পথে যুদ্ধে মৃত।" — (সহীহ বুখারি: ২৮২৯, সহীহ মুসলিম: ১৯১৫)

সন্তান প্রসবকালে মৃত্যুবরণকারী মহিলা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে:

وَالْمَرْأَةُ يَقْتُلُهَا وَلَدُهَا شَهَادَةً "যে মহিলা সন্তান প্রসবের কারণে মারা যায়, সে শহীদ।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১১)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.